একই ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মীয়তার বন্ধনে বিজয়া দশমীতে দিনাজপুরের হিলি সীমান্তে জড়ো হয়েছেন দুই বাংলার মানুষ। কেউ এসেছেন কাঁটাতারের ওপারে থাকা আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে, কেউবা ভারতীয় দুর্গাপ্রতিমা দেখার আশায়। সীমান্তের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেও প্রিয়জনদের একনজর দেখা ও কথা বলার আকাঙ্ক্ষায় চেকপোস্ট এলাকায় তৈরি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল থেকেই হিলি স্থলবন্দরের চেকপোস্ট ও শূন্যরেখা সংলগ্ন এলাকায় দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ, ফুলবাড়ী, পীরগঞ্জ, পাঁচবিবি ও জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে আসেন অনেকে। একইভাবে ভারতের দিক থেকেও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি দেখা যায়। দুই দেশের মানুষ কাঁটাতারের দুই পাশে দাঁড়িয়ে একে অপরের সঙ্গে দেখা ও কথা বলার অপেক্ষায় থাকেন।
পাঁচবিবি থেকে আসা দিনেশ বর্মন বলেন, ওপারে তাঁর আত্মীয়স্বজন রয়েছেন। ফোনে কথা হলেও সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে দীর্ঘদিন তাঁদের সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়নি। বিজয়া দশমীতে হিলিতে এসেছিলেন আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করার পাশাপাশি ভারতীয় দুর্গাপ্রতিমা দেখার আশায়। আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তবে প্রতিমা দেখতে পাননি।
গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জ থেকে দুই মেয়েকে নিয়ে আসা ভবানী কান্ত বলেন, ছুটির সুযোগে পূজার পরিবেশ দেখতে হিলিতে এসেছেন। ভারতে কখনো যাওয়া হয়নি। তাই সীমান্তের ওপারে দুর্গাপ্রতিমা দেখার প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।
ঘোড়াঘাট পৌর শহরের ব্যবসায়ী রতন কুমার শীল বলেন, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও মানুষের আবেগ ও আত্মীয়তার বন্ধন আটকে রাখা যায় না। ভারতের চকপাড়ায় থাকা আত্মীয়দের আগেই চেকপোস্টে আসতে বলেছিলেন তিনি। প্রায় তিন বছর পর তাঁদের দেখতে পেয়ে ভালো লেগেছে। এখন ভারতীয় দুর্গাপ্রতিমা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।
রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে আসা অঞ্জলি দাশের বাবার বাড়ি ভারতের ডালখোলায়। ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে বাংলাদেশে আসার পর থেকে সংসারের নানা ব্যস্ততায় বাবার বাড়ি যাওয়া হয়ে ওঠেনি। তিনি বলেন, পূজার উপলক্ষে ভাই-বোনদের একনজর দেখার জন্য ওপারে আসতে বলেছিলেন। পরে বিজিবি ও বিএসএফের অনুমতি নিয়ে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে পেরেছেন। দূর থেকে কথা বলতে গিয়ে সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে কান্নাও করেন তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিবছর পূজা-পার্বণসহ বিভিন্ন উৎসবে হিলি সীমান্তে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। কেউ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করেন, কেউ সীমান্তের ওপারের উৎসবের পরিবেশ দেখতে চান। তাঁদের মতে, সীমান্তের নিরাপত্তা বজায় রেখেও নিয়ম মেনে দুই দেশের মানুষের দেখা ও ভাববিনিময়ের সুযোগ থাকলে এই এলাকার পর্যটন সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
হিলি সিপি বিজিবি ক্যাম্পের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, নিয়মিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি উৎসব উপলক্ষে সীমান্ত ও চেকপোস্ট এলাকায় বাড়তি নজরদারি রাখা হয়েছে। বিজয়া দশমী উপলক্ষে বাইরে থেকে দর্শনার্থীরা আসায় বিজিবি সতর্ক রয়েছে।
হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকারিয়া বলেন, বিজয়া দশমী উপলক্ষে সকাল থেকেই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ চেকপোস্ট এলাকায় আসছেন। পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে যাতায়াত করতে না পারা অনেকে কাঁটাতারের দুই পাশে থাকা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে হাত নেড়ে ও ইশারায় কথা বলছেন। তাঁদের এই মিলন দুই দেশের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সম্পর্ক তুলে ধরে।
বিজয়া দশমী শারদীয় দুর্গোৎসবের বিদায়ের দিন। প্রতিমা বিসর্জন ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও হিলি সীমান্তে মানুষের উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়—ভৌগোলিক সীমারেখা আলাদা করতে পারে দুই দেশকে, কিন্তু ভাষা, ভালোবাসা ও আত্মীয়তার বন্ধনকে নয়।
সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট, বিরামপুর (দিনাজপুর) 


















