মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশুরাই যখন মঞ্চের কাণ্ডারি, উঠল অধিকার রক্ষার আওয়াজ

কায়সার রহমান রোমেল: সোমবার সন্ধ্যা। গাইবান্ধা নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংস্থার ডা. সাখাওয়াত হোসেন খান মুক্তমঞ্চে আলো জ্বলে উঠতেই দর্শকসারিতে নেমে আসে কৌতূহলী নীরবতা। মঞ্চে দাঁড়ানোদের কেউই বয়সে বড় নয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা, স্বাগত বক্তব্য, গান, আবৃত্তি ও নাচ—সবকিছুর দায়িত্বই শিশুদের। বড়দের জন্য বরাদ্দ ছিল শুধু দর্শকের আসন।

বিশ্ব শিশু দিবস উপলক্ষে সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী গাইবান্ধা পরিচালিত সত্যেন সেন সংগীত বিদ্যালয় এ আয়োজন করে। ‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে’ শিরোনামের এ অনুষ্ঠানের পুরো আয়োজন ও উপস্থাপনা করে বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীরা। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত চলে অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠান উপস্থাপনার দায়িত্বে ছিল সন্ধি, অবনী ও মৈত্রী। শিশুসুলভ সারল্যে তারা একের পর এক পরিবেশনার নাম ঘোষণা করে। স্বাগত বক্তব্য দেন শিক্ষার্থী পরমব্রত। তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক আয়োজন।

এরপর মঞ্চ ভরে ওঠে গান, আবৃত্তি ও নৃত্যে। সম্মিলিত গান, নজরুলসংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্যে অংশ নেয় তরী, দিপান্বিতা, প্রার্থনা, সন্ধি, শামস, রাশিন ও নভোনীলসহ অন্য শিক্ষার্থীরা। ছোট ছোট কণ্ঠের সম্মিলিত সুর আর পায়ের তালে দর্শকসারি বারবার করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে।

অনুষ্ঠানের শিরোনামেও ছিল জাগরণের আহ্বান। সেই আহ্বান শুধু গানের চরণে সীমাবদ্ধ থাকেনি; শিশুদের পরিবেশনা ও অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তা যেন বাস্তব রূপ পায়। পুরো আয়োজনজুড়ে বড়রা ছিলেন শ্রোতা, আর শিশুরাই ছিল বক্তা ও শিল্পী।

এবারের বিশ্ব শিশু দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল—‘শিশুদের কথা শুনুন, প্রতিটি শিশুর অধিকার রক্ষায় প্রতিদিন সোচ্চার হোন’। এ বার্তাকে সামনে রেখে শিশুদের অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। শিশুরাই যখন পুরো মঞ্চের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন ‘শিশুদের কথা শুনুন’—এই আহ্বানটিও যেন বাস্তব অর্থ পায়।

অনুষ্ঠান শেষে সত্যেন সেন সংগীত বিদ্যালয়ের পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ, সুন্দর, বৈষম্যহীন ও শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। শিশুদের কথা শোনা ও তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

উদীচী গাইবান্ধা জেলা সংসদের সভাপতি লেখক-গবেষক জহুরুল কাইয়ুম বলেন, সমাজ ও রাষ্ট্রকে শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হতে হবে। শিশুদের সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

আয়োজকেরা বলেন, এটি শুধু দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতা নয়। গান, আবৃত্তি ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে শিশুদের প্রতিভা ও সৃজনশীলতা প্রকাশের পাশাপাশি মঞ্চ পরিচালনার মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাসও তৈরি হচ্ছে। শৈশব থেকেই সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা শিশুদের মানবিক, সৃজনশীল ও সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে।

রাত গাঢ় হলেও মুক্তমঞ্চে তখনো ছিল শিশুদের কলকাকলি। করতালির মধ্য দিয়ে শেষ হয় আয়োজন। তবে শিশুদের কণ্ঠে উচ্চারিত অধিকার ও জাগরণের বার্তাটি যেন দর্শকদের সঙ্গে নিয়েই ফিরে যায়—শিশুরা জেগে উঠলে, তাদের অধিকার নিশ্চিত হলে, সেই সকাল আসবেই।

জনপ্রিয়

শিশুরাই যখন মঞ্চের কাণ্ডারি, উঠল অধিকার রক্ষার আওয়াজ

শিশুরাই যখন মঞ্চের কাণ্ডারি, উঠল অধিকার রক্ষার আওয়াজ

প্রকাশের সময়: ০১:০৭:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

কায়সার রহমান রোমেল: সোমবার সন্ধ্যা। গাইবান্ধা নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংস্থার ডা. সাখাওয়াত হোসেন খান মুক্তমঞ্চে আলো জ্বলে উঠতেই দর্শকসারিতে নেমে আসে কৌতূহলী নীরবতা। মঞ্চে দাঁড়ানোদের কেউই বয়সে বড় নয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা, স্বাগত বক্তব্য, গান, আবৃত্তি ও নাচ—সবকিছুর দায়িত্বই শিশুদের। বড়দের জন্য বরাদ্দ ছিল শুধু দর্শকের আসন।

বিশ্ব শিশু দিবস উপলক্ষে সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী গাইবান্ধা পরিচালিত সত্যেন সেন সংগীত বিদ্যালয় এ আয়োজন করে। ‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে’ শিরোনামের এ অনুষ্ঠানের পুরো আয়োজন ও উপস্থাপনা করে বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীরা। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত চলে অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠান উপস্থাপনার দায়িত্বে ছিল সন্ধি, অবনী ও মৈত্রী। শিশুসুলভ সারল্যে তারা একের পর এক পরিবেশনার নাম ঘোষণা করে। স্বাগত বক্তব্য দেন শিক্ষার্থী পরমব্রত। তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক আয়োজন।

এরপর মঞ্চ ভরে ওঠে গান, আবৃত্তি ও নৃত্যে। সম্মিলিত গান, নজরুলসংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্যে অংশ নেয় তরী, দিপান্বিতা, প্রার্থনা, সন্ধি, শামস, রাশিন ও নভোনীলসহ অন্য শিক্ষার্থীরা। ছোট ছোট কণ্ঠের সম্মিলিত সুর আর পায়ের তালে দর্শকসারি বারবার করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে।

অনুষ্ঠানের শিরোনামেও ছিল জাগরণের আহ্বান। সেই আহ্বান শুধু গানের চরণে সীমাবদ্ধ থাকেনি; শিশুদের পরিবেশনা ও অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তা যেন বাস্তব রূপ পায়। পুরো আয়োজনজুড়ে বড়রা ছিলেন শ্রোতা, আর শিশুরাই ছিল বক্তা ও শিল্পী।

এবারের বিশ্ব শিশু দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল—‘শিশুদের কথা শুনুন, প্রতিটি শিশুর অধিকার রক্ষায় প্রতিদিন সোচ্চার হোন’। এ বার্তাকে সামনে রেখে শিশুদের অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। শিশুরাই যখন পুরো মঞ্চের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন ‘শিশুদের কথা শুনুন’—এই আহ্বানটিও যেন বাস্তব অর্থ পায়।

অনুষ্ঠান শেষে সত্যেন সেন সংগীত বিদ্যালয়ের পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ, সুন্দর, বৈষম্যহীন ও শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। শিশুদের কথা শোনা ও তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

উদীচী গাইবান্ধা জেলা সংসদের সভাপতি লেখক-গবেষক জহুরুল কাইয়ুম বলেন, সমাজ ও রাষ্ট্রকে শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হতে হবে। শিশুদের সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

আয়োজকেরা বলেন, এটি শুধু দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতা নয়। গান, আবৃত্তি ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে শিশুদের প্রতিভা ও সৃজনশীলতা প্রকাশের পাশাপাশি মঞ্চ পরিচালনার মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাসও তৈরি হচ্ছে। শৈশব থেকেই সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা শিশুদের মানবিক, সৃজনশীল ও সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে।

রাত গাঢ় হলেও মুক্তমঞ্চে তখনো ছিল শিশুদের কলকাকলি। করতালির মধ্য দিয়ে শেষ হয় আয়োজন। তবে শিশুদের কণ্ঠে উচ্চারিত অধিকার ও জাগরণের বার্তাটি যেন দর্শকদের সঙ্গে নিয়েই ফিরে যায়—শিশুরা জেগে উঠলে, তাদের অধিকার নিশ্চিত হলে, সেই সকাল আসবেই।