প্রকল্পনির্ভর উন্নয়নকর্মীদের অনিশ্চিত জীবন ও অবহেলিত কর্মসংস্থান
(মোছা. সাবরিনা জাহান)
গার্মেন্টস শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো না কোনো পর্যায়ে সমঝোতা আসবে। সব দাবি শতভাগ পূরণ না হলেও কিছু দাবি বাস্তবায়নের পথ তৈরি হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা শিল্পকারখানা, সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আসে। তবে সেই পরিবর্তনের পথে কখনো রাস্তায় নামতে হয়, কখনো রক্ত দিতে হয়, কখনো বা সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়।
কিন্তু দেশের এমন একটি কর্মজীবী শ্রেণি রয়েছে, যারা বছরের পর বছর অবহেলিত থেকেও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগী সংস্থার হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তারা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার জুনিয়র পর্যায়ের কর্মী। তাদের অনেকেরই নেই কোনো মানসম্মত বেতন কাঠামো, নেই দীর্ঘমেয়াদি চাকরির নিশ্চয়তা কিংবা ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা। সংস্থার নীতিমালা, প্রকল্পের মেয়াদ ও প্রকল্প নকশার ওপর নির্ভর করে তাদের জীবনযাত্রা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
হয়তো পরের মাসে কিছুটা স্বস্তি মিলবে—এমন আশায় কাটে তাদের দিন। একটি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পরপরই অন্য কোনো প্রকল্পে চাকরি নিশ্চিত না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িতে বসে থাকতে হয়। সেই সময়টা পার করতে হয় দেনা-পাওনা আর অনিশ্চয়তার হিসাব মেলাতে মেলাতে।
প্রকল্পের মেয়াদ যতই ফুরিয়ে আসতে থাকে, পরিবারের বহুমুখী চাহিদা ও দায়বদ্ধতাগুলো ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রকল্প শেষ হয়, কিন্তু সংসারের খরচ তো শেষ হয় না। চাকরি থাকুক বা না থাকুক, পুঁজি থাকুক বা না থাকুক —চলমান বাজারমূল্যের সঙ্গে তাল মিলিয়েই তাকে জীবন চালাতে হয়।
ঘরের বাইরে বের হলেও পড়তে হয় নানা প্রশ্নের মুখে—’কী ব্যাপার, আজ ডিউটিতে যাননি?’ এমন প্রশ্নের জবাব অনেক সময় থাকে না। কজনকেই বা নিজের কর্মজীবনের অনিশ্চয়তার কথা বুঝিয়ে বলা যায়! কখনো ব্যাখ্যা দিতে হয়, কখনো বা সামাজিক অস্বস্তি এড়াতে আশ্রয় নিতে হয় মিথ্যার। অথচ এই মানুষটি না পারেন অন্যের জমিতে দিনমজুরি করতে, না পারেন প্রতিদিনের পারিবারিক চাহিদার মুখোমুখি হওয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে।
এভাবে চলতে চলতে একসময় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এসে দাঁড়ায় বয়সের সীমাবদ্ধতা। যাদের জন্য সারাজীবন নিজের মেধা, শ্রম ও সময় ব্যয় করেছেন,কর্মজীবনের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তারাই যেন ভুল করেও আর স্মরণ করেন না। এই শ্রেণির মানুষের ভবিষ্যতের কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। তাদের কাছে বর্তমান সময়টুকু পার করাই যেন এক ধরনের বিলাসিতা।
যতক্ষণ চোখ, মুখ ও পা সচল থাকে, ততক্ষণই তাদের কর্মমূল্য। অথচ সারাজীবন লিখিত পরীক্ষা,মৌখিক পরীক্ষা এবং প্রতিনিয়ত যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়ার মধ্য দিয়েই তাদের কর্মজীবন অতিবাহিত হয়। স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পে স্বল্প বেতনে কাজ করে একজন কর্মী নিজের পরিবার-পরিজনের চাহিদা মেটানোর পর কতটুকু সঞ্চয় করতে পারেন? কতটুকুই বা ভবিষ্যৎ গড়তে পারেন?
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) ও ১৫(খ) অনুচ্ছেদে নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ, কর্মসংস্থান এবং যুক্তিসঙ্গত মজুরির বিষয়টি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়েও এই কর্মীদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা ও যুক্তিসঙ্গত মজুরি থেকে বঞ্চিত।
পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের সুফল তাদের জীবনে কতটুকু পৌঁছায়, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। অথচ পরিকল্পিতভাবেই তাদের আয়ের একটি অংশ কর হিসেবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হচ্ছে। উচ্চমূল্যের বাজারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। নিজের জীবনযাত্রা শোচনীয় হলেও রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা ব্যয়ের বোঝা বহনে তাদের পরোক্ষ অংশগ্রহণ রয়েছে।
অন্যদিকে,জীবিত মানুষের জীবনমান উপেক্ষিত রেখে উন্নয়নের চাকচিক্যে সাজানো হচ্ছে মৃত মানুষের ঘরবাড়ি ও কবরস্থান। যাদের কাছ থেকে গুণগত সেবার প্রত্যাশা করা হয়,তাদের অনেকের কাছ থেকেই দপ্তরে দপ্তরে অসৌজন্যমূলক আচরণের শিকার হতে হয় এই কর্মীদের। অথচ প্রয়োজনের তাগিদে বিভিন্ন পর্যায়ে সেবা গ্রহণের জন্যও তাদের অর্থ ব্যয় করতে হয়।
প্রশ্ন হলো, যারা সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করছেন, তাদের নিজেদের জীবনমান উন্নয়নের দায়িত্ব কার? প্রকল্প বাস্তবায়নের সাফল্যের হিসাব থাকে, কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনে থাকা কর্মীদের জীবনসংগ্রামের হিসাব কে রাখে?
উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হলো,যারা এই পরিবর্তনের কারিগর, তাদের জীবনেও স্থিতিশীলতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
তাই বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার জুনিয়র পর্যায়ের কর্মীদের জন্য একটি যৌক্তিক বেতন কাঠামো, প্রকল্পান্তরে কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা,বয়স ও কর্ম-অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
নইলে উন্নয়নের গল্প লেখা হবে, অর্জনের পরিসংখ্যান বাড়বে, কিন্তু সেই গল্পের নেপথ্যের মানুষগুলো থেকে যাবেন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।
এ যেন এক নির্মম বাস্তবতা—নিজের বর্তমানকে প্রতিনিয়ত ভেঙে অন্যের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা; অথচ নিজের ভবিষ্যতের জন্য নিশ্চিত কোনো ভিত্তি তৈরি করতে না পারা।
লেখক: মোছা. সাবরিনা জাহান
লেখক: মোছা. সাবরিনা জাহান 























