শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২৩ অগাস্ট একজন মহিরুহের মৃত্যুবার্ষিকী

২৩ অগাস্ট একজন মহিরুহের মৃত্যুবার্ষিকী

(আ স ম সাজ্জাদ হোসেন পল্টন)

মানুষ তার ভিত্তি রচনা করে শিকড় থেকে। তেমনি একটি শিকড় হচ্ছে শ্রদ্ধেয় মরহুম মজিবুর রহমান চেয়ারম্যান। তাঁরা সাত ভাই এক বোন, কিন্তু তারা পাঁচ ভাই যখন এক সঙ্গে বসতো, তখন যেনো মনে হতো না তাঁরা আপন ভাই, তাঁরা যেনো বন্ধু। তাদের পথ চলায় সবাই সবার সুখ-দুঃখ টা ভাগ করে নিতো, সবার অভিযোগ অনুযোগ টা যেনো তাঁর কাছে।

সাদুল্যাপুরে প্রথম মোটরসাইকেল, রাইস মিল, টেলিভিশন তাঁর বাসায়। আমার চাচাতো ভাই বোন, প্রতিবেশী, শহরে প্রায় মানুষেরই গন্তব্যস্থল ছিল তাঁর বাসা। টেলিভিশনের প্রত্যেকটা নাটক, সিনেমা, শিশু কিশোরদের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, নতুন কুঁড়িসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেনো আমাদের দেখতে হবে। অনেক সময় বাবা-মা’দের না বলে ছুটে যেতাম তাঁর বাসায়।

ছোট চাচা, বড় চাচা ছিল আমাদের পরিবারের শাসনের এক কেন্দ্র, যাদেরকে দেখলে সবাই থর থর করে কেঁপে উঠতো। শাসন আর সোহাগ যেন তাদের শিল্প। কোন সময় অতিরিক্ত শাসন করলে যিনি সবার আগে ছুটে আসতেন, ঘাড়ে পাঞ্জাবি আর এক দল লোক নিয়ে। গ্ৰামের বাড়িতে এসে আমাদের মা-চাচীদের বলতেন, বঊমা কি খাবার আছে দাও। তাদেরও সব অভিযোগ অনুযোগ তাঁর কাছে ছিল। তাঁর বাবা আলহাজ্ব তমিজ উদ্দিন এর খুব প্রিয় সন্তান ছিলেন তিনি। বাবা অনেক রাগ করে তাঁর সামনে আসলেও তাঁর মৃদ হাঁসিটাই যেনো তাঁর বাবা রাগকে ম্লান করে দিতো। এ যেনো পারিবারিক চমৎকার বন্ধন।

রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তিনি ছিলেন মহিরুহ সাদুল্যাপুরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি থেকে শুরু করে সাদুল্যাপুরে বনিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি। দীর্ঘ সময় বনগ্ৰাম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে বহু চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যে দিয়েও শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত জাগো দল থেকে শুরু করে বিএনপি আমৃত্যু সভাপতি ছিলেন তিনি। এই দল সুসংগঠিত করতে গিয়ে তৎকালীন সামরিক সরকার তাঁকে দীর্ঘ সাত মাস কারাগারে রাখে। ১৯৮৭ সালে উপজেলা ঘেরাও কর্মসূচির আগে তিনিসহ বহু রাজনীতিবিদকে কারাগারে নিক্ষেপ করে। দীর্ঘ সাত মাস কারা জীবনে তিনি সবার প্রিয় হয়ে উঠেন। আমাদের পরিবার এবং স্বজনরা প্রতিনিয়ত তাঁর জন্য খাবার নিয়ে গেলে ও তিনি তা সবাইকে ভাগ করে দিতেন।

সাল্যাপুরের সামাজিক অবক্ষয়রোধে দলমতের উর্ধে উঠে দিনে যতই বৈরীতা থাক তাঁর চির প্রতিদ্বন্দ্বি আসাদুজ্জামান খাঁন ফাকা চাচার সাথে রাতের অন্ধকারে ঠিকই তারা সমাজ সভ্যতা নিয়ে আলাপ করতেন। শহরের প্রায় মানুষ বলতো দিনে তাদের যতই বৈরীতায় থাক রাতে তারা এক অভিন্ন। তারা নিজেদের পাশাপাশি চেয়ারম্যান খন্দকার তোছাদ্দেক হোসেন অদু মিয়া, সাদেক আলী প্রামাণিকসহ অসংখ্য রাজনৈতিক নেতাকর্মী খবর রাখতেন।

সদা  হাস্যোজ্জ্বল, দীর্ঘদেহী, সুন্দর চেহারা অধিকারী এই মানুষটির হাঁসি যেনো সবার হৃদয় জয় করে ফেলতো। তাঁর কোন অভিযোগ অনুযোগ ছিল না। তিনি কখনো প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি হিসাব করতেন না। তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্য বিএনপি ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অতন্ত প্রহরী, তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্য ও বিএনপির আদর্শের বাহিরে নয়, এটি তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা। এটি অন্য কোন পরিবারের আছে কি না, তা বিরল।

১৯৯৬ এর ২৩ আগস্ট মরণব্যাধী ক্যান্সার কাছে হার মানলেও, তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর তাঁর জানাজায় জনতার ঢল প্রমাণ করে তিনি মানুষের কাছে কত জনপ্রিয় ছিলেন। মহান রাব্বুল আলামিন, তাঁর ভালো কাজগুলোর অছিলায় বেহশত নছিব করুন। আমিন।

লেখক- আ স ম সাজ্জাদ হোসেন পল্টন, সাবেক ভিপি, সাদল্যাপুর ডিগ্রী কলেজ। 

জনপ্রিয়

২৩ অগাস্ট একজন মহিরুহের মৃত্যুবার্ষিকী

২৩ অগাস্ট একজন মহিরুহের মৃত্যুবার্ষিকী

প্রকাশের সময়: ০৮:০৭:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

২৩ অগাস্ট একজন মহিরুহের মৃত্যুবার্ষিকী

(আ স ম সাজ্জাদ হোসেন পল্টন)

মানুষ তার ভিত্তি রচনা করে শিকড় থেকে। তেমনি একটি শিকড় হচ্ছে শ্রদ্ধেয় মরহুম মজিবুর রহমান চেয়ারম্যান। তাঁরা সাত ভাই এক বোন, কিন্তু তারা পাঁচ ভাই যখন এক সঙ্গে বসতো, তখন যেনো মনে হতো না তাঁরা আপন ভাই, তাঁরা যেনো বন্ধু। তাদের পথ চলায় সবাই সবার সুখ-দুঃখ টা ভাগ করে নিতো, সবার অভিযোগ অনুযোগ টা যেনো তাঁর কাছে।

সাদুল্যাপুরে প্রথম মোটরসাইকেল, রাইস মিল, টেলিভিশন তাঁর বাসায়। আমার চাচাতো ভাই বোন, প্রতিবেশী, শহরে প্রায় মানুষেরই গন্তব্যস্থল ছিল তাঁর বাসা। টেলিভিশনের প্রত্যেকটা নাটক, সিনেমা, শিশু কিশোরদের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, নতুন কুঁড়িসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেনো আমাদের দেখতে হবে। অনেক সময় বাবা-মা’দের না বলে ছুটে যেতাম তাঁর বাসায়।

ছোট চাচা, বড় চাচা ছিল আমাদের পরিবারের শাসনের এক কেন্দ্র, যাদেরকে দেখলে সবাই থর থর করে কেঁপে উঠতো। শাসন আর সোহাগ যেন তাদের শিল্প। কোন সময় অতিরিক্ত শাসন করলে যিনি সবার আগে ছুটে আসতেন, ঘাড়ে পাঞ্জাবি আর এক দল লোক নিয়ে। গ্ৰামের বাড়িতে এসে আমাদের মা-চাচীদের বলতেন, বঊমা কি খাবার আছে দাও। তাদেরও সব অভিযোগ অনুযোগ তাঁর কাছে ছিল। তাঁর বাবা আলহাজ্ব তমিজ উদ্দিন এর খুব প্রিয় সন্তান ছিলেন তিনি। বাবা অনেক রাগ করে তাঁর সামনে আসলেও তাঁর মৃদ হাঁসিটাই যেনো তাঁর বাবা রাগকে ম্লান করে দিতো। এ যেনো পারিবারিক চমৎকার বন্ধন।

রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তিনি ছিলেন মহিরুহ সাদুল্যাপুরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি থেকে শুরু করে সাদুল্যাপুরে বনিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি। দীর্ঘ সময় বনগ্ৰাম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে বহু চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যে দিয়েও শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত জাগো দল থেকে শুরু করে বিএনপি আমৃত্যু সভাপতি ছিলেন তিনি। এই দল সুসংগঠিত করতে গিয়ে তৎকালীন সামরিক সরকার তাঁকে দীর্ঘ সাত মাস কারাগারে রাখে। ১৯৮৭ সালে উপজেলা ঘেরাও কর্মসূচির আগে তিনিসহ বহু রাজনীতিবিদকে কারাগারে নিক্ষেপ করে। দীর্ঘ সাত মাস কারা জীবনে তিনি সবার প্রিয় হয়ে উঠেন। আমাদের পরিবার এবং স্বজনরা প্রতিনিয়ত তাঁর জন্য খাবার নিয়ে গেলে ও তিনি তা সবাইকে ভাগ করে দিতেন।

সাল্যাপুরের সামাজিক অবক্ষয়রোধে দলমতের উর্ধে উঠে দিনে যতই বৈরীতা থাক তাঁর চির প্রতিদ্বন্দ্বি আসাদুজ্জামান খাঁন ফাকা চাচার সাথে রাতের অন্ধকারে ঠিকই তারা সমাজ সভ্যতা নিয়ে আলাপ করতেন। শহরের প্রায় মানুষ বলতো দিনে তাদের যতই বৈরীতায় থাক রাতে তারা এক অভিন্ন। তারা নিজেদের পাশাপাশি চেয়ারম্যান খন্দকার তোছাদ্দেক হোসেন অদু মিয়া, সাদেক আলী প্রামাণিকসহ অসংখ্য রাজনৈতিক নেতাকর্মী খবর রাখতেন।

সদা  হাস্যোজ্জ্বল, দীর্ঘদেহী, সুন্দর চেহারা অধিকারী এই মানুষটির হাঁসি যেনো সবার হৃদয় জয় করে ফেলতো। তাঁর কোন অভিযোগ অনুযোগ ছিল না। তিনি কখনো প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি হিসাব করতেন না। তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্য বিএনপি ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অতন্ত প্রহরী, তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্য ও বিএনপির আদর্শের বাহিরে নয়, এটি তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা। এটি অন্য কোন পরিবারের আছে কি না, তা বিরল।

১৯৯৬ এর ২৩ আগস্ট মরণব্যাধী ক্যান্সার কাছে হার মানলেও, তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর তাঁর জানাজায় জনতার ঢল প্রমাণ করে তিনি মানুষের কাছে কত জনপ্রিয় ছিলেন। মহান রাব্বুল আলামিন, তাঁর ভালো কাজগুলোর অছিলায় বেহশত নছিব করুন। আমিন।

লেখক- আ স ম সাজ্জাদ হোসেন পল্টন, সাবেক ভিপি, সাদল্যাপুর ডিগ্রী কলেজ।