বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বামীর কবরের মাটি শুকানোর আগেই স্ত্রীর বিদায়

একটি কবর তখনও একেবারে নতুন। মাটিগুলোও যেন ঠিকমতো বসেনি। স্বজনেরা কেউ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে, কেউ বাড়ির পথে ফিরছেন। কয়েক ঘণ্টা আগেই সেখানে শেষ আশ্রয় হয়েছে আব্দুল জলিলের (৭০)। জীবনসঙ্গীকে হারানোর শোক বুকে নিয়ে ঘরে শুয়ে ছিলেন তাঁর স্ত্রী আমিনা বেগম (৬০)। কিন্তু কে জানত, স্বামীর কবরের মাটি শুকানোর আগেই তাঁকেও চলে যেতে হবে!

বিকেল ৪টায় স্বামীকে দাফন করা হলো। ঠিক এক ঘণ্টা পর, বিকেল ৫টায় মারা গেলেন আমিনা বেগম। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি জানাজা, দুটি দাফন। একই দিনে পাশাপাশি দুটি কবর। আর সন্তানদের জন্য একদিনেই বাবা-মা দুজনকে হারানোর নির্মম বাস্তবতা।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের সাহাবাজ মতিনবাজার এলাকায় ঘটে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এই ঘটনা। স্বামী-স্ত্রীর এমন মৃত্যুতে পরিবারটির পাশাপাশি শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন প্রতিবেশীরাও।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রথমে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন আমিনা বেগম। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। কিন্তু স্ত্রীকে হাসপাতালে নেওয়ার মাত্র আড়াই ঘণ্টা পরই স্ট্রোকে আক্রান্ত হন স্বামী আব্দুল জলিল। একই সময়ে দুজনের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে উদ্বেগ।

এরপর শুরু হয় দুজনের চিকিৎসা। স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই শারীরিক অবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছিল পরিবারের। একপর্যায়ে চিকিৎসা শেষে আব্দুল জলিলকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থার আর উন্নতি হয়নি। সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে মারা যান আব্দুল জলিল।

স্বামীর মৃত্যুর খবর তখন তাঁর অসুস্থ স্ত্রীও জানলেন। যে মানুষটি দীর্ঘ জীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গী ছিলেন, যাঁর সঙ্গে একই ঘরে কেটেছে জীবনের অসংখ্য দিন, সেই মানুষটিই আর নেই—এই শোক হয়তো আমিনা বেগমের অসুস্থ শরীরেও গভীরভাবে আঘাত করেছিল। তবে তখনও কেউ ভাবেননি, বিদায়ের পালা এতটা কাছাকাছি।

মঙ্গলবার বিকেলে আব্দুল জলিলের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বিকেল ৪টার দিকে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। স্বজনেরা তখনও স্বামীর কবরের পাশে শেষবারের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ মোনাজাত করছিলেন। কেউ হয়তো ভাবছিলেন, অসুস্থ আমিনা বেগমকে এখন কীভাবে সামলাবেন। কিন্তু মাত্র এক ঘণ্টা পরই বদলে গেল সবকিছু। বিকেল ৫টার দিকে মারা গেলেন আমিনা বেগম।

একটি জানাজার শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই আরেকটি জানাজার প্রস্তুতি নিতে হলো পরিবারকে। যে বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও স্বামীর মৃত্যুর কান্না ছিল, সেখানেই আবার উঠল স্ত্রীর মৃত্যুর আহাজারি। পরে বাদ মাগরিব আমিনা বেগমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। স্বামীর কবরের কাছেই পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকেও দাফন করা হয়।

দাম্পত্য জীবনের শেষ দৃশ্যটিও যেন ছিল পাশাপাশি। জীবনে তাঁরা ছিলেন একে অপরের সঙ্গী। অসুস্থতাও এলো কাছাকাছি সময়ে। আর মৃত্যুও তাঁদের আলাদা করে রাখতে পারল না।

নিহত দম্পতির ছেলে আলম মিয়া বলেন, আমার বাবা-মায়ের মধ্যে অনেক মিল-মহব্বত ছিল। তাঁরা একে অপরকে খুব ভালোবাসতেন। হয়তো সে কারণেই একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে একই দিনে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন।

কথা বলতে গিয়ে ভারী হয়ে আসে তাঁর কণ্ঠ। তিনি বলেন, বাবাকে বিকেল ৪টার দিকে দাফন করে বাড়িতে আসি। এর কিছুক্ষণ পরই, বিকেল ৫টার দিকে মায়ের মৃত্যু হয়। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুজনকেই হারালাম। এক দিনেই আমরা এতিম হয়ে গেলাম।

আলম মিয়ার এই কথায় শুধু একজন সন্তানের শোক নয়, যেন ফুটে ওঠে এক পরিবারের আকস্মিক ভেঙে পড়ার ছবি। সকালে যে পরিবারে একজনকে হারানোর শোক ছিল, বিকেল না হতেই সেখানে হারানোর সংখ্যা দাঁড়াল দুজনে।

স্থানীয়রাও বলছেন, একই দিনে এত অল্প সময়ের ব্যবধানে কোনো স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনা তাঁরা খুব কমই দেখেছেন। তাই ঘটনাটি শুধু পরিবারটির জন্য নয়, পুরো এলাকার মানুষের কাছেই হয়ে উঠেছে গভীর বেদনার।

সর্বানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, একই দিনে অল্প সময়ের ব্যবধানে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনা খুবই কম ঘটে। পরিবারের জন্য এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাঁদের জন্য দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাঁদের জান্নাতবাসী করেন।

একটি কবরের মাটি তখনও নরম। তার পাশেই আরেকটি নতুন কবর। দুটির মাঝখানে যেন পাশাপাশি শুয়ে আছে একটি দীর্ঘ দাম্পত্যের গল্প—যেখানে জীবন তাঁদের একসঙ্গে রেখেছিল, অসুস্থতাও এসেছিল পাশাপাশি, আর শেষ বিদায়েও তাঁরা একে অপরকে একা রাখেননি।

জনপ্রিয়

স্বামীর কবরের মাটি শুকানোর আগেই স্ত্রীর বিদায়

স্বামীর কবরের মাটি শুকানোর আগেই স্ত্রীর বিদায়

প্রকাশের সময়: ০২:৪৪:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

একটি কবর তখনও একেবারে নতুন। মাটিগুলোও যেন ঠিকমতো বসেনি। স্বজনেরা কেউ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে, কেউ বাড়ির পথে ফিরছেন। কয়েক ঘণ্টা আগেই সেখানে শেষ আশ্রয় হয়েছে আব্দুল জলিলের (৭০)। জীবনসঙ্গীকে হারানোর শোক বুকে নিয়ে ঘরে শুয়ে ছিলেন তাঁর স্ত্রী আমিনা বেগম (৬০)। কিন্তু কে জানত, স্বামীর কবরের মাটি শুকানোর আগেই তাঁকেও চলে যেতে হবে!

বিকেল ৪টায় স্বামীকে দাফন করা হলো। ঠিক এক ঘণ্টা পর, বিকেল ৫টায় মারা গেলেন আমিনা বেগম। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি জানাজা, দুটি দাফন। একই দিনে পাশাপাশি দুটি কবর। আর সন্তানদের জন্য একদিনেই বাবা-মা দুজনকে হারানোর নির্মম বাস্তবতা।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের সাহাবাজ মতিনবাজার এলাকায় ঘটে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এই ঘটনা। স্বামী-স্ত্রীর এমন মৃত্যুতে পরিবারটির পাশাপাশি শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন প্রতিবেশীরাও।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রথমে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন আমিনা বেগম। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। কিন্তু স্ত্রীকে হাসপাতালে নেওয়ার মাত্র আড়াই ঘণ্টা পরই স্ট্রোকে আক্রান্ত হন স্বামী আব্দুল জলিল। একই সময়ে দুজনের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে উদ্বেগ।

এরপর শুরু হয় দুজনের চিকিৎসা। স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই শারীরিক অবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছিল পরিবারের। একপর্যায়ে চিকিৎসা শেষে আব্দুল জলিলকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থার আর উন্নতি হয়নি। সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে মারা যান আব্দুল জলিল।

স্বামীর মৃত্যুর খবর তখন তাঁর অসুস্থ স্ত্রীও জানলেন। যে মানুষটি দীর্ঘ জীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গী ছিলেন, যাঁর সঙ্গে একই ঘরে কেটেছে জীবনের অসংখ্য দিন, সেই মানুষটিই আর নেই—এই শোক হয়তো আমিনা বেগমের অসুস্থ শরীরেও গভীরভাবে আঘাত করেছিল। তবে তখনও কেউ ভাবেননি, বিদায়ের পালা এতটা কাছাকাছি।

মঙ্গলবার বিকেলে আব্দুল জলিলের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বিকেল ৪টার দিকে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। স্বজনেরা তখনও স্বামীর কবরের পাশে শেষবারের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ মোনাজাত করছিলেন। কেউ হয়তো ভাবছিলেন, অসুস্থ আমিনা বেগমকে এখন কীভাবে সামলাবেন। কিন্তু মাত্র এক ঘণ্টা পরই বদলে গেল সবকিছু। বিকেল ৫টার দিকে মারা গেলেন আমিনা বেগম।

একটি জানাজার শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই আরেকটি জানাজার প্রস্তুতি নিতে হলো পরিবারকে। যে বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও স্বামীর মৃত্যুর কান্না ছিল, সেখানেই আবার উঠল স্ত্রীর মৃত্যুর আহাজারি। পরে বাদ মাগরিব আমিনা বেগমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। স্বামীর কবরের কাছেই পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকেও দাফন করা হয়।

দাম্পত্য জীবনের শেষ দৃশ্যটিও যেন ছিল পাশাপাশি। জীবনে তাঁরা ছিলেন একে অপরের সঙ্গী। অসুস্থতাও এলো কাছাকাছি সময়ে। আর মৃত্যুও তাঁদের আলাদা করে রাখতে পারল না।

নিহত দম্পতির ছেলে আলম মিয়া বলেন, আমার বাবা-মায়ের মধ্যে অনেক মিল-মহব্বত ছিল। তাঁরা একে অপরকে খুব ভালোবাসতেন। হয়তো সে কারণেই একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে একই দিনে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন।

কথা বলতে গিয়ে ভারী হয়ে আসে তাঁর কণ্ঠ। তিনি বলেন, বাবাকে বিকেল ৪টার দিকে দাফন করে বাড়িতে আসি। এর কিছুক্ষণ পরই, বিকেল ৫টার দিকে মায়ের মৃত্যু হয়। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুজনকেই হারালাম। এক দিনেই আমরা এতিম হয়ে গেলাম।

আলম মিয়ার এই কথায় শুধু একজন সন্তানের শোক নয়, যেন ফুটে ওঠে এক পরিবারের আকস্মিক ভেঙে পড়ার ছবি। সকালে যে পরিবারে একজনকে হারানোর শোক ছিল, বিকেল না হতেই সেখানে হারানোর সংখ্যা দাঁড়াল দুজনে।

স্থানীয়রাও বলছেন, একই দিনে এত অল্প সময়ের ব্যবধানে কোনো স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনা তাঁরা খুব কমই দেখেছেন। তাই ঘটনাটি শুধু পরিবারটির জন্য নয়, পুরো এলাকার মানুষের কাছেই হয়ে উঠেছে গভীর বেদনার।

সর্বানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, একই দিনে অল্প সময়ের ব্যবধানে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনা খুবই কম ঘটে। পরিবারের জন্য এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাঁদের জন্য দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাঁদের জান্নাতবাসী করেন।

একটি কবরের মাটি তখনও নরম। তার পাশেই আরেকটি নতুন কবর। দুটির মাঝখানে যেন পাশাপাশি শুয়ে আছে একটি দীর্ঘ দাম্পত্যের গল্প—যেখানে জীবন তাঁদের একসঙ্গে রেখেছিল, অসুস্থতাও এসেছিল পাশাপাশি, আর শেষ বিদায়েও তাঁরা একে অপরকে একা রাখেননি।