ব্রহ্মপুত্রের বুকজুড়ে অপেক্ষা!
(তোফায়েল হোসেন জাকির)
সকাল হতেই বালাসীঘাটে মানুষের আনাগোনা। কেউ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে আছেন। কেউ পুরোনো ঘাটের দিকে হাঁটছেন। কারও চোখে কৌতূহল, কারও চোখে হতাশা। সামনেই ব্রহ্মপুত্র। বিশাল জলরাশি পেরিয়ে ওপারে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট। চোখের সামনে দুই পাড়। অথচ সেই দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগ যেন বহু দূরের পথ।
এই নদীর বুকের ওপর দিয়েই একসময় চলেছে রেল ফেরি। মানুষ গেছে, পণ্য গেছে। উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বালাসী–বাহাদুরাবাদ নৌপথ। আজ সেই ব্যস্ততার অনেকটাই ইতিহাস। ঘাট আছে, অবকাঠামো আছে, রাস্তা আছে—কিন্তু নেই কাঙ্ক্ষিত স্থায়ী যোগাযোগ। তাই নদীর দুই পাড়ে এখন একটি প্রশ্নই ঘুরছে— কবে হবে বালাসী–বাহাদুরাবাদ সেতু?
নদীর ওপারে যে স্বপ্ন:
গাইবান্ধার ফুলছড়ির বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ ঘাট। মাঝখানে ব্রহ্মপুত্র। এই নদী পারাপারের সহজ ও স্থায়ী ব্যবস্থা হলে গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের জন্য দেশের মধ্যাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্থানীয় মানুষের কাছে তাই সেতুটি কেবল ইট-পাথর-লোহার একটি স্থাপনা নয়। এটি তাঁদের কাছে একটি সম্ভাবনার দরজা।
কৃষক চান তাঁর উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাক। ব্যবসায়ী চান কম খরচে পণ্য পরিবহন করতে। শিক্ষার্থী চান সহজে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে। রোগীর স্বজন চান দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছাতে। আর সাধারণ মানুষ চান—নদী যেন আর তাঁদের পথ আটকে না রাখে।
যে নদীপথ একসময় ছিল প্রাণের স্পন্দন:
বালাসী–বাহাদুরাবাদ যোগাযোগের ইতিহাস বহু পুরোনো। ১৯৩৮ সালে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের রেল যোগাযোগ সহজ করতে তিস্তামুখ ঘাট ও বাহাদুরাবাদ ঘাটের মধ্যে যমুনা নদীতে রেল ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়। ট্রেন এসে থামত নদীর ঘাটে। ফেরিতে উঠত রেলওয়ের বগি। নদী পেরিয়ে আবার রেলপথে ছুটত ট্রেন। এভাবেই গড়ে উঠেছিল উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্য অংশের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা। সময় বদলেছে। নদীর গতিপথ বদলেছে। নাব্যতা কমেছে। রেল ফেরির সেই ঐতিহাসিক ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ১৯৯০ সালের পর রেল ফেরি সার্ভিস তিস্তামুখ ঘাট থেকে বালাসীঘাটে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সেই পরিবর্তনও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি।
১৪৫ কোটি টাকার স্থাপনা, কিন্তু কোথায় যোগাযোগ?
নদীপথ পুনরায় চালুর আশায় বালাসী ও বাহাদুরাবাদে নির্মাণ করা হয় ফেরিঘাট টার্মিনাল। বিপুল অর্থ ব্যয় করে তৈরি করা হয় সড়ক, টোল বুথ, টার্মিনাল ভবন, বিশ্রামাগার, মসজিদ, পুলিশ ও আনসার ব্যারাক, ফায়ার সার্ভিস স্টেশনসহ নানা স্থাপনা। এতে প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা উঠে এসেছে। কিন্তু নদীর নাব্যতা সংকটসহ নানা কারণে কাঙ্ক্ষিতভাবে নৌ যোগাযোগ চালু রাখা সম্ভব হয়নি।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—যে যোগাযোগ চালুর জন্য শত কোটি টাকা ব্যয় হলো, সেটি যদি স্থায়ীভাবে চালু রাখা না যায়, তাহলে স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোনো হবে না কেন? এই প্রশ্নই এখন সেতুর দাবিকে আরও জোরালো করছে।
ফেরি আসে-যায়, সেতু থেকে যায়:
ফেরি চালু করা যায়। আবার নাব্যতা কমলে তা বন্ধও হয়ে যেতে পারে। নদী খনন করতে হয়। আবার ব্যয় হয়। নতুন করে প্রকল্প নিতে হয়। এই চক্রের বাইরে বেরিয়ে আসতে চান নদীর দুই পাড়ের মানুষ। তাঁদের যুক্তি—ফেরি হতে পারে সাময়িক সমাধান, কিন্তু সড়ক ও সেতু হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগের ভিত্তি। একটি সেতু তৈরি হলে নদীর পানি বাড়ল কি কমল, নাব্যতা কতটা আছে—এসবের ওপর মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াত একইভাবে নির্ভরশীল থাকবে না।
শুধু দুই জেলা নয়, বদলাতে পারে উত্তরাঞ্চলের মানচিত্র:
বালাসী–বাহাদুরাবাদ সেতুর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এখানেই। সেতুটি বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব শুধু গাইবান্ধা ও জামালপুরে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ময়মনসিংহ, ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগে নতুন একটি করিডর তৈরি হতে পারে। বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগে যমুনা সেতুর ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। বালাসী–বাহাদুরাবাদে সড়ক ও সেতু যোগাযোগ চালু হলে জাতীয় যোগাযোগ নেটওয়ার্কে একটি বিকল্প পথ তৈরি হতে পারে। কোনো একটি পথে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে বিকল্প রুট থাকা যেমন জরুরি, তেমনি দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতেও বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষকের গোলা থেকে রাজধানীর বাজার:
গাইবান্ধার মাঠে ধান পাকে। ভুট্টা ও মরিচ ক্ষেত হলদে-লাল-সবুজ হয়ে ওঠে। মিষ্টি আলু ও বাদাম ওঠে মাটির নিচ থেকে। সবজি ও মাছ যায় বিভিন্ন বাজারে। কিন্তু উৎপাদনের পর কৃষকের সবচেয়ে বড় চিন্তাগুলোর একটি—পণ্য কোথায় এবং কীভাবে দ্রুত পৌঁছাবে? যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হলে পরিবহন খরচ কমার সম্ভাবনা থাকে। সময় কম লাগে। পচনশীল পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানো যায়। বালাসী–বাহাদুরাবাদ সেতু হলে কৃষকের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। শুধু কৃষিপণ্য নয়, শিল্পের কাঁচামাল, তৈরি পণ্য এবং বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের পরিবহনেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
ব্যবসার জন্য খুলতে পারে নতুন দরজা:
একটি বড় যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরি হলে তার দুই পাশে শুধু রাস্তা তৈরি হয় না—গড়ে ওঠে নতুন বাজার। পরিবহন সহজ হলে গড়ে উঠতে পারে গুদাম, পরিবহনকেন্দ্র, পাইকারি বাজার, ছোট-বড় শিল্প এবং নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। জামালপুর ও ময়মনসিংহের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হতে পারে। অর্থাৎ সেতুটি নির্মিত হলে শুধু নদী পারাপারের মাধ্যম হবে না; এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি নতুন কেন্দ্র তৈরি করার সম্ভাবনাও সৃষ্টি করতে পারে।
দাবিটি এখন রাজপথে:
বছরের পর বছর ধরে মানুষ বিভিন্নভাবে সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন। মানববন্ধন হয়েছে। বিক্ষোভ হয়েছে। মিছিল হয়েছে। গণসমাবেশ হয়েছে। স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। এমনকি পদযাত্রার মতো কর্মসূচিতেও উঠে এসেছে বালাসী–বাহাদুরাবাদ সেতুর দাবি। ২০২৬ সালের আগস্টেও বালাসীঘাটে সড়ক ও রেল সেতু নির্মাণের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও গণসমাবেশ হয়েছে। এর আগে মে মাসেও ব্রহ্মপুত্র তীরে কয়েক হাজার মানুষ সেতুর দাবিতে বিক্ষোভ করেন। এছাড়া এই সেতুর দাবিতে গাইবান্ধার বাবা ও ছেলে বালাসী থেকে হেঁটে ঢাকায় কর্মসূচি করেছেন। অর্থাৎ, বিষয়টি এখন আর কয়েকজন স্থানীয় মানুষের দাবি নয়। সময়ের সঙ্গে এটি বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলের মানুষের আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হচ্ছে।
সরকারি গেজেটে আঞ্চলিক মহাসড়ক:
বালাসী–বাহাদুরাবাদ যোগাযোগের গুরুত্বের আরেকটি দিক রয়েছে। সরকারি গেজেটে গাইবান্ধা–বালাসীঘাট–বাহাদুরাবাদ ঘাট–জামালপুর সড়ককে আঞ্চলিক মহাসড়কের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় উল্লেখ রয়েছে। সড়কটির দৈর্ঘ্য উল্লেখ করা হয়েছে ৫০ দশমিক ৫০ কিলোমিটার। এটি বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। তবে কাগজে থাকা একটি রুটকে বাস্তব অর্থনৈতিক করিডরে পরিণত করতে হলে প্রয়োজন নদীর ওপর স্থায়ী সংযোগ। আর সেই সংযোগই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এবার প্রয়োজন সিদ্ধান্তের:
বালাসী–বাহাদুরাবাদ সেতু নির্মাণ সহজ কোনো প্রকল্প নয়। নদীর প্রস্থ, নাব্যতা, নদীর গতিপথ, ভূতাত্ত্বিক অবস্থা, পরিবেশগত প্রভাব, সম্ভাব্য ব্যয় এবং অর্থনৈতিক সুফল—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে। তাই প্রথমেই প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা যাচাই ও কারিগরি সমীক্ষা। এরপর প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, অর্থায়নের পথ এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের উদ্যোগ। আর মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তাঁরা অন্তত জানতে চান—সেতুটি আদৌ হবে কি না, হলে কবে এবং কীভাবে?
লেখক- তোফায়েল হোসেন জাকির, গণমাধ্যম কর্মী, গাইবান্ধা
লেখক- তোফায়েল হোসেন জাকির, গণমাধ্যম কর্মী, গাইবান্ধা 






















