বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাইবান্ধায় ৬ অভিযানে ৫৫৭ বস্তা সার জব্দ, নেপথ্যে কারা?

গাইবান্ধায় কৃষকদের জন্য বরাদ্দ এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রির কথা থাকা রাসায়নিক সার অবৈধভাবে মজুতের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে প্রশসান। গত ১৬ দিনে জেলার সুন্দরগঞ্জ, সাদুল্লাপুর ও ফুলছড়ি উপজেলায় পৃথক ছয়টি অভিযানে ৫৫৭ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জেলা কৃষি বিভাগ থেকে বলা হয়, ওইসব জব্দ সারের মধ্যে রয়েছে- ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি, এমওপি ও জিপসাম। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের মোট ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২৪ আগস্ট সুন্দরগঞ্জ উপজেলার একটি খুচরা সার বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ‘কুঞ্জ ট্রেডার্সে’ অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। নিয়মবহির্ভাবে সার মজুতের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় ১৮ বস্তা সার জব্দ করা হয়। পরে জব্দ করা সার কৃষকদের মধ্যে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এরপর ২৫ আগস্ট সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের উত্তর মন্দুয়ার এলাকায় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহীন সরকারের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় ৭২ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ছিল ১৩ বস্তা ইউরিয়া, ২৮ বস্তা জিপসাম, ১৬ বস্তা ডিএপি, ১৩ বস্তা টিএসপি ও ২ বস্তা পটাশ। এ ঘটনায় তাকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর মাত্র পাঁচ দিন পর, ৩০ আগস্ট, সাদুল্লাপুর উপজেলার কামারপাড়া বাজারে খুচরা সার ব্যবসায়ী মিথুন চন্দ্র বর্মন নান্টুর কাছ থেকে ২১১ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এ ঘটনায়ও তাকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এদিকে ৩১ আগস্ট রাতে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপড়হাটী ইউনিয়নের শোভাগঞ্জ বাজারে ‘মেসার্স আজাহার আলী’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে ২০৯ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ছিল ১০২ বস্তা ইউরিয়া ও ১০৭ বস্তা এমওপি সার। জব্দ করা সারের সরকারি মূল্য প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭০০ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির মালিককে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জব্দ করা সার সরকারি মূল্যে কৃষকদের কাছে বিক্রির কথা জানানো হয়।

অন্যদিকে ৬ সেপ্টেম্বর ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের হাজিরহাট এলাকায় ব্যবসায়ী এমদাদুল হক এন্তাজের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ২১ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ছিল ১৪ বস্তা টিএসপি ও ৭ বস্তা পটাশ। এ ঘটনায় তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

সর্বশেষ ৮ সেপ্টেম্বর ফুলছড়ি উপজেলার গাবগাছি এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও ২৬ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, মাত্র ১৬ দিনে ছয়টি অভিযানে ৫৫৭ বস্তা সার জব্দের ঘটনায় জেলার সার বিতরণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কৃষকদের জন্য বরাদ্দ করা সার কীভাবে ব্যক্তিগত বাড়ি কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বড় পরিমাণে মজুত হচ্ছে—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

কৃষকদের প্রশ্ন, সরকারি বরাদ্দের সার কোন পর্যায় থেকে সরছে? ডিলারদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতা বা অন্য কারও কাছে নিয়মবহির্ভূতভাবে সার যাচ্ছে কি না, বড় পরিমাণে সার মজুতের পেছনে কারা রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ডিলার, খুচরা বিক্রেতা ও মজুতকারীদের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে সার জব্দ ও জরিমানা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। জব্দ করা সারের উৎস, সরবরাহকারী এবং মজুতের উদ্দেশ্য শনাক্ত করা জরুরি। তা না হলে এক জায়গায় অভিযান হলেও অন্য জায়গায় একই ধরনের অবৈধ মজুত চলতে পারে।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো.  আসাদুজ্জামান জানান, কৃষকদের জন্য বরাদ্দ সার যাতে নির্ধারিত মূল্যে কৃষকের হাতে পৌঁছায়, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, অবৈধ মজুত, অতিরিক্ত দামে বিক্রি কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে সারের কোন সংকট নেই। চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন কৃষকরা। তবে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে সারের বরাদ্দ কত সেটি তাৎক্ষণিক জানাতে পারেননি তিনি।

জনপ্রিয়

গাইবান্ধায় ৬ অভিযানে ৫৫৭ বস্তা সার জব্দ, নেপথ্যে কারা?

প্রকাশের সময়: ০৬:৩৩:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গাইবান্ধায় কৃষকদের জন্য বরাদ্দ এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রির কথা থাকা রাসায়নিক সার অবৈধভাবে মজুতের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে প্রশসান। গত ১৬ দিনে জেলার সুন্দরগঞ্জ, সাদুল্লাপুর ও ফুলছড়ি উপজেলায় পৃথক ছয়টি অভিযানে ৫৫৭ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জেলা কৃষি বিভাগ থেকে বলা হয়, ওইসব জব্দ সারের মধ্যে রয়েছে- ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি, এমওপি ও জিপসাম। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের মোট ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২৪ আগস্ট সুন্দরগঞ্জ উপজেলার একটি খুচরা সার বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ‘কুঞ্জ ট্রেডার্সে’ অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। নিয়মবহির্ভাবে সার মজুতের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় ১৮ বস্তা সার জব্দ করা হয়। পরে জব্দ করা সার কৃষকদের মধ্যে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এরপর ২৫ আগস্ট সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের উত্তর মন্দুয়ার এলাকায় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহীন সরকারের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় ৭২ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ছিল ১৩ বস্তা ইউরিয়া, ২৮ বস্তা জিপসাম, ১৬ বস্তা ডিএপি, ১৩ বস্তা টিএসপি ও ২ বস্তা পটাশ। এ ঘটনায় তাকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর মাত্র পাঁচ দিন পর, ৩০ আগস্ট, সাদুল্লাপুর উপজেলার কামারপাড়া বাজারে খুচরা সার ব্যবসায়ী মিথুন চন্দ্র বর্মন নান্টুর কাছ থেকে ২১১ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এ ঘটনায়ও তাকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এদিকে ৩১ আগস্ট রাতে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপড়হাটী ইউনিয়নের শোভাগঞ্জ বাজারে ‘মেসার্স আজাহার আলী’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে ২০৯ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ছিল ১০২ বস্তা ইউরিয়া ও ১০৭ বস্তা এমওপি সার। জব্দ করা সারের সরকারি মূল্য প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭০০ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির মালিককে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জব্দ করা সার সরকারি মূল্যে কৃষকদের কাছে বিক্রির কথা জানানো হয়।

অন্যদিকে ৬ সেপ্টেম্বর ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের হাজিরহাট এলাকায় ব্যবসায়ী এমদাদুল হক এন্তাজের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ২১ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ছিল ১৪ বস্তা টিএসপি ও ৭ বস্তা পটাশ। এ ঘটনায় তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

সর্বশেষ ৮ সেপ্টেম্বর ফুলছড়ি উপজেলার গাবগাছি এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও ২৬ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, মাত্র ১৬ দিনে ছয়টি অভিযানে ৫৫৭ বস্তা সার জব্দের ঘটনায় জেলার সার বিতরণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কৃষকদের জন্য বরাদ্দ করা সার কীভাবে ব্যক্তিগত বাড়ি কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বড় পরিমাণে মজুত হচ্ছে—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

কৃষকদের প্রশ্ন, সরকারি বরাদ্দের সার কোন পর্যায় থেকে সরছে? ডিলারদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতা বা অন্য কারও কাছে নিয়মবহির্ভূতভাবে সার যাচ্ছে কি না, বড় পরিমাণে সার মজুতের পেছনে কারা রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ডিলার, খুচরা বিক্রেতা ও মজুতকারীদের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে সার জব্দ ও জরিমানা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। জব্দ করা সারের উৎস, সরবরাহকারী এবং মজুতের উদ্দেশ্য শনাক্ত করা জরুরি। তা না হলে এক জায়গায় অভিযান হলেও অন্য জায়গায় একই ধরনের অবৈধ মজুত চলতে পারে।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো.  আসাদুজ্জামান জানান, কৃষকদের জন্য বরাদ্দ সার যাতে নির্ধারিত মূল্যে কৃষকের হাতে পৌঁছায়, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, অবৈধ মজুত, অতিরিক্ত দামে বিক্রি কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে সারের কোন সংকট নেই। চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন কৃষকরা। তবে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে সারের বরাদ্দ কত সেটি তাৎক্ষণিক জানাতে পারেননি তিনি।