তোফায়েল হোসেন জাকির: ব্রহ্মপূত্র-যমুনা নদীর ওপর বালাসী-বাহাদুরাবাদ ঘাটে সেতু নির্মাণের দাবিতে ব্যতিক্রমী পদযাত্রায় নেমেছেন গাইবান্ধার বাবা-ছেলে। ‘আলোকিত বাংলার স্বপ্নযাত্রা, আমরা করব জয়’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে তাঁরা পায়ে হেঁটে একের পর এক জেলা পাড়ি দিচ্ছেন। লক্ষ্য, সাধারণ মানুষের মধ্যে সেতুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে জনসমর্থন তৈরি করা এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকায় গিয়ে সরকারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া।
পদযাত্রায় থাকা দুজন হলেন গাইবান্ধা সদর উপজেলার সাদেক চত্বর এলাকার বাসিন্দা অনারারি ক্যাপ্টেন (অব.) সাদেক আলী সরদার ও তাঁর ছেলে উদ্যোক্তা মোস্তাফিজুর রহমান। সাদেক আলী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্যারা কমান্ডো হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অবসর জীবনে তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক দাবিতে দীর্ঘ পথ হেঁটে পদযাত্রা করে আসছেন।
গত ১৬ আগস্ট গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসী ঘাট থেকে তাঁদের এবারের পদযাত্রা শুরু হয়। উদ্দেশ্য বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাটের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবিকে মানুষের সামনে তুলে ধরা।
পদযাত্রার শুরুতেই তাঁরা বিভিন্ন জেলা অতিক্রম করে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। সেতুটি নির্মিত হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কী ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে, তা তুলে ধরছেন তাঁরা।
যে পথে হেঁটে তারা ঢাকায় পৌঁছেন- গাইবান্ধা থেকে শুরু করে তাঁরা জয়পুরহাট, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, যশোর, বেনাপোল স্থলবন্দর, সাতক্ষীরা স্থলবন্দর, খুলনা, নড়াইল, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর হয়ে ঢাকায় পৌঁছাছেন এই বাবা ও ছেলে।
বিভিন্ন স্থানে পৌঁছানোর পর স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে তাঁরা কথা বলেন এবং সেতুর দাবির পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা করেন। স্থানীয়রা তাঁদের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, দেশের মানুষের কাছে দাবিটি পৌঁছে দিতে বাবা-ছেলের এত দীর্ঘ পথ হাঁটা প্রশংসনীয় এবং তিনি তাঁদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এটি তাঁদের ৭৫তম মিশন। সাদেক আলী সরদারের জন্য দীর্ঘপথ হাঁটা নতুন কোনো বিষয় নয়। তিনি জানান, এর আগে বাবা-ছেলে বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক দাবিতে ৭৪টি পদযাত্রা করেছেন। সব মিলিয়ে তাঁরা প্রায় ৩ হাজার ২৭৩ কিলোমিটার পথ হেঁটেছেন। এবারের কর্মসূচিকে তাঁরা তাঁদের ৭৫তম মিশন হিসেবে ১ হাজার কিলোমিটার পথ উল্লেখ করছেন।
এর আগের পদযাত্রাগুলোর মধ্যে বাল্যবিবাহ বন্ধসহ সমাজ ও দেশের কল্যাণে বিভিন্ন দাবিও ছিল। তাঁদের হাঁটার উদ্দেশ্য শুধু দূরত্ব অতিক্রম করা নয়; বরং মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বা জনস্বার্থের দাবি সামনে তুলে ধরা।
সাদেক আলী সরদার ও মোস্তাফিজুর রহমানের এই পদযাত্রার আরেকটি দিক হলো বাবা-ছেলের পারস্পরিক বন্ধন। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা একসঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হেঁটে বেড়াচ্ছেন।
আরও জানা যায়, ২০২২ সালেও এই বাবা-ছেলের জুটি তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রমের কর্মসূচি নিয়েছিলেন। তখনও তাঁরা জানিয়েছিলেন, দীর্ঘপথ হাঁটা তাঁদের কাছে একদিকে শরীরচর্চা, অন্যদিকে দেশকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ।
তাঁদের আগের মিশনগুলোর ধারাবাহিকতায় এবার পদযাত্রার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি নির্দিষ্ট জনদাবি—বালাসী-বাহাদুরাবাদ ঘাটে নদীর ওপর সেতু নির্মাণ।
স্থানীয়রা বলছেন- গাইবান্ধার ফুলছড়ির বালাসী ঘাট এবং জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট যমুনা নদীর দুই পাড়ের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগস্থল। দীর্ঘদিন ধরে এই দুই ঘাটের মধ্যে সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন উত্তরাঞ্চলের মানুষ।
একদিকে অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য বাবা, অন্যদিকে ব্যবসায়ী ছেলে—দুজনের হাতে পতাকা, সামনে দীর্ঘ পথ। তাঁদের প্রত্যাশা, হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছাবে বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতুর দাবি। তাঁদের এই ৭৫তম মিশন শেষ পর্যন্ত কতটা জনমত তৈরি করতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
বাবা-ছেলের ভাষ্য, বালাসী ঘাটে সেতু নির্মাণ শুধু গাইবান্ধাবাসীর দাবি নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত। সেতু নির্মাণ হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ আরও সহজ হতে পারে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে—এমন প্রত্যাশা তাঁদের।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা দুই বাবা-ছেলে গাইবান্ধার বালাসী ঘাটে সেতু চাই দাবীতে গাইবান্ধা জেলা থেকে পায়ে হেঁটে পদযাত্রা শুরু করি। ১৯ দিনে রাজশাহী বিভাগ, খুলনা বিভাগ ও ঢাকা বিভাগের ২০টি জেলা পায়ে হেঁটে প্রায় ১০০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ঢাকায় এসে অবস্থান করছি। আমাদের এই যাত্রার মূল লক্ষ্য উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা নিরসন এবং ‘বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু’ নির্মাণের যৌক্তিক দাবিটি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া।
তিনি আরও বলেন, বাবা-ছেলের এই দীর্ঘ পদযাত্রার শেষ গন্তব্য ঢাকা। নির্ধারিত রুট ধরে তাঁরা রাজধানীতে পৌঁছেন। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে মানববন্ধন শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ও সেতু ভবনে স্মারকলিপি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
এ বিষয়ে সাদেক আলী সরদার বলেন, বালাসী ঘাটে সেতু নির্মাণ গাইবান্ধাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি। তাই মানুষের কাছে এ দাবির গুরুত্ব তুলে ধরতেই তাঁরা বিভিন্ন জেলা ঘুরে পায়ে হাঁটছেন। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সমর্থন ও একাত্মতা তৈরি করতে চান তাঁরা।
এই পদযাত্রায় তাঁরা যেখানে যাচ্ছেন, সেখানকার মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, সেতুর প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করছেন এবং জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
তোফায়েল হোসেন জাকির, জাগো২৪.নেট 






















