দিনাজপুর জেলার সীমান্তবর্তী দুই ইউনিয়নের মধ্যখানে ফসলি মাঠে প্রকৌশলীদের বৈঠক বসেছিল। গ্রামের শত কৃষকের উৎসুক চোখ তাঁদের দিকে। জমির পাশ দিয়ে বইয়ে যাওয়া খাঁড়িতে সুইস গেইট হবে। খরা মৌসুমে আবাদি জমিতে জলের সুব্যবস্থা হবে। মাসখানেক পর সেখানে তৈরি হয় সুইস গেইট। বছর দুয়েক ধরে সেটি খোলা ও বন্ধের কাজও চলছিল। কিন্তু, গত ১০ বছর ধরে কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত সুইস গেইটটি কৃষকের কোন কাজে আসছে না। সুইস গেইট থেকে কোনো কৃষি সুবিধা না পেয়েই এসব কথা বলেন, কৃষক খলিলুর রহমান (৭২)।
অনেকটা অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে রয়েছে সুইস গেইটটি। গেইটটির অবস্থান দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার ২নং কাটলা ইউনিয়ন ও ৬নং জোতবানি ইউনিয়নের জোতবানী ও শৈলান গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া খাঁড়ির উপর নির্মিত।
এলাকার কৃষকরা দাবী করছেন, সরকার এতো টাকা খরচ করে সুইস গেইটটি কেনো তৈরি করেছেন তা আমাদের জানা নেই। গেইটটি নির্মানের কিছু দিন পরে আমরা জানতে পারি যে এটি খরা মৌসুমে কৃষকের কাজে লাগবে। এখন দেখছি সেটি আমাদের আর কোন কাজে আসছে না। শুধু সরকারের অর্থ অপচয় হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ২০০৮- ২০০৯ ইং অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এর অর্থায়নে ৪৫ লাখ ৩৭ হাজার ৩৩০ টাকা ব্যয়ে সুইস গেইটটি নির্মাণ করা হয়। ‘চিরির খাল ডাব্লিউআরএস নির্মাণ’ প্রকল্প নাম দিয়ে নির্মিত সুইস গেইটির নির্মাণ কাজ শেষ হয় ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর। এটি নির্মাণের দায়িত্বে ছিলেন নজরুল ইসলাম নামে একজন ঠিকাদার। বর্তমানে খাঁড়িতে হাঁটু পরিমাণ পানির প্রবাহ থাকলেও আবারও সেখানে নয় লাখ টাকা খরচ করে সুইস গেইটের উত্তর ও দক্ষিণ দিকের পশ্চিম পাড়ে দায়সারাভাবে এক বর্গফুট সাইজের সিসি ব্লক বসানোর কাজ চলমান রয়েছে। এটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন দিনাজপুরের মেসার্স মাহি এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারী মিন্টু নামে একজন ঠিকাদার। অপ্রয়োজনীয় সুইস গেইটের পাশে আবারও কেন সরকারের এত টাকা খরচ করে পাড় রক্ষার নামে ব্লক বসানোর কাজ করানো হচ্ছে এর কোনো সদুত্তোর দিতে পারেননি উপজেলা প্রকৌশলী কর্মকর্তা।
সুইস গেইট সংলগ্ন পশ্চিম পাশের সরিষা ক্ষেতে কাজ করছিলেন জোতবানী গ্রামের কৃষক শামসুল মণ্ডল (৬৭)। তিনি বলেন, সুইস গেইট তৈরি করার পর থেকে এটি আমাদের কোনো উপকারে আসে নাই। সরকার অযথায় এখানে এটি তৈরি করে লক্ষ লক্ষ টাকা নষ্ট করেছে। এছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে খাঁড়িটি খনন না করায় খরা মৌসুমে এই খাঁড়িতে কোনো পানি থাকে না। ফলে আমরা রবি শস্য উৎপাদনের সময় জমিতে পানি সেচ দিতে পারি না।
একই গ্রামের কৃষক খলিলুর রহমান বলেন, ‘সুইচ গেটের গাওত নাকি ন্যাকা আছে এটা তৈয়ার করতে ৪৫ লাখ ট্যাকা নাগিছে। হারে বাপু, ৪৫ লাখ ট্যাকার সুইস গেট তো হামার কোনো কামোতই নাগে না! কৃষকের তনে তৈয়ার করা সুইস গেট যদি কৃষকেরই কামোত না নাগে। তাইলে সরকারের এতো ট্যাকা খরচ করে কি হলো। হামরা তো সারাবছর ধরে স্যালোমেশিন দিয়ে পানি সেচেই সব ফসল আবাদ-সোবাদ করি।’
এলাকার কৃষকরা দাবি করছেন, ৪৫ লাখ টাকা খরচ করে খাঁড়ির উপর অপরিকল্পিতভাবে একটি সুইস গেইট তৈরি করা হয়েছে। এটি মাঠের মাঝখানে তৈরি করা হলে কৃষকরা এর সু-ফল পেতেন। এছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে খাঁড়িটির অনেক জায়গা পলিমাটি ও আবর্জনা দিয়ে ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে সময়মত পানি থাকে না। এতে করে যে সময় ফসলি জমিতে সেচের পানি দরকার হয়। ওই সময় পানি পাওয়া যায় না। কর্তৃপক্ষ যদি খাঁড়িটি খনন ও সুইস গেইট সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করেন তাহলে এলাকার কৃষকরা কিছুটা হলেও উপকৃত হবেন।
উপজেলা প্রকৌশলী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল সাদিক জাগো২৪.নেট-কে বলেন, চিরির খালের উপর সুইস গেইটটি কেনো নির্মাণ করা হয়েছে- তা আমার জানা নেই। তখন তো আমি এ উপজেলায় ছিলাম না। যতদূর জানি, স্থানীয় জোতবানি গ্রামের পাবসস (পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি) এখন এটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন। তবে সমিতির পক্ষে এটি খোলা ও বন্ধ করার দায়িত্বপ্রাপ্ত কে- তা আমি জানি না। রুটিন মেইনটেইন্সের কাজ হিসেবে বর্তমানে সুইস গেইটের উভয় পাশে নয় লক্ষ টাকা ব্যয়ে চিরির খালের পাড় রক্ষায় ব্লক বসানোর কাজ চলছে।

এবিএম মুছা, করেসপন্ডেন্ট জাগো২৪.নেট, বিরামপুর (দিনাজপুর) 



















