শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বালুচরের বাহন ঘোড়া গাড়ি

নদীবিধৌত গাইবান্ধার বুক চিরে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তাসহ আরও বেশ কিছু নদী-নদী। এসব নদীর বুকে জেগে ওঠেছে শতাধিক বালুচর। শুকনো মৌসুমে এসব চরাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের বাহন হিসেবে একমাত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি। এ অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন আত্নীয়-স্বজনদের বাড়িতে যাওয়া-আসাসহ নানা ধরণের মালামাল বহনে এই গাড়িতে তাদের বাহন।
সম্প্রতি গাইবান্ধার কামারজানি, ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জের চরগুলোতে গিয়ে দেখা যায় বালুপথে ঘোড়ার গাড়ি দাপিয়ে চলার চিত্র। কেউ বা যাচ্ছে আত্নীয় কিংবা প্রয়োজনী কাজে। আবার কেউ কেউ কৃষি ফসল বহন করে নিয়ে যাচ্ছে বাড়িতে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত দর্শনার্থীরাও শখে বসে ঘোড়ার গাড়িতে ঘুরছে।
জানা যায়, এক সময়ে গাইবান্ধার রাজপথে বাহন হিসেবে চলছিল ঘোড়ার গাড়ি। তা আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে রাজপথ থেকে হারিয়ে গেলেও, এখনো গাইবান্ধার বিভিন্ন চরাঞ্চলে অহরহ দেখা মেলে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি। এখানকার চরাঞ্চলে প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। তাদের বিশেষ প্রায়াজনে কিংবা নিত্যপণ্য নিয়ে ছুটতে হয় নদীর ওপার-এপারে। তবে বর্ষাকালে নৌকায় ছুটতে হলেও শুষ্ক মৌসুমে তাদের একমাত্র বাহন ঘোড়ার গাড়ি। ধূধূ বালুচরে এ গাড়িতে কৃষি ফসলসহ অন্যান্য মালামাল বহন করে থাকেন তারা। এছাড়াও আত্নীয়-স্বজনের বাড়িতে যেতে যাত্রী সেজে ঘোড়ার গাড়িতে চলেন অন্যত্র। শুধু চরাঞ্চলবাসী নয়, অনেকে শখে বসে ঘোড়ার গাড়িতে ছুটে চলেন চরের বিভিন্ন স্থানে।
ফজলুলপুর চরের কৃষক আকবর হোসেন জানান, বর্ষাকালে যোগাযোগের জন্য এই চরের মানুষগুলো নৌকাযোগে চলেন এপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তরে। আর শুকনো মৌসুমে চরবাসীর স্বপ্নের ফসল ভুট্রা, মিষ্টি কুমড়া, বাদাম, মরিচসহ  বিভিন্ন ফসল আনা-নেওয়া করতে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এই সমস্যা লাঘবে ঘোড়ার গাড়ি বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে লাখো মানুষ।
কালাশোনা চরের বাসিন্দা নজমল হক ব্যাপারী বলেন, বর্ষা মৌসুমে আমাদের চলাচলের কোন সমস্যা হয় না। নৌকা যোগে যেতে পারি গন্তব্যস্থানে। কিন্ত শুকনো মৌসুমে নদীর পানি কমে যাওয়ায় নৌযান প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে ঘোড়ার গাড়িই ভরসা আমাদের।
কামারজানি চরের আরেক কৃষক জোব্বার খন্দকার বলেন, আমাদের চরে উৎপাদিত ফসল নদীর ওপারে গাইবান্ধার বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি করতে হয়। যা বহন করতে ঘোড়ার গাড়িই একমাত্র ভরসা। এছাড়া যানবাহন হিসেবেও ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করে চরবাসী।
তাওহীদ তুষার নামের এক এনজিও কর্মী বলেন, গতকাল স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে দেওয়ানগঞ্জ হয়ে ময়মনসিংহে এসছিলাম। পানি কমে যাওয়ায় ভোগান্তি বেড়ে গেছে। আগে পানি কমে গেলেও ঘাটের কাছাকাছি নৌকা পাওয়া যেত আর এখন নদীর মধ্যেই দুইবার খেয়া নৌকা ও ঘোড়ার গাড়ি পরিবর্তন করতে হয়েছে। কিন্তু ঘাটের নৌকা ভাড়া কমায়নি ঘাট কর্তৃপক্ষ।
তিনি আরও বলেন, আগে মূল ঘাটে নেয়া হত ২৫০ টাকা। আর এখন মাঝ নদীতে গিয়েও ২৫০ টাকাই দিতে হচ্ছে। সবচেয়ে  বালুচরে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ার আনন্দ সবার উপভোগ করার মতো ছিল। অনেক আনন্দায়ক বলে অনুভূতি ব্যক্ত করেন এই কর্মী।
রসুলপুর চরের ঘোড়ার গাড়ির মালিক আমজাদ হোসেন জানান, শুকনো মৌসুমে প্রায় তিন মাস ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে থাকেন। এতে দৈনন্দিন প্রায় ৪০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত রোজগার হয়। এ দিয়েই সংসার চলে তার।
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মো. অলিউর রহমান জানান, জেলার বিশেষ করে বালাশাসী ঘাট ও ফুলছড়ি ঘাট এবং কামারজানি ঘাটে ঘোড়ার গাড়ি চোখে পড়ার মতো। বীরদর্পে চলছে যাত্রী ও পণ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি। এ যেন এক ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
তিনি আরও বলেন, চরাঞ্চল মানুষেরা জীবন মানোনয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং হচ্ছে। সেখানে বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অব্যাহত রয়েছে।

বালুচরের বাহন ঘোড়া গাড়ি

প্রকাশের সময়: ০১:৪০:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২২
নদীবিধৌত গাইবান্ধার বুক চিরে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তাসহ আরও বেশ কিছু নদী-নদী। এসব নদীর বুকে জেগে ওঠেছে শতাধিক বালুচর। শুকনো মৌসুমে এসব চরাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের বাহন হিসেবে একমাত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি। এ অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন আত্নীয়-স্বজনদের বাড়িতে যাওয়া-আসাসহ নানা ধরণের মালামাল বহনে এই গাড়িতে তাদের বাহন।
সম্প্রতি গাইবান্ধার কামারজানি, ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জের চরগুলোতে গিয়ে দেখা যায় বালুপথে ঘোড়ার গাড়ি দাপিয়ে চলার চিত্র। কেউ বা যাচ্ছে আত্নীয় কিংবা প্রয়োজনী কাজে। আবার কেউ কেউ কৃষি ফসল বহন করে নিয়ে যাচ্ছে বাড়িতে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত দর্শনার্থীরাও শখে বসে ঘোড়ার গাড়িতে ঘুরছে।
জানা যায়, এক সময়ে গাইবান্ধার রাজপথে বাহন হিসেবে চলছিল ঘোড়ার গাড়ি। তা আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে রাজপথ থেকে হারিয়ে গেলেও, এখনো গাইবান্ধার বিভিন্ন চরাঞ্চলে অহরহ দেখা মেলে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি। এখানকার চরাঞ্চলে প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। তাদের বিশেষ প্রায়াজনে কিংবা নিত্যপণ্য নিয়ে ছুটতে হয় নদীর ওপার-এপারে। তবে বর্ষাকালে নৌকায় ছুটতে হলেও শুষ্ক মৌসুমে তাদের একমাত্র বাহন ঘোড়ার গাড়ি। ধূধূ বালুচরে এ গাড়িতে কৃষি ফসলসহ অন্যান্য মালামাল বহন করে থাকেন তারা। এছাড়াও আত্নীয়-স্বজনের বাড়িতে যেতে যাত্রী সেজে ঘোড়ার গাড়িতে চলেন অন্যত্র। শুধু চরাঞ্চলবাসী নয়, অনেকে শখে বসে ঘোড়ার গাড়িতে ছুটে চলেন চরের বিভিন্ন স্থানে।
ফজলুলপুর চরের কৃষক আকবর হোসেন জানান, বর্ষাকালে যোগাযোগের জন্য এই চরের মানুষগুলো নৌকাযোগে চলেন এপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তরে। আর শুকনো মৌসুমে চরবাসীর স্বপ্নের ফসল ভুট্রা, মিষ্টি কুমড়া, বাদাম, মরিচসহ  বিভিন্ন ফসল আনা-নেওয়া করতে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এই সমস্যা লাঘবে ঘোড়ার গাড়ি বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে লাখো মানুষ।
কালাশোনা চরের বাসিন্দা নজমল হক ব্যাপারী বলেন, বর্ষা মৌসুমে আমাদের চলাচলের কোন সমস্যা হয় না। নৌকা যোগে যেতে পারি গন্তব্যস্থানে। কিন্ত শুকনো মৌসুমে নদীর পানি কমে যাওয়ায় নৌযান প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে ঘোড়ার গাড়িই ভরসা আমাদের।
কামারজানি চরের আরেক কৃষক জোব্বার খন্দকার বলেন, আমাদের চরে উৎপাদিত ফসল নদীর ওপারে গাইবান্ধার বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি করতে হয়। যা বহন করতে ঘোড়ার গাড়িই একমাত্র ভরসা। এছাড়া যানবাহন হিসেবেও ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করে চরবাসী।
তাওহীদ তুষার নামের এক এনজিও কর্মী বলেন, গতকাল স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে দেওয়ানগঞ্জ হয়ে ময়মনসিংহে এসছিলাম। পানি কমে যাওয়ায় ভোগান্তি বেড়ে গেছে। আগে পানি কমে গেলেও ঘাটের কাছাকাছি নৌকা পাওয়া যেত আর এখন নদীর মধ্যেই দুইবার খেয়া নৌকা ও ঘোড়ার গাড়ি পরিবর্তন করতে হয়েছে। কিন্তু ঘাটের নৌকা ভাড়া কমায়নি ঘাট কর্তৃপক্ষ।
তিনি আরও বলেন, আগে মূল ঘাটে নেয়া হত ২৫০ টাকা। আর এখন মাঝ নদীতে গিয়েও ২৫০ টাকাই দিতে হচ্ছে। সবচেয়ে  বালুচরে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ার আনন্দ সবার উপভোগ করার মতো ছিল। অনেক আনন্দায়ক বলে অনুভূতি ব্যক্ত করেন এই কর্মী।
রসুলপুর চরের ঘোড়ার গাড়ির মালিক আমজাদ হোসেন জানান, শুকনো মৌসুমে প্রায় তিন মাস ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে থাকেন। এতে দৈনন্দিন প্রায় ৪০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত রোজগার হয়। এ দিয়েই সংসার চলে তার।
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মো. অলিউর রহমান জানান, জেলার বিশেষ করে বালাশাসী ঘাট ও ফুলছড়ি ঘাট এবং কামারজানি ঘাটে ঘোড়ার গাড়ি চোখে পড়ার মতো। বীরদর্পে চলছে যাত্রী ও পণ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি। এ যেন এক ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
তিনি আরও বলেন, চরাঞ্চল মানুষেরা জীবন মানোনয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং হচ্ছে। সেখানে বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অব্যাহত রয়েছে।