বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

টেন্ডার ছাড়াই পুরোনো সেতু খুলে নিয়ে গেছেন ইউপি চেয়ারম্যান

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে নতুন করে সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে টেন্ডার ছাড়াই পুরোনো ভালো সেতুর অর্ধেকের বেশি অংশ খুলে নিয়ে গেছেন ইউপি চেয়ারম্যান মো. মোকলেছুর রহমান।

সংযোগ সড়ক না থাকা এবং সেতুর বাকি অংশ অপসারণ না করায় দুর্ভোগে পড়েছেন ওই এলাকার ৪ গ্রামের প্রায় ৫ হাজার মানুষ। মো. মোকলেছুর রহমান সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেতুটি ওই ইউনিয়নের দক্ষিণ রাজীবপুর গ্রামের উত্তর পাড়ার আলম মিয়ার বাড়ি সংলগ্ন। পুরনো সেতুটির অর্ধেকের বেশি অংশই নেই। ভেঙ্গে ভেঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেতুটির লোহা ও ইট। করা হয়নি কোনো সংযোগ সড়ক। চলাচলে সম্পুর্ণ অযোগ্য হয়ে শূন্যে ঝুলে আছে সেতুটির বাকি অংশ। সেতুর দু’পাশে সড়ক কেটে যাতায়াতের পথ তৈরি করেছেন স্থানীয়রা। সেটি দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে ছোটখাটো যানবাহন ও সাধারণ মানুষজন। এদিকে স্থানীয়দের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়িতে গেলে পুরাতন ইট স্তুপ করে রাখার দৃশ্য দেখা গেছে।

স্থানীয়রা জানান, চেয়ারম্যান সাহেব মাস খানেক আগে এখানে আসেন। সঙ্গে কয়েকজন লোকও ছিলেন। চেয়ারম্যান বলেন, নতুন ব্রীজ হবে এখানে। সে কারণে পুরোনো এই ব্রীজটি এখান থেকে অপসারণ করাতে হবে। আর আমি এ ব্রীজ ভেঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছি। এরপর থেকে চেয়ারম্যান ও তার ছেলে কাজের লোক লাগিয়ে ব্রীজটির ইট ও লোহা খোলা শুরু করেন। প্রায় ৮ থেকে ১০ দিন ধরে ইট ও লোহা খুলে খুলে চেয়ারম্যান তার বাড়িতে নিয়ে যান ট্রাক্টরে করে। হঠাৎ করে কাজ বন্ধ করে দেন চেয়ারম্যানের লোকজন। সেই থেকে ব্রীজের বাকী অংশ এভাবে শূন্যে ঝুলে আছে। আগে যানবাহনসহ মানুষজন চলাচল করতো। এখন যানবাহন তো দূরের কথা মানুষেই চলাচল করতে পারছে না। প্রায় এক মাস ধরে এ অবস্থা। চেয়ারম্যানের এ আচরণে ক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী। জানিয়েছেন তারা তাদের ক্ষোভের কথা।

দক্ষিণ রাজীবপুর গ্রামের মো. লাল মিয়া (৫৫) বলেন, “চেয়ারম্যান ও কনটাকটার এসে বলেন যে এখানে ব্রীজের টেন্ডার হয়েছে। সে কারণে পুরান ব্রীজ ভাংগি নিয়ে যাচ্ছি। এক সপ্তাহের মধ্যে ব্রীজ করি দেবো। বলেই ভাংগা শুরু করেন। আটদিন ধরি ইট, লোহা-লস্কর যা-যা আছে সবই নিয়ে গেছেন চেয়ারম্যান মোখলেছুর। প্রায় একমাস থাকি এ ভাবে পরে আছে ব্রীজটির বাকি অংশ। চলাচলে খুব সমস্যা হচ্ছে আমাদের।”

সেতুর পাশেই বাড়ি সিএনজি চালক মো. নজরুল ইসলামের (৪৭)। তিনি বলেন, “এখানেই আমার বাড়ি। আগে যা ছিলো তাতে চলাচল করা যেতো। এখন যে অবস্থা করেছে তাতে দুর্ভোগটা আরও বেড়েছে। আমি গাড়ি চালাই। দুর্ঘটনার ভয়ে এখান দিয়ে নামতেও পারি না উঠতেও পারি না।
তিনি আরও বলেন, সামনে বর্ষাকাল আসতেছে। এখানে দুই তিন মানুষ লম্বা পানি হবে। পাশেই স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা আছে। বাচ্চারা কি ভাবে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করবে মনে হলেই টেনশন ওঠে।”
উত্তর রাজীবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. সুজাউল হক চৌধুরী (৪৫) বলেন, “এটা পুরাতন ব্রীজ ছিলো। যাইহোক আমরা যাতায়াত করতাম। হঠাৎ করে দেখি চেয়ারম্যান এসে বললেন এটা ভেঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। নতুন করে ব্রীজ করা হবে এখানে। পরে দেখি কাজ ক্যানো জানি বন্ধ হয়ে আছে। আমাদের তো অনেক কষ্ট হচ্ছে। দ্রুত সমাধান না করা হলে চরম দুর্ভোগে পড়তে হবে আমাদের।”

কথা হয় ওই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. সৈকত হাসান লিটনের সাথে। তিনি বলেন, “বিষয়টি আমি জানতাম না। জনৈক এক ব্যক্তি ফোন করে আমাকে জানায়। পরে ব্রীজের কাছে গিয়ে দেখি ঘটনা সত্য। তখন ওখানে চেয়ারম্যান সাহেবের ছেলে ছিলেন। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি তার বাবার কথা বলেন। তখন চেয়ারম্যানকে ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে বিষয়টি ইউএনও ও পিআইও অফিসের লোককে জানাই। এ অবস্থার পর থেকে ৪ গ্রামের প্রায় ৫ হাজার লোকের যাতায়াতে কঠিন সমস্যা হচ্ছে।”

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য চেয়ারম্যান মো. মোখলেছুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তার বাড়িতে গেলে সাক্ষাৎ হয় অনেক কষ্টে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি রাগান্বিত হয়ে বলেন, “পিআইও অফিসে গিয়ে খোঁজ নেন। ব্রীজ টেন্ডারে আমি পেয়েছি। ভোটের কারণে কাজ আপাততঃ বন্ধ রেখেছি। ব্রীজের বাকি অংশ ভোটের পরে নিয়ে আসবো।”

চেয়ারম্যান কাজটি কোনোভাবেই ঠিক করেননি বিষয়টি স্বীকার করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মশিউর রহমান বলেন, বিষয়টি আমি জানতাম না। কোনো এক কাজে ওই এলাকায় গেলে পুরানো সেতুটি ভাঙ্গার বিষয়টি নজরে আসে। তখন চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলে নিষেধ করি। তবে পুরানো সেতুটি অপসারণ করতে টেন্ডারের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে বলেও জানান পিআইও।

এ বিষয়ে কথা হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলির সাথে। তিনি বলেন, “নিলাম ছাড়া ব্রীজটি ভেঙ্গে নিয়ে যাওয়া ঠিক করেননি ইউপি চেয়ারম্যান। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

টেন্ডার ছাড়াই পুরোনো সেতু খুলে নিয়ে গেছেন ইউপি চেয়ারম্যান

প্রকাশের সময়: ০৬:০২:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে নতুন করে সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে টেন্ডার ছাড়াই পুরোনো ভালো সেতুর অর্ধেকের বেশি অংশ খুলে নিয়ে গেছেন ইউপি চেয়ারম্যান মো. মোকলেছুর রহমান।

সংযোগ সড়ক না থাকা এবং সেতুর বাকি অংশ অপসারণ না করায় দুর্ভোগে পড়েছেন ওই এলাকার ৪ গ্রামের প্রায় ৫ হাজার মানুষ। মো. মোকলেছুর রহমান সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেতুটি ওই ইউনিয়নের দক্ষিণ রাজীবপুর গ্রামের উত্তর পাড়ার আলম মিয়ার বাড়ি সংলগ্ন। পুরনো সেতুটির অর্ধেকের বেশি অংশই নেই। ভেঙ্গে ভেঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেতুটির লোহা ও ইট। করা হয়নি কোনো সংযোগ সড়ক। চলাচলে সম্পুর্ণ অযোগ্য হয়ে শূন্যে ঝুলে আছে সেতুটির বাকি অংশ। সেতুর দু’পাশে সড়ক কেটে যাতায়াতের পথ তৈরি করেছেন স্থানীয়রা। সেটি দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে ছোটখাটো যানবাহন ও সাধারণ মানুষজন। এদিকে স্থানীয়দের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়িতে গেলে পুরাতন ইট স্তুপ করে রাখার দৃশ্য দেখা গেছে।

স্থানীয়রা জানান, চেয়ারম্যান সাহেব মাস খানেক আগে এখানে আসেন। সঙ্গে কয়েকজন লোকও ছিলেন। চেয়ারম্যান বলেন, নতুন ব্রীজ হবে এখানে। সে কারণে পুরোনো এই ব্রীজটি এখান থেকে অপসারণ করাতে হবে। আর আমি এ ব্রীজ ভেঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছি। এরপর থেকে চেয়ারম্যান ও তার ছেলে কাজের লোক লাগিয়ে ব্রীজটির ইট ও লোহা খোলা শুরু করেন। প্রায় ৮ থেকে ১০ দিন ধরে ইট ও লোহা খুলে খুলে চেয়ারম্যান তার বাড়িতে নিয়ে যান ট্রাক্টরে করে। হঠাৎ করে কাজ বন্ধ করে দেন চেয়ারম্যানের লোকজন। সেই থেকে ব্রীজের বাকী অংশ এভাবে শূন্যে ঝুলে আছে। আগে যানবাহনসহ মানুষজন চলাচল করতো। এখন যানবাহন তো দূরের কথা মানুষেই চলাচল করতে পারছে না। প্রায় এক মাস ধরে এ অবস্থা। চেয়ারম্যানের এ আচরণে ক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী। জানিয়েছেন তারা তাদের ক্ষোভের কথা।

দক্ষিণ রাজীবপুর গ্রামের মো. লাল মিয়া (৫৫) বলেন, “চেয়ারম্যান ও কনটাকটার এসে বলেন যে এখানে ব্রীজের টেন্ডার হয়েছে। সে কারণে পুরান ব্রীজ ভাংগি নিয়ে যাচ্ছি। এক সপ্তাহের মধ্যে ব্রীজ করি দেবো। বলেই ভাংগা শুরু করেন। আটদিন ধরি ইট, লোহা-লস্কর যা-যা আছে সবই নিয়ে গেছেন চেয়ারম্যান মোখলেছুর। প্রায় একমাস থাকি এ ভাবে পরে আছে ব্রীজটির বাকি অংশ। চলাচলে খুব সমস্যা হচ্ছে আমাদের।”

সেতুর পাশেই বাড়ি সিএনজি চালক মো. নজরুল ইসলামের (৪৭)। তিনি বলেন, “এখানেই আমার বাড়ি। আগে যা ছিলো তাতে চলাচল করা যেতো। এখন যে অবস্থা করেছে তাতে দুর্ভোগটা আরও বেড়েছে। আমি গাড়ি চালাই। দুর্ঘটনার ভয়ে এখান দিয়ে নামতেও পারি না উঠতেও পারি না।
তিনি আরও বলেন, সামনে বর্ষাকাল আসতেছে। এখানে দুই তিন মানুষ লম্বা পানি হবে। পাশেই স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা আছে। বাচ্চারা কি ভাবে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করবে মনে হলেই টেনশন ওঠে।”
উত্তর রাজীবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. সুজাউল হক চৌধুরী (৪৫) বলেন, “এটা পুরাতন ব্রীজ ছিলো। যাইহোক আমরা যাতায়াত করতাম। হঠাৎ করে দেখি চেয়ারম্যান এসে বললেন এটা ভেঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। নতুন করে ব্রীজ করা হবে এখানে। পরে দেখি কাজ ক্যানো জানি বন্ধ হয়ে আছে। আমাদের তো অনেক কষ্ট হচ্ছে। দ্রুত সমাধান না করা হলে চরম দুর্ভোগে পড়তে হবে আমাদের।”

কথা হয় ওই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. সৈকত হাসান লিটনের সাথে। তিনি বলেন, “বিষয়টি আমি জানতাম না। জনৈক এক ব্যক্তি ফোন করে আমাকে জানায়। পরে ব্রীজের কাছে গিয়ে দেখি ঘটনা সত্য। তখন ওখানে চেয়ারম্যান সাহেবের ছেলে ছিলেন। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি তার বাবার কথা বলেন। তখন চেয়ারম্যানকে ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে বিষয়টি ইউএনও ও পিআইও অফিসের লোককে জানাই। এ অবস্থার পর থেকে ৪ গ্রামের প্রায় ৫ হাজার লোকের যাতায়াতে কঠিন সমস্যা হচ্ছে।”

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য চেয়ারম্যান মো. মোখলেছুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তার বাড়িতে গেলে সাক্ষাৎ হয় অনেক কষ্টে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি রাগান্বিত হয়ে বলেন, “পিআইও অফিসে গিয়ে খোঁজ নেন। ব্রীজ টেন্ডারে আমি পেয়েছি। ভোটের কারণে কাজ আপাততঃ বন্ধ রেখেছি। ব্রীজের বাকি অংশ ভোটের পরে নিয়ে আসবো।”

চেয়ারম্যান কাজটি কোনোভাবেই ঠিক করেননি বিষয়টি স্বীকার করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মশিউর রহমান বলেন, বিষয়টি আমি জানতাম না। কোনো এক কাজে ওই এলাকায় গেলে পুরানো সেতুটি ভাঙ্গার বিষয়টি নজরে আসে। তখন চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলে নিষেধ করি। তবে পুরানো সেতুটি অপসারণ করতে টেন্ডারের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে বলেও জানান পিআইও।

এ বিষয়ে কথা হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলির সাথে। তিনি বলেন, “নিলাম ছাড়া ব্রীজটি ভেঙ্গে নিয়ে যাওয়া ঠিক করেননি ইউপি চেয়ারম্যান। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি।