অবকাঠামো আছে, আছে সরঞ্জাম। উদ্বোধন হওয়ার অন্তত ৪ বছর অতিবাহিত হলেও চালু হয়নি দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার রানীরবন্দর ১০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটির সেবা কার্যক্রম। উপজেলার নশরতপুর ইউনিয়নের রানীপুর গ্রামে রানীরবন্দর ১০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি অবস্থিত। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর জনবল বরাদ্দ না দেয়ায় এটি আজও চালু হয়নি। ফলে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আশপাশের এলাকার লোকজন। চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ ও ৪ বছর ধরে পরিত্যক্ত থাকায় ভবনের বেশির ভাগ জায়গা ধুলা, মাকড়শার জাল ও আগাছায় ভরে গেছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান চিকিৎসা যন্ত্রপাতি।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়ন ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অর্থায়নে পৌঁণে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রটি গত ২০২২ সালের ২৭ জুলাই উদ্বোধন করা হয়। আধুনিক অবকাঠামো, বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রটি বন্ধ। ব্যবহারের অভাবে যন্ত্রপাতিগুলো নষ্ট হতে বসেছে। এছাড়াও এক বছরের বেশি সময় বিদ্যুৎ বিল বাকি থাকায় যেকোনো সময় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নশরতপুর ইউনিয়নের রানীপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মো. সাপিয়ার রহমান বলেন, মানুষের সেবা দেয়ার জন্য সরকার এত টাকা ব্যয় করে হাসপাতালটি নির্মাণ করল। অথচ চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ দেয়া হয়নি। তাহলে এই হাসপাতালটি নির্মাণের কী প্রয়োজন ছিল? হাসপাতালটিতে চিকিৎসক থাকলে আশাপাশের নশরতপুর, সাতনালা, আলোকডিহি, তেঁতুলিয়া ও খানসামা উপজেলার গোয়ালডিহি ইউনিয়নের হাজারো মানুষের কত উপকারই না হতো। আমরা স্থানীয়রা চাই-দ্রুত হাসপাতালটিতে চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হোক।
স্থানীয় সাবেরউদ্দিন, রবিউল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত টাকা খরচ করে হাসপাতাল ভবন করা হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসাসেবা চালু হলো না। এখন ভবনটি পড়ে আছে।
রানীপুর গ্রামের ইউপি সদস্য মশিউর রহমান জানান, রানীরবন্দর ১০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি চালু হলে নশরতপুর, সাতনালা, তেঁতুলিয়া, আলোকডিহি এবং খানসামা উপজেলার গোয়ালডিহি ইউনিয়নের হাজারো মানুষ উপকৃত হতেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে আরও বলেন, হাসপাতালের আধুনিক ভবন, চিকিৎসার সরঞ্জাম ও চিকিৎসকদের থাকার আবাসিক ভবন সবই আছে। কিন্তু কি কারণে একজনও লোক নিয়োগ দেয়া হয়নি সরকার। কেন্দ্রে কোনো চিকিৎসক না থাকায় বাধ্য হয়ে গর্ভবতী মা ও শিশুদের চিকিৎসার জন্য রানীরবন্দরের বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা ১৬ কিলোমিটার দূরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ নিলফামারীর সৈয়দপুর এবং দিনাজপুরে নিয়ে যেতে হয়। তিনি আরও জানান, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় সপ্তাহে দুইদিন একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার রাখা হয়েছে। তিনি জ্বর-সর্দিসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ দেন।
রানীরবন্দর ১০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে আউট সোর্সিংয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচ্ছন্নকর্মী বেলাল হোসেন জানান, হাসপাতালটি উদ্বোধনের পর থেকে আমি পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে কাজ করে আসছি। কিন্তু হঠাৎ করে গত ১৬ মাস ধরে বেতন পাচ্ছি না। আমার বাড়ি থেকে হাসপাতালে যাতায়াত করতে দৈনিক দেড়শ’ টাকা খরচ হয়। যেহেতু আমি কোনো বেতন-ভাতা পাচ্ছি না, তাই সপ্তাহে একদিন করে গিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে চলে আসি। এভাবে আর কত দিন বেতন-ভাতা ছাড়াই কাজ করবো?
মো. বাচ্চু মিয়া জানান, আমি হাসপাতালটি নির্মাণের সময় থেকে দিনরাত সবধরনের মালামাল দেখাশোনা ও দায়িত্ব পালন করে আসছি। অথচ আমি কোনো বেতন-ভাতা পাই না। আমাকে চাকুরির মাস্টার রোলেও রাখা হয়নি।
উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আরমান জনি জানান, অবকাঠামো পুরোপুরি নির্মাণ করা হলেও ১৬ জনের বিপরীতে কোনো জনবল এখনও মন্ত্রণালয় বা সরকার থেকে অনুমোদন দেয়া হয়নি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ও জনগণের দোড়গড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে জরুরি জনবল বরাদ্দ দেয়া হলে বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার যন্ত্রপাতিগুলো নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা যেত। তিনি আরও জানান, এমতাবস্থায় তাঁরা ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পদায়ন করেছেন। তিনি সেখানে সপ্তাহে দুইদিন প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে থাকেন।
মো. রফিকুল ইসলাম, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট, চিরিরবন্দর (দিনাজপুর) 









