গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে রমজান মাসকে পুঁজি করে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নিত্যপন্যের দাম। বাড়তি দামের চাপে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। বিশেষ করে নিম্ন ও স্থির আয়ের মানুষজন। বিক্রেতাদের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি ও বাজারে প্রশাসনের নজরদারি নেই। এ দুই কারণে বাজারমূল্যে এ নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে দাবি সাধারণ ক্রেতাদের।
মীরগঞ্জ হাটে কথা হয় মাদ্রাসা শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, রমজান মাস হলো পবিত্র মাস। এ মাস আল্লাহর ইবাদতের মাস। এ মাসে বেশি ছওয়াবের আশায় মানুষ ভালো কাজ করেন। কিন্তু বাজার করতে এসে মনে হচ্ছে এখানে ঠিক তার উল্টোটা। কোনো শৃঙ্খলা নেই। নেই কোথাও সাঁটানো বাজার মূল্যের তালিকা। মনগড়া দাম নিচ্ছেন বিক্রতারা। কোনো নজরদারি নেই প্রশাসনের। সে কারণে নিরুপায় ক্রেতারা।
তিনি আরও বলেন, প্রতি মাসে নির্ধারিত একটা বেতন পাই। সেটার উপরেই বৃদ্ধ বাবা-মা, তিন ছেলেমেয়ে এবং আমরা দু’জন। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, বাবা-মায়ের ঔষধের খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়। রমজানের বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। দরকারী সব জিনিসপত্র নিতে পারিনি। যেগুলো নিয়েছি সেগুলোরও অর্ধেক করে নিয়েছি।
কথা হয় আরেক ক্রেতা মো. আমিনুল ইসলামের (৫৫) সাথে। পেশায় তিনি একজন রিক্সা চালক। পৌরসভার কাঁচা বাজারে কথা হলে তিনি বলেন, শরীর ভালো না। সে কারণে আগের মতো রিক্সা চালাতে পারি না। সারাদিনে যা কামাই করেছি তা দিয়ে চাউল, লবণ, তেল, আর মাছ নিয়েছি। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। সে কারণে এতেই টাকা শেষ। বাকি দরকারী জিনিসপত্র নিতে পারলাম না। এখন আগামী কাল নিতে হবে। তখন দেখা যাবে হয়তোবা আরেকটা খরচ শেষ হয়েছে। আর এ ভাবেই চলতে হবে আমাদের এ মাস।
গত দুইদিনে সুন্দরগঞ্জ পৌরসভা ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকার হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ইফতার সামগ্রী পণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বেড়েছে জিনিসপত্রে। আর এর প্রভাব পড়েছে মুরগী, মাছ ও কাঁচাবাজারেও। যে ছোলা রমজানের আগে বিক্রি হতো ৮০ টাকা কেজি। সেই ছোলা এখন কিনতে হচ্ছে একশো টাকা কেজি। মাঝামাঝি খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২৬০ টাকা কেজি। যে খেজুর রমজানের আগে বিক্রি হতো ২২০ টাকা কেজি। কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে সয়াবিন তেলেও। দাম বেড়েছে চিনিতেও। দেশী মুরগী বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা কেজি। কয়েকদিন আগে এ মুরগির কেজি ছিলো ৫০০ টাকা। সোনালী মুরগী বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ টাকা কেজি। কয়েকদিন আগে ছিলো ৩৫০ টাকা করে কেজি। বয়লার মুরগির কেজিতেও বেড়েছে ৫০ টাকা করে। মাছ বাজারেও একই অবস্থা। বর্তমানে এক কেজি ওজনের রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা। যা রোজার আগে ছিলো ২৬০ টাকা। এছাড়াও কার্ফু ও কাতলমাছে বেড়েছে কেজিতে ৫০ টাকা করে। ইফতার সামগ্রীর অন্যতম উপকরণ লেবু। প্রতি হালা লেবু এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা, যা আগে ছিলো ৩০ টাকা। শশার কেজি ছিলো ৫০ টাকা। এখন বিক্রি হচ্ছে কেজি ৮০ টাকা। ২০ টাকা কেজি দরের ফুলকপি এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা। ৫০ টাকা কেজি দরের বেগুন বর্তমান বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা। করল্লা বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা কেজি। যা রোজার আগে ছিলো ৭০ টাকা। এছাড়াও আদা, রসুন, পেয়াজ ও মরিচসহ সবধরনের নিত্যপন্যের দাম বেড়েছে।
সুন্দরগঞ্জ পৌর কাঁচা বাজারের মারুফ স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. মারুফ মিয়া বলেন, রমজানকে পুঁজি করে কমবেশি সবধরনের নিত্য পন্যের দাম বেড়েছে। এখানে আসলে আমাদের করার কিছুই নাই। কমদামে কিনতে না পারলে বিক্রি করবো কি ভাবে। বেশি দামে কিনতে হয় আমাদের।
ব্যবসায়ী মারুফ মিয়া ক্ষোভ জানিয়ে আরও বলেন, সয়াবিন তেল কোথাও পাচ্ছি না। মহাজনেরা বলছেন, সয়াবিন তেল নাই। দাম বাড়াতে তাঁরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন।
কাঁচামাল ব্যবসায়ী মো. হামিদুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন কম এবং চাহিদা বেশি, সে কারণেই সব ধরনের পণ্যে দাম বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, দাম কমা বাড়া আমাদের হাতে নেই। আমরা যেভাবে ক্রয় করি সেভাবেই বিক্রি করি।
একই কথা বলেন মাছ ব্যবসায়ী শ্রী মাধব ও মুরগী ব্যাবসায়ী মো. ফুলু বসুনিয়া। তারা বলেন, কমদামের কিনতে না পারলে বিক্রি করবো কি ভাবে। বরং বেশি দামে ক্রয় করলে লাভ কম হয় আমাদের। পাশাপাশি দরদামে ঝগড়া লেগেই থাকে। সেই সাথে ক্যাশও বেশি যোগান দিতে হয়।
এ বিষয়ে কথা হয় সুন্দরগঞ্জ পৌর কাঁচা বাজার ব্যবসায়ী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. লাল মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমবেশিতে তাঁদের করার কিছুই নাই। এটা ক্রেতা এবং বিক্রেতাদের বিষয়। এখানে আমাদের কোনো করণীয় নেই।
এ বিষয়ে কথা হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলির সাথে। তিনি বলেন, রমজানকে পুঁজি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না। এখনো বাজার মনিটরিং এ নামা হয়নি। তবে খুব দ্রুত সময়ে মনিটরিং এর ব্যবস্থা করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে ইউএনও বলেন, কোনো দোকানে সাঁটানো নেই বাজার মূল্যের তালিকা বিষয়টি দুঃখ জনক। মনিটরিং এ গেলে এ বিষয়েও খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিবেন বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
এ বিষয়ে কথা হয় স্থানীয় সাংসদ মো. মাজেদুর রহমানের সাথে। তিনি দ্রুত এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আশ্বাস দেন।
জাহিদ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট 















