দুই দফা বদলির আদেশ জারি হলেও কর্মস্থল ছাড়েননি দুই সাংবাদিক হেনস্তার ঘটনায় বিতর্কিত গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিন। সর্বশেষ গত ২৪ জুন তাকে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় বদলি করা হলেও দেড় মাস পেরিয়ে গেছে। এখনো সেখানে যোগদান না করে তিনি সাদুল্লাপুরেই বহাল রয়েছেন বলে জানা গেছে।
গত ২৪ জুন রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের অফিস আদেশে ‘জনস্বার্থে’ জসিম উদ্দিনকে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে বদলি করা হয়। আদেশে বদলি অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে গত ২০ এপ্রিল একই কার্যালয়ের আদেশে তাকে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই আদেশও কার্যকর হয়নি। পরপর দুই দফা বদলির পরও একই কর্মস্থলে বহাল থাকায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, সরকারি আদেশের কার্যকারিতা ও তার প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১৮ জুন সরকারের অর্পিত সম্পত্তি-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক জিল্লুর রহমান পলাশ ও হেদায়েতুল ইসলাম বাবুর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও হেনস্তার অভিযোগে আলোচনায় আসেন জসিম উদ্দিন। ঘটনাটি নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দৃশ্যে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলে বিভাগীয় পর্যায়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গত ২১ জুন গাইবান্ধা সার্কিট হাউসে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে তদন্ত কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। এর তিন দিনের মাথায় ২৪ জুন তার বদলির আদেশ জারি হয়।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—‘কী এমন মধু আছে সাদুল্লাপুরে, যে দুই দফা বদলির আদেশের পরও কর্মস্থল ছাড়ছেন না এসিল্যান্ড?’ কেউ কেউ বলছেন, কিসের মায়ায় তিনি সাদুল্লাপুরে থাকতে মরিয়া—নাকি কোনো বিশেষ সুবিধা, প্রভাব কিংবা স্থানীয় কোনো বলয়ের কারণে বদলি ঠেকানোর চেষ্টা চলছে? কোন ‘খুঁটির জোরে’ সরকারি আদেশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না, এর সঙ্গে কোন প্রভাবশালী নেতা-আমলার ছায়ায় তিনি বহাল রয়েছেন—তা দ্রুত খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, একটি প্রভাবশালী মহলের তদবির ও লবিংয়ের মাধ্যমে বদলি আদেশ ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, তদবির করে বদলি স্থগিত বা বিলম্বিত করার পেছনে কারা রয়েছেন এবং কারা তাকে সাদুল্লাপুরে বহাল রাখতে চেষ্টা করছেন—তা নিরপেক্ষ তদন্তে বের করা হোক।
এদিকে গত ২৪ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে জসিম উদ্দিন সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পদোন্নতি পেলেও তার বদলি কার্যকর না হওয়ায় প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে—কোন প্রক্রিয়ায় একজন কর্মকর্তার বদলি আদেশ দীর্ঘ সময় বাস্তবায়ন ছাড়াই ঝুলে থাকে? সাংবাদিক হেনস্তার ঘটনায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিক সংগঠন ও প্রেসক্লাবগুলোর পক্ষ থেকেও তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে।
অন্যদিকে, ফ্যামিলি কার্ড শুমারি কর্মী নিয়োগের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ নিয়োগপ্রত্যাশী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একাংশ বিক্ষোভ করেন এবং এসিল্যান্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবি জানান।
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল থাকা ও তার কথিত প্রভাব-বলয় নিয়েও উপজেলাজুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়দের পাশাপাশি কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি শুধু একজন কর্মকর্তার বদলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সরকারি আদেশের কার্যকারিতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও চেইন অব কমান্ডের প্রশ্ন জড়িত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই জায়গায় দায়িত্ব পালনের কারণে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে এবং এ যোগাযোগকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে উঠেছে। এছাড়া ভূমিসেবা, খাসজমি, নামজারি ও সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে আচরণ নিয়েও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পাওয়া জসিম উদ্দিন ২০২৪ সালের অক্টোবরে সাদুল্লাপুরে যোগদান করেন। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, যোগদানের পর তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।
অপরদিকে, বদলির আদেশ জারি হলেও তাকে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসনের কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) পর্যন্ত এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এসিল্যান্ড মো. জসিম উদ্দিনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, বদলির আদেশের পরও দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল থাকা সরকারি সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও আদেশের প্রতি জনআস্থা—তিনটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। কেন বদলি আদেশ কার্যকর হচ্ছে না, এর পেছনে কোনো প্রভাব, তদবির বা প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে কি না—তা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে বদলি আদেশ অবিলম্বে বাস্তবায়ন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট 


















