রবিবার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মোক একনা ঘর নিয়্যা দেও বাহে!

তোফায়েল হোসেন জাকির: হামার স্বামী মেলাদিন আগে মরছে। ছৈলপৈলও (সন্তান) নাই। মানসের বাড়িত এনা কাজকাম করি খাচুনু, সেটাও আর পাম না। শরীলের ওগ-বালাই সড়ে না। পুরানা ঘরটা ভাঙি গেচে, জোড়াতালি দিয়্যা আচোম। ঝড়ি-বাতাসের ভয়ে আতোত নিন্দে ধরে না। মোক একনা সরকারি ঘর নিয়্যা দেও বাহে! তোমারগুলার জন্নে ভগবানের কাছে আশির্বাদ করমো।

সরেজমিনে শুক্রবার (১১ জুন) আঞ্চলিক ভাষায় এমনভাবে কথাগুলো বলছিলেন বিধবা সিন্দুবালা সরকার নামের এক বৃদ্ধা। তার বাড়ি গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের তরফবাজিত (দক্ষিণপাড়া) গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মৃত মনিন্দ্র নাথ সরকারের স্ত্রী।

জানা যায়, বিধবা সিন্দুবালা সরকার (৬১)’র স্বামী মনিন্দ্র নাথ সরকার। প্রায় ৫ বছর আগে মারা গেছেন। দাম্পত্য জীবনে নেই কোনো সন্তানাদি। মৃত্যুকালে রেখে গেছেন মাত্র কয়েক শতক জমি। এছাড়া সিন্দুবালার নেই কোনো সহায়-সম্বল। ইতোমধ্যে বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়লেও জীবিকার তাগিদে ছুটতে হচ্ছে কৃষকের মাঠে বা অন্যের দুয়ারে। বেঁচে থাকার তাগিদে কখনো কৃষকের ফসলি জমিতে শ্রম বিক্রি, আবার কখনো অন্যের বাড়িতে করতে হয় ঝি’র কাজ। এভাবে জীবিকা নির্বাহ করে চলছেন সিন্দুবালা। কিন্তু বিধিবাম! ওইসব কাজের জন্যও কদর কমেছে তার। কারণ একটাই, বার্ধক্য বয়স ও নানা অসুস্থতার কারণে এলাকার মানুষ তাকে এখন কাজের জন্য তেমনটা ডাকেন না। ফলে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে সিন্দুবালাকে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ওই বিধবার একমাত্র শোবার ঘরটিও জীর্ণসির্ণ অবস্থা। ছিদ্র টিনের চালায় লাগানো হয়েছে পলিথিন ও ট্রিপল। দিনের বেলায় বেড়ার ফুটো দিয়ে দেখা যায় সুর্য্যের আলো। রাতে চালার উপরে দিয়ে নজরকাড়ে আসমানের তারা। জোড়াতালি এ ভাঙা ঘরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করে চলছেন সিন্দুবালা। এক মুঠো অন্নের যোগানে সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে রাতে ঠিকভাবে ঘুমাবেন কিন্ত চোখে আসে না ঘুম। ঝড়-বৃষ্টির আতঙ্কে একাকী নির্ঘুম রাত কাটে তার। বর্ষাকালে আকাশের মেঘ দেখলে দৌঁড় দিতে হয় অন্যের বাড়িতে। আর শীতকালে কনকনে বাতাস আর কুয়াশায় ভিজে যায় বিছানাপত্র। নানা প্রতিকুলতার মধ্যে ঝুঁকিপুর্ণ এ ঘরে বসবাসের কারণে বিভিন্ন রোগ বাসা বেঁধেছে সিন্দুবালার শরীরে। এসব রোগ নিরাময়ে নিয়মিত ওষুধ খাবেন, এমন সামর্থও নেই তার। একেবারই জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়ে কোনোমতে বেঁচে রয়েছে ওই ভাঙা ঘরটিতে। সরকারি সুবিধাবঞ্চিত এই বিধবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জরাজীর্ণ ঘরেই একাকী বসাবাস করে চলছেন। এখন মৃত্যুর আগে সরকারি বরাদ্দের একটি পাকাঘরে ঘুবাবেন, এমনটাই আশা করছেন তিনি।

স্থানীয় একাধিক সচেতন ব্যক্তি সিন্দুবালার দুর্দশার সত্যতা স্বীকার করে জাগো২৪.নেট-কে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহতী উদ্যোগ গৃহহীনদের পুর্নবাসন কল্পে সাদুল্লাপুর উপজেলায় ‘জমি আছে, ঘর নেই’ প্রকল্প বাস্তবায়ধীন রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় সিন্দুবালাকে পুর্নবাসন করে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

এসব তথ্য নিশ্চিত করে অশ্র শিক্ত চোখে বিধবা সিন্দুবালা বলেন, সরকারি বরাদ্দে ঘর পাবার জন্যে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও, কাগজপত্র জমা নেয়নি কেউই। তাই প্রধানমন্ত্রী যদি আমাকে একটি ঘর স্থাপন করে দিতেন, তাহলে হয়তো শেষ বয়সে শান্তিতে ঘুমাতে পারতাম।

জামালপুর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য মনজু মিয়া ওই বিধবার জরাজীর্ণ ঘরের সত্যতা স্বীকার করে জাগো২৪.নেট-কে জানান, ‘জমি আছে, ঘর নেই’প্রকল্পে সুবিধাভোগিদের তথ্য ইতোমধ্যে অনলাইন করা হয়েছে। সেই সময়ে সিন্দুবালা বাড়িতে ছিলেন না। এ কারণে তার নামটি অনলাইন করা সম্ভব হয়নি।

 

জনপ্রিয়

মোক একনা ঘর নিয়্যা দেও বাহে!

প্রকাশের সময়: ১২:২৩:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ জুন ২০২১

তোফায়েল হোসেন জাকির: হামার স্বামী মেলাদিন আগে মরছে। ছৈলপৈলও (সন্তান) নাই। মানসের বাড়িত এনা কাজকাম করি খাচুনু, সেটাও আর পাম না। শরীলের ওগ-বালাই সড়ে না। পুরানা ঘরটা ভাঙি গেচে, জোড়াতালি দিয়্যা আচোম। ঝড়ি-বাতাসের ভয়ে আতোত নিন্দে ধরে না। মোক একনা সরকারি ঘর নিয়্যা দেও বাহে! তোমারগুলার জন্নে ভগবানের কাছে আশির্বাদ করমো।

সরেজমিনে শুক্রবার (১১ জুন) আঞ্চলিক ভাষায় এমনভাবে কথাগুলো বলছিলেন বিধবা সিন্দুবালা সরকার নামের এক বৃদ্ধা। তার বাড়ি গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের তরফবাজিত (দক্ষিণপাড়া) গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মৃত মনিন্দ্র নাথ সরকারের স্ত্রী।

জানা যায়, বিধবা সিন্দুবালা সরকার (৬১)’র স্বামী মনিন্দ্র নাথ সরকার। প্রায় ৫ বছর আগে মারা গেছেন। দাম্পত্য জীবনে নেই কোনো সন্তানাদি। মৃত্যুকালে রেখে গেছেন মাত্র কয়েক শতক জমি। এছাড়া সিন্দুবালার নেই কোনো সহায়-সম্বল। ইতোমধ্যে বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়লেও জীবিকার তাগিদে ছুটতে হচ্ছে কৃষকের মাঠে বা অন্যের দুয়ারে। বেঁচে থাকার তাগিদে কখনো কৃষকের ফসলি জমিতে শ্রম বিক্রি, আবার কখনো অন্যের বাড়িতে করতে হয় ঝি’র কাজ। এভাবে জীবিকা নির্বাহ করে চলছেন সিন্দুবালা। কিন্তু বিধিবাম! ওইসব কাজের জন্যও কদর কমেছে তার। কারণ একটাই, বার্ধক্য বয়স ও নানা অসুস্থতার কারণে এলাকার মানুষ তাকে এখন কাজের জন্য তেমনটা ডাকেন না। ফলে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে সিন্দুবালাকে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ওই বিধবার একমাত্র শোবার ঘরটিও জীর্ণসির্ণ অবস্থা। ছিদ্র টিনের চালায় লাগানো হয়েছে পলিথিন ও ট্রিপল। দিনের বেলায় বেড়ার ফুটো দিয়ে দেখা যায় সুর্য্যের আলো। রাতে চালার উপরে দিয়ে নজরকাড়ে আসমানের তারা। জোড়াতালি এ ভাঙা ঘরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করে চলছেন সিন্দুবালা। এক মুঠো অন্নের যোগানে সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে রাতে ঠিকভাবে ঘুমাবেন কিন্ত চোখে আসে না ঘুম। ঝড়-বৃষ্টির আতঙ্কে একাকী নির্ঘুম রাত কাটে তার। বর্ষাকালে আকাশের মেঘ দেখলে দৌঁড় দিতে হয় অন্যের বাড়িতে। আর শীতকালে কনকনে বাতাস আর কুয়াশায় ভিজে যায় বিছানাপত্র। নানা প্রতিকুলতার মধ্যে ঝুঁকিপুর্ণ এ ঘরে বসবাসের কারণে বিভিন্ন রোগ বাসা বেঁধেছে সিন্দুবালার শরীরে। এসব রোগ নিরাময়ে নিয়মিত ওষুধ খাবেন, এমন সামর্থও নেই তার। একেবারই জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়ে কোনোমতে বেঁচে রয়েছে ওই ভাঙা ঘরটিতে। সরকারি সুবিধাবঞ্চিত এই বিধবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জরাজীর্ণ ঘরেই একাকী বসাবাস করে চলছেন। এখন মৃত্যুর আগে সরকারি বরাদ্দের একটি পাকাঘরে ঘুবাবেন, এমনটাই আশা করছেন তিনি।

স্থানীয় একাধিক সচেতন ব্যক্তি সিন্দুবালার দুর্দশার সত্যতা স্বীকার করে জাগো২৪.নেট-কে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহতী উদ্যোগ গৃহহীনদের পুর্নবাসন কল্পে সাদুল্লাপুর উপজেলায় ‘জমি আছে, ঘর নেই’ প্রকল্প বাস্তবায়ধীন রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় সিন্দুবালাকে পুর্নবাসন করে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

এসব তথ্য নিশ্চিত করে অশ্র শিক্ত চোখে বিধবা সিন্দুবালা বলেন, সরকারি বরাদ্দে ঘর পাবার জন্যে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও, কাগজপত্র জমা নেয়নি কেউই। তাই প্রধানমন্ত্রী যদি আমাকে একটি ঘর স্থাপন করে দিতেন, তাহলে হয়তো শেষ বয়সে শান্তিতে ঘুমাতে পারতাম।

জামালপুর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য মনজু মিয়া ওই বিধবার জরাজীর্ণ ঘরের সত্যতা স্বীকার করে জাগো২৪.নেট-কে জানান, ‘জমি আছে, ঘর নেই’প্রকল্পে সুবিধাভোগিদের তথ্য ইতোমধ্যে অনলাইন করা হয়েছে। সেই সময়ে সিন্দুবালা বাড়িতে ছিলেন না। এ কারণে তার নামটি অনলাইন করা সম্ভব হয়নি।