গ্রামাঞ্চলে কোন মহিলামানুষের চা বিক্রি করা কল্পনাই করা যায় না। অথচ এরকম অসম্ভব,অকল্পনীয় কাজটিই করে যাচ্ছেন সাঁথিয়ার মনোয়ারা বেগম।একটানা দীর্ঘ ১৯ বছর চা বিক্রি করছেন তিনি।মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পাশে তার চা’র দোকানে সব সময় কাস্টমারদের ভিড় লেগেই থাকে।মুক্তিযোদ্ধা সংসদে দীর্ঘ বছর তিনিই চা সরবরাহ করে আসছেন।মুক্তিযোদ্ধারাও তার হাতের চা খেয়ে পরিতৃপ্ত হন। অধিকাংশ কাস্টমাররা তাকে খালা বলে ডাকে।তবে তিনি ইবাদতের মা নামেই বেশি পরিচিত। চা বিক্রি করা সামান্য আয় দিয়ে অনেক কষ্টে চলছে তার সাত সদস্যের পরিবার।
মনোয়ারা বেগম জানান, ’৭১ সালে পাবনা সদরের দোহার পাড়া রং ব্যবসায়ী শাকের শেখের সাথে তার বিয়ে হয়। স্বামীর সাথে ১৩ বছর ঘর সংসার করার পর ৩ ছেলে ১ মেয়ে রেখে স্বামী অন্যত্র চলে যায়। ছেলে মেয়েদের নিয়ে মনোয়ারা চোখে আধার দেখতে শুরু করেন। কান্নাজড়িত কন্ঠে মনোয়ারা এ প্রতিনিধিকে জানান, হাতে কোন টাকা, কড়ি না থাকায় ক্রমাগত ৭ দিন পর্যন্ত শুধু মুড়ি খেয়ে নিজে ও তার ছেলে মেয়েদের জীবন বাঁচাতে হয়েছে। কোন উপায়ান্ত না দেখে প্রায় ২০ বছর আগে ১৯৯১ সালে মনোয়ারা পেটের তাগিদে ও ছেলে মেয়েদের মানুষ করার জন্য কাজের খোঁজে চলে আসেন পাবনার সাঁথিয়ায়। শুরুতে উপজেলার বিভিন্ন অফিস আদালতে ঝাড়–দার হিসেবে, বিভিন্ন হোটেলে থালা-বাসন ধোয়া মুছার কাজ করেন।
এছাড়াও একটি এনজিওতে আয়ার কাজ করেও সংসার না চলায় অবশেষে সাঁথিয়া উপজেলা সদরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সামনে একটি চালা ঘরে চা বিক্রির কাজ শুরু করেন। এদিকে ‘‘মরার উপর খাড়ার ঘায়ের’’ মতো তার সংসারে আবার যুক্ত হয়েছে এক বিধবা বোন। বসবাসের জন্য নিজস্ব কোন জায়গা জমি না থাকায় জেলা পরিষদের পরিত্যক্ত জায়গায় ছাপরা ঘরে কোনমতে মাথা গুঁজে আছেন তিনি। সাঁথিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী প্রধান শিক্ষক তোফাজ্জল হোসেন জানান,অনেক বছর মনোয়ারার চা খেয়ে আসছি।পুরুষ শাসিত সমাজে সে একজন সংগ্রামী মহিলা।কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত না পেতে চা বিক্রি করে সংসার চালায়। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আ: লতিফ জানান,মনোয়ারা দীর্ঘ বছর চা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছে।আমরা তার দোকান থেকেই চা খাই।
এ দোকানের নিয়মিত কাস্টমার মজনু,টিটো প্রমুখ বলেন, খালা খুব ভাল চা বানায়। টেনেটুনে, কায়ক্লেশে কোনমতে সংসার চললেও এ যাবৎ কোন রকম সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তার ক্ষোভেরও অন্ত নেই।সম্প্রতি অনেকেই সরকারি জমি,ঘর পেলেও তার ভাগ্যে জোটেনি আশ্রয়ণপ্রকল্পের একটি ঘর।
জীবনসংগ্রামী মনোয়ারা জানান, সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পেলে চা-বিক্রির পেশা বদলিয়ে একটি ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতাম।

মনসুর আলম খোকন, করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট, সাঁথিয়া (পাবনা) 















