কৃষিক্ষেত্রে সবজি চাষে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও বিভিন্ন প্রকার কীটনাশক ব্যবহারে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে বর্তমান আমাদের দেশে সার ও কীটনাশকমুক্ত সবজি খাওয়ার কথা শুধু কল্পনাই করা যায় কিন্তু পাওয়া যায় না। এর মধ্যেই ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার বাসুলীসহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা। চলতি মৌসুমে উপজেলা কৃষি বিভাগের পরামর্শে ভোক্তাকে নিরাপদ শাক-সবজি খাওয়ানোর সংকল্পে বিষমুক্ত সবজি চাষ করছেন কৃষক ও কৃষাণীরা। শীত মৌসুম থেকে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব, রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ছাড়াই নিরাপদ সবজি চাষাবাদ করছেন তারা। তবে এসব নিরাপদ সবজির দাম অন্যান্য সবজির চেয়ে কিছুটা বেশি বলে জানান কৃষকরা। এসব চাষকৃত নিরাপদ সবজির অধিকাংশ কৃষকই হলেন উপজেলার আলোকঝাড়ী ইউনিয়নের বাসুলী গ্রামের বাসিন্দা। ইতিপূর্বেও এলাকায় নিরাপদ সবজি চাষে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন কৃষক ও কৃষাণীরা।
উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, পরিবেশ বান্ধব কৌশলের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদন প্রকল্পের আওতায় চলতি বছর বাসুলী গ্রামে ১.৮ একর এবং উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচীর মাধ্যমে ৩ একরসহ উপজেলায় ৪.৮ একর জমিতে নিরাপদ সবজি চাষ হয়েছে। এতে কৃষকদের সার্বক্ষণিক সহায়তা ও পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষি বিভাগ। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামের চারদিক সবুজ সবজির ক্ষেতে ভরা। কৃষকরা জানান, উপজেলা কৃষি বিভাগের প্রশংসনীয় এ উদ্যোগে বাসুলী, শুশুলী ও ফরিদাবাদসহ বিভিন্ন গ্রামে চাষ হচ্ছে বিষমুক্ত চালকুমড়া, করলা, পটল, শসা, বেগুন ও পানিকুমড়া। এসব জমির মাঝে-মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে সেক্সফেরোমন ফাঁদ। এটি হচ্ছে কীটপতঙ্গ দমন পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে প্লাস্টিক বক্স ব্যবহার করা হয়। যার দু’পাশে তিন কোণা ফাঁক থাকে। পুরুষ পোকাকে আকৃষ্ট করতে স্ত্রী পোকার শরীর থেকে নি:সৃত এক রকম রাসায়নিক পদার্থ বা স্ত্রী পোকার গন্ধ ব্যবহার করা হয় ফাঁদে। এর আকর্ষণে পুরুষ পোকা ফাঁদের দিকে ধেয়ে আসে এবং ফাঁদে পড়ে মারা যায়। এতে করে জমির ফসল নিরাপদ থাকে। অতীতে এসব কীট দমনে ব্যবহার হতো বিষাক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক। সেক্সফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করায় জমির ফসল নিরাপদ থাকছে। এছাড়াও রাসায়নিক সারের পরিবর্তে ব্যবহার করছে জৈব ও কেচোঁ সার।
আহমদ আলী নামে এক কৃষক জাগো২৪.নেট-কে জানান, কয়েক বছর আগে আমরা জমিতে কীটনাশক স্প্রে করে বিভিন্ন জাতের শাকসবজি আবাদ করেছি। তবে আমরা জানাতাম না এতে ফসল বিষাক্ত হয় এবং এসব খেয়ে মানুষ নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হন। কৃষি বিভাগের কাছ থেকে জানতে পারি, কীটনাশক ব্যবহারে জমির ফসল বিষে পরিণত হয় এবং মাটির উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেলে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি মানুষকে আর বিষ খাওয়াব না। বর্তমানে আমাদের গ্রামের সবাই নিরাপদ সবজি চাষ করছেন।
কৃষাণী সুমি আক্তার বলেন, বাজারে বিষমুক্ত সবজির দাম বেশি হওয়ায় অল্প খরচে ভালো টাকা উপার্জন করা সম্ভব। বাজারে বিষমুক্ত সবজির চাহিদাও বেশি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বাসুদেব রায় জাগো২৪.নেট-কে বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্দেশনায় উপজেলায় নিরাপদ সবজি চাষ করতে এসব গ্রামের কৃষকদের সংগঠিত করে জৈবিক পদ্ধতি ব্যবহার করে স্বাস্থ্য সম্মত সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করা হয়। স্বাস্থ্য সম্মত ফসল উৎপাদনের সুফল বুঝতে পেরে কৃষকরা সহজেই এ পদ্ধতিতে আগ্রহী হয়ে উঠেন। তাই বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষক গ্রুপ, উঠান বৈঠকসহ হাতে-কলমে কৃষকদেরকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকেন। এতে কৃষকরা লাভবান হচ্ছে এবং ক্রেতারাও নিরাপদ সবজি পাচ্ছে।
মো. রফিকুল ইসলাম, করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট, চিরিরবন্দর (দিনাজপুর) 

















