মো. রফিকুল ইসলাম: অযত্ন আর অবহেলায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রাজবংশের শেষ নিদর্শন দিনাজপুরের রাজবাড়ি দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। কালক্রমে রাজপ্রাসাদে থাকা মূল্যবান ও দুর্লভ জিনিসপত্র চুরি হয়ে যাচ্ছে। রাত হলেই রাজবাড়িতে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। দেখতে এসে দর্শনার্থী ও পর্যটকরা হতাশ হয়ে ফিরে যান। সচেতন মহলের দাবি, প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলে এটি হতে পারতো পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান। দেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি রক্ষায় সরকারের নজর দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। দিনাজপুর শহর থেকে ৪ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে নিরিবিলি মনোরম এক গ্রাম্য পরিবেশে হিন্দু, মুসলিম ও ইংরেজ-এ তিন যুগের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের চিত্রসংবলিত রাজবাড়িটি অবস্থিত।
ইতিহাস থেকে জানা গেছে, দিনাজপুরের রাজবংশের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ৪শ’ বছর ধরে অন্তত ১৬৬ একর জায়গা জুড়ে আস্তে আস্তে গড়ে উঠেছিল বিশাল প্রাসাদ। রাজবাড়িতে ছিল-আয়না মহল, রানি মহল ও ঠাকুরবাড়ি মহল। এছাড়াও ফুলবাগ, হীরাবাগ, সবজিবাগ, পিলবাগ, দাতব্য চিকিৎসা, অতিথি ভবন, প্রশাসনিক ভবন, কর্মচারীদের আবাসিক এলাকাসহ প্রাসাদের মধ্যে কয়েকটি বিরাট দিঘি রয়েছে। দ্বিতল আয়না মহলের নিচে-ওপরে মিলে ২২টি করে ৪৪টি কক্ষ রয়েছে। এই ভবনে মূল্যবান মার্বেল পাথর ও স্টটিকমতি খচিত ছিল। এছাড়াও রাজপ্রাসাদ এলাকায় জলসাগর, তোশাখানা ও পাঠাগার প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভবন এ মহলে অবস্থিত। আয়না মহলের উত্তরে রানির দেউড়ি পেরিয়ে রানি মহল অবস্থিত। রাজপরিবারের ইতিহাস নিয়ে জনমুখে রয়েছে নানা কাহিনী। যতদূর জানা যায়, দিনাজ রাজা অথবা দিনরাজ রাজা রাজবাড়ি তথা রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। তার নামানুসারেই দিনাজপুর জেলার নামকরণ করা হয়েছে।
জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে তৎকালীন মহারাজা জগদীশ চন্দ্র নাথ সপরিবারে ভারতে চলে যান। এরপর এটি পাকিস্তান সরকার পরিত্যক্ত ঘোষণা করে ইপিআরদের একটি ব্যাটালিয়ানের অফিস করা হয়। ইপিআর হেড কোয়ার্টার হওয়ার পর তারা চলে যায়। পরবর্তী সময় তৎকালীন সরকার সেখানে পিডিবি (পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড) স্থাপন করে। নিজস্ব ভবন হওয়ার পর ৬৬/৬৭-এর দিকে তারাও চলে গেলে এ বাড়িটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। এরপর থেকেই এ প্রাসাদে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হতে থাকে।
দিনাজপুরের রাজবাড়ি একদিকে যেমন জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থান, অন্যদিকে এটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য পুণ্যস্থান। রাজবাড়ির মন্দিরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি রয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই সেখানে পূজা-অর্চনা ও কীর্তন হয়ে থাকে। দিনাজপুরের রাজবাড়িতে কান্তজিউ আসার পর থেকে প্রতিদিনই এখানে ভোগ দেয়া হয়। এছাড়াও এ প্রাসাদের ভিতরে দুর্গাদেবীর মন্দির রয়েছে। এ মন্দিরে দুর্গাপূজার সময় হাজার হাজার ভক্তের সমাগম হয়ে থাকে। এর বাইরে বিশাল মেলা বসে। এ মেলায় শুধু হিন্দুরা নয়, অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকজনেরও সমাগম ঘটে। আরো জানা গেছে, রাজপ্রাসাদের ভিতরের ঘরগুলো বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে-এমন আশঙ্কায় কেউ ভিতরে প্রবেশ করে না। তবে এর ভিতরের দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর ও মনোরম। প্রাসাদের রুমগুলোতে কেউ বসবাস না করায় সেগুলোতে বিভিন্ন লতাপাতা ও গাছ জন্মেছে। রুমগুলো তৈরি করতে যে লোহার প্রয়োজন হয়েছিল সেগুলোও বর্তমানে চুরি হয়ে যাচ্ছে। আয়না মহল, রানি মহলের মূল্যবান মার্বেল পাথর, স্টটিকমতি, অসংখ্য স্টিলের বিশাল বিশাল বিমগুলো দিনের পর দিন অপরাধীচক্র পাচার করে আসছে। কোটি কোটি টাকার মালামাল সেখান থেকে চুরি হয়ে গেছে।
দিনাজপুর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি স্বরুপ বকসী বাচ্চু বলেন, সরকারি সহযোগিতা পেলেও এ স্থাপনার উন্নয়ন করলে রাজবাড়িতে পর্যটকের ভিড় বৃদ্ধি পাবে।
এ রাজবাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায় চলে যাওয়ার পর অদ্যাবধি এটি রক্ষণাবেক্ষণের বা সংস্কারের উদ্যোগ কেউ নেয়নি বলে জানান, রাজ দেবোত্তর এস্টেটের এজেন্ট রঞ্জিত সিংহ। তিনি আরও জানান, আমরা কেবলমাত্র দেবোত্তর এস্টেটের অংশের দেখাশোনা করি। বাকি অংশ আরকোলজি দেখে থাকে। তারা কোনো উন্নয়ন করেনি। তবে প্রত্নতত্ত্বিক বিভাগ বরাদ্দের জন্য চেষ্টা করতে পারে।
মো. রফিকুল ইসলাম, করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট, চিরিরবন্দর (দিনাজপুর) 















