শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চাকরি ছেড়ে পাট-হোগলা পাতার কারুপণ্যে সফল আজাদ

কারখানায় কাজ করে অন্তত ৫ শতাধিক পরিবারে এসেছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা। পণ্যের গুণগত মান ভালো এবং রপ্তানি বৃদ্ধিসহ দেশীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে
মো. রফিকুল ইসলাম: পাট আর হোগলা পাতা দিয়ে তৈরি কারুপণ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মধ্যদিয়ে স্বপ্ন পূরণ করছেন প্রকৌশলীর চাকুরি ছেড়ে দেয়া কায়দুজ্জামান আজাদ (৩৫)। তিনি নিজেকে করে তুলেছেন একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে। তার কারখানায় কাজ করে অন্তত ৫ শতাধিক পরিবারে এসেছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা। পণ্যের গুণগত মান ভালো এবং রপ্তানি বৃদ্ধিসহ দেশীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আলোকঝাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব বাসুলী গ্রামে কালাম চেয়ারম্যান পাড়ায় আত্রাই নদীর তীরে নিজস্ব সম্পত্তিতে গড়ে তুলেছেন রংজুট বিডি নামের একটি কারুপণ্য কারখানা।
সরজমিনে দেখা গেছে, কারখানায় সুঁই-সূতা দিয়ে পাট আর হোগলা পাতার নিত্যনতুন কারুপণ্য তৈরি করতে ব্যস্ত নারী-পুরুষরা। অপরদিকে, আধুনিক সরঞ্জামাদিও ব্যবহার করে পণ্য তৈরির কাজ চলছে। স্থানীয় প্রশিক্ষিত নারী শ্রমিকরা পাট ও হোগলা পাতা দিয়ে হোগলা বাস্কেট, ফ্লোর রাক্স, ওয়ার ডেকর, ফ্লোর ম্যাট, পাপোশ, ডোর ম্যাট, আয়না ও দোলনাসহ বিভিন্ন কারুপণ্য তৈরি করছেন। পরে এসব পণ্য সরবরাহের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি করা হচ্ছে এখানকার উৎপাদিত কারুপণ্য। এখানকার উৎপাদিত কারুপণ্য অনলাইনের মাধ্যমেও বিক্রি করা হচ্ছে। বিশ্ব বাজারে পাটের তৈরি পণ্যের চাহিদা বেশ ভালো থাকায় আশানুরুপ দামও পাচ্ছেন।
কর্মরত কয়েকজনের সাথে কথা হলে তারা জানান, কারখানাটিতে ৪০ জন নারী-পুরুষ স্থায়ীভাবে কাজ করেন। অনেকেই বাড়ির কাজের পাশাপাশি এসব কারুপণ্য তৈরি করে কাঙ্খিত পণ্য সরবরাহ করছেন। এতে অন্তত ৫ শতাধিক নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। শ্রমিকরা প্রতিমাসে ৭-৮ হাজার টাকা বেতন পান। শুধু তাই নয়-শ্রমিকরা মূল বেতনের সাথে কাজের ওপর বোনাসও পেয়ে থাকেন। বাইরে যারা এ কাজের সাথে সম্পৃক্ত তারা কাজের ভিত্তিতে পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। শান্তিবালা (৬০) বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ বাহে! শেষ বয়সে আর কেহই মোক (আমাকে) কাজে নিতে চায় না। পেটের ক্ষুদার তাড়নায় এইখানে কাম (কাজ) করি। এইখানে কাম করিয়া কিছু পাইসা কামাই (রোজগার) করি। তা দিয়্যা (দিয়ে) মোর (আমার) সংসার চলে।
নারী শ্রমিক রুবিনা বেগম বলেন, ‘আমি এখানে ৭-৮ মাস যাবৎ কাজ করছি। আমার দুই ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করছে। এখানে কাজ করে যে বেতন পাই তা দিয়ে ছেলেমেয়েদের খরচসহ সংসারের জন্য হলেও কাজে লাগে।
কারখানায় কর্মরত সাহেবানী বলেন, ‘বাড়িতে বসে না থেকে এখানে কাজ করে কিছু টাকা আয় করলে সংসারের জন্য উপকারে আসে। বাড়ি থেকে এখানে যাতায়াত করাও সহজ।
কারখানার কোয়ালিটিম্যান আনারুল ইসলাম বলেন, ‘বাড়ির নিকট এ কোম্পানি হওয়ায় এলাকার অনেক লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এতে আমরা অনেক খুশি।
তরুণ উদ্যোক্তা প্রকৌশলী কায়দুজ্জামান আজাদ (৩৫) জানান, টেক্সটাইল বিষয়ে লেখাপড়া শেষ করে ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকুরি করতাম। চাকুরি করার সময় নজরে আসে এই কারুপণ্য তৈরির কাজ ও বিশ্ববাজারে তার চাহিদা। ২০১৬ সালে শহর থেকে গ্রামে ফিরে এসে ঢাকার বিভিন্ন কোম্পানির নিকট প্রাথমিক ধারণাসহ অর্ডার নিয়ে ৮-১০ জন শ্রমিক নিয়ে আমার কারখানার যাত্রা শুরু হয়।  শুরু থেকে এ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে ৮৫-৯০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয় কারখানাটিতে। অনেক সময় কোম্পানিতে ভর্তুকিও দিতে হয়। সময়ের সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে কাজের পরিধি ও কর্মসংস্থান। প্রতিমাসে কাঁচামাল, শ্রমিকদের মজুরি, বিদ্যুৎবিল ও আনুষাঙ্গিক খরচ ১৮-২০ লাখ টাকা ব্যয় মিটিয়ে তাঁর এক থেকে দেড় লাখ টাকা আয় হয়। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এক্সপার্ট কোম্পানির সাথে চুক্তিভিত্তিক এই কারুপণ্যগুলো রপ্তানি করা হয়। প্রতিমাসে গড়ে ৪০-৫০ লাখ টাকার পণ্য রপ্তানি করা হয়। এছাড়াও প্রতিনিয়ত দেশিয় বিভিন্ন কোম্পানিসহ ঢাকা, খুলনা ও রংপুরের বিভিন্ন শো-রুমে পণ্য সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে তার কারখানায় ৫০০-৬০০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তিনি আরো জানান, সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা পেলে কাজের পরিধি আরো বৃদ্ধি করা সম্ভব। যা আমার স্বপ্ন বাস্তবায়নসহ অত্রাঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরো বৃদ্ধি পাবে।

চাকরি ছেড়ে পাট-হোগলা পাতার কারুপণ্যে সফল আজাদ

প্রকাশের সময়: ০৮:৩১:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৪
কারখানায় কাজ করে অন্তত ৫ শতাধিক পরিবারে এসেছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা। পণ্যের গুণগত মান ভালো এবং রপ্তানি বৃদ্ধিসহ দেশীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে
মো. রফিকুল ইসলাম: পাট আর হোগলা পাতা দিয়ে তৈরি কারুপণ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মধ্যদিয়ে স্বপ্ন পূরণ করছেন প্রকৌশলীর চাকুরি ছেড়ে দেয়া কায়দুজ্জামান আজাদ (৩৫)। তিনি নিজেকে করে তুলেছেন একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে। তার কারখানায় কাজ করে অন্তত ৫ শতাধিক পরিবারে এসেছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা। পণ্যের গুণগত মান ভালো এবং রপ্তানি বৃদ্ধিসহ দেশীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আলোকঝাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব বাসুলী গ্রামে কালাম চেয়ারম্যান পাড়ায় আত্রাই নদীর তীরে নিজস্ব সম্পত্তিতে গড়ে তুলেছেন রংজুট বিডি নামের একটি কারুপণ্য কারখানা।
সরজমিনে দেখা গেছে, কারখানায় সুঁই-সূতা দিয়ে পাট আর হোগলা পাতার নিত্যনতুন কারুপণ্য তৈরি করতে ব্যস্ত নারী-পুরুষরা। অপরদিকে, আধুনিক সরঞ্জামাদিও ব্যবহার করে পণ্য তৈরির কাজ চলছে। স্থানীয় প্রশিক্ষিত নারী শ্রমিকরা পাট ও হোগলা পাতা দিয়ে হোগলা বাস্কেট, ফ্লোর রাক্স, ওয়ার ডেকর, ফ্লোর ম্যাট, পাপোশ, ডোর ম্যাট, আয়না ও দোলনাসহ বিভিন্ন কারুপণ্য তৈরি করছেন। পরে এসব পণ্য সরবরাহের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি করা হচ্ছে এখানকার উৎপাদিত কারুপণ্য। এখানকার উৎপাদিত কারুপণ্য অনলাইনের মাধ্যমেও বিক্রি করা হচ্ছে। বিশ্ব বাজারে পাটের তৈরি পণ্যের চাহিদা বেশ ভালো থাকায় আশানুরুপ দামও পাচ্ছেন।
কর্মরত কয়েকজনের সাথে কথা হলে তারা জানান, কারখানাটিতে ৪০ জন নারী-পুরুষ স্থায়ীভাবে কাজ করেন। অনেকেই বাড়ির কাজের পাশাপাশি এসব কারুপণ্য তৈরি করে কাঙ্খিত পণ্য সরবরাহ করছেন। এতে অন্তত ৫ শতাধিক নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। শ্রমিকরা প্রতিমাসে ৭-৮ হাজার টাকা বেতন পান। শুধু তাই নয়-শ্রমিকরা মূল বেতনের সাথে কাজের ওপর বোনাসও পেয়ে থাকেন। বাইরে যারা এ কাজের সাথে সম্পৃক্ত তারা কাজের ভিত্তিতে পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। শান্তিবালা (৬০) বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ বাহে! শেষ বয়সে আর কেহই মোক (আমাকে) কাজে নিতে চায় না। পেটের ক্ষুদার তাড়নায় এইখানে কাম (কাজ) করি। এইখানে কাম করিয়া কিছু পাইসা কামাই (রোজগার) করি। তা দিয়্যা (দিয়ে) মোর (আমার) সংসার চলে।
নারী শ্রমিক রুবিনা বেগম বলেন, ‘আমি এখানে ৭-৮ মাস যাবৎ কাজ করছি। আমার দুই ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করছে। এখানে কাজ করে যে বেতন পাই তা দিয়ে ছেলেমেয়েদের খরচসহ সংসারের জন্য হলেও কাজে লাগে।
কারখানায় কর্মরত সাহেবানী বলেন, ‘বাড়িতে বসে না থেকে এখানে কাজ করে কিছু টাকা আয় করলে সংসারের জন্য উপকারে আসে। বাড়ি থেকে এখানে যাতায়াত করাও সহজ।
কারখানার কোয়ালিটিম্যান আনারুল ইসলাম বলেন, ‘বাড়ির নিকট এ কোম্পানি হওয়ায় এলাকার অনেক লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এতে আমরা অনেক খুশি।
তরুণ উদ্যোক্তা প্রকৌশলী কায়দুজ্জামান আজাদ (৩৫) জানান, টেক্সটাইল বিষয়ে লেখাপড়া শেষ করে ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকুরি করতাম। চাকুরি করার সময় নজরে আসে এই কারুপণ্য তৈরির কাজ ও বিশ্ববাজারে তার চাহিদা। ২০১৬ সালে শহর থেকে গ্রামে ফিরে এসে ঢাকার বিভিন্ন কোম্পানির নিকট প্রাথমিক ধারণাসহ অর্ডার নিয়ে ৮-১০ জন শ্রমিক নিয়ে আমার কারখানার যাত্রা শুরু হয়।  শুরু থেকে এ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে ৮৫-৯০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয় কারখানাটিতে। অনেক সময় কোম্পানিতে ভর্তুকিও দিতে হয়। সময়ের সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে কাজের পরিধি ও কর্মসংস্থান। প্রতিমাসে কাঁচামাল, শ্রমিকদের মজুরি, বিদ্যুৎবিল ও আনুষাঙ্গিক খরচ ১৮-২০ লাখ টাকা ব্যয় মিটিয়ে তাঁর এক থেকে দেড় লাখ টাকা আয় হয়। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এক্সপার্ট কোম্পানির সাথে চুক্তিভিত্তিক এই কারুপণ্যগুলো রপ্তানি করা হয়। প্রতিমাসে গড়ে ৪০-৫০ লাখ টাকার পণ্য রপ্তানি করা হয়। এছাড়াও প্রতিনিয়ত দেশিয় বিভিন্ন কোম্পানিসহ ঢাকা, খুলনা ও রংপুরের বিভিন্ন শো-রুমে পণ্য সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে তার কারখানায় ৫০০-৬০০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তিনি আরো জানান, সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা পেলে কাজের পরিধি আরো বৃদ্ধি করা সম্ভব। যা আমার স্বপ্ন বাস্তবায়নসহ অত্রাঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরো বৃদ্ধি পাবে।