মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৮ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ঝুঁকিপূর্ণ-জরাজীর্ণ ভবনে পাঠদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী আতঙ্কে

দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় ৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস করছেন। এতে শিক্ষক- শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে। অপরদিকে, মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এসব বিদ্যালয়ের ভবনের ছাদগুলোতে দেখা দিয়েছে ফাটল। কোথাও কোথাও প্লাস্টার খসে পড়ছে এবং রড বেরিয়ে দেখা যাচ্ছে। এতে ক্লাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সর্বদা আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। তারপরেও বিদ্যালয়গুলোতে এসব ভবনেই চলছে পাঠদান। এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকেরা দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের দাবি করেছেন।

জানা গেছে, উপজেলার কৌগাঁও পাঠানপাড়া, বেলপুকুর, আঙ্গারপাড়া ও পূর্ব নলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই কোনো আধুনিক ভবন, নেই উপযুক্ত অবকাঠামো। এসব বিদ্যালয়ের ভবনগুলো জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিদ্যালয়গুলোর ভবনের ছাদে ফাটল দেখা দিয়েছে। রড বেরিয়ে গেছে। এসব বেরিয়ে যাওয়া রডে মরিচা ধরেছে। কোথাও কোথাও প্লাস্টার খসে পড়ছে। এতে ক্লাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সর্বদা আতঙ্কের মধ্যে থাকেন।

স্থানীয় ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ভাবকী ইউনিয়নের কৌগাঁও পাঠানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৭-৯৮ অর্থ বছর এলজিইডির অর্থায়নে একতলা ভবন নির্মিত হয়। যা বর্তমানে ভগ্নপ্রায় অবস্থা। দেয়াল ও ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। শিক্ষার্থীরা জানায়, এই জরাজীর্ণ ভবনে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লেখাপড়া করছেন। এ কারণে অনেক সময় তাদেরকে অভিভাবকেরা বিদ্যালয়ে আসতে বাঁধা-নিষেধ করে থাকেন। তারপরেও ওই ভবনেই শঙ্কার মধ্যদিয়ে ক্লাস করছেন তারা। দেয়াল ও ছাদ থেকে খসে পড়ছে চুন ও ইটের গুঁড়ো। বিদ্যালয় ভবনের এমন জরাজীর্ণতার কারণে কক্ষ ছেড়ে অনেকেই পাশেই অবস্থিত টিনশেডে ক্লাস করছেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইয়াসিন আলী বলেন, প্রতিনিয়তই ভবনটি ধসে পড়ার আশঙ্কা থাকে। অনেকবার কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিতভাবে জানানো হলেও এর কোনো সুরাহা হয়নি।
উপজেলার ভেড়ভেড়ী ইউনিয়নের বেলপুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ২০১৯ সালে উপজেলা প্রকৌশলী পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। তারপরেও সেই ভবনেই চলছে বিদ্যালয়ের পাঠদান। শিক্ষার্থী সিনথিয়া আক্তার বলেন, বিদ্যালয়ের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে। বিদ্যালয়ে এসে লেখাপড়ার চেয়ে ভয়ই বেশি লাগে। প্রধান শিক্ষক মীর আবুল খায়ের বলেন, বছরের পর বছর ধরে ভবনটি পরিত্যক্ত হলেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ক্লাস নিতে আমরা বাধ্য হচ্ছি।

এদিকে, ১৯৯৩ সালে উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নে আঙ্গারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়টিতে বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০৫ জন। এ বিদ্যালয়টিও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ বিদ্যালয়ে জরাজীর্ণ দুইটি টিনশেড ঘর ও একটি ছোট পাকা ভবনে কোনোরকমে চলছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদেন পাঠদান। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী বাবু ভুঁইয়া জানায়, আকাশের বৃষ্টি হলে ক্লাস রুমে পানি পড়ে। পানি হলে আমরা বেঞ্চে বসতে পারি না। এছাড়াও মাথায় পলেস্তারা খসে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। প্রধান শিক্ষক শামসুন্নাহার বলেন, এ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বসার জায়গা নেই। শ্রেণিকক্ষে আলো-বাতাস প্রবাহ নেই। বর্ষা মৌসুমে টিনের ওপর বৃষ্টি পড়লে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কথাবার্তাও শোনা যায় না।

এছাড়া উপজেলার গোয়ালডিহি ইউনিয়নের পূর্ব নলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৯৯৩-৯৪ অর্থ বছরে নির্মিত ভবনটিতে বিস্তর ফাটল দেখা দিয়েছে। ভবনের অনেক স্থানে ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। বের হয়েছে রড। এসব বের হওয়া রডে ধরেছে মরিচা।
শিক্ষার্থী সানজিদা আক্তার ও মাসুদ বলেন, বিদ্যালয়ের ছাদের নিচে বসতে আমাদের ভয় লাগে এবং ভয় হয়। স্যার-ম্যাডামরাও আমাদেরকে দেয়ালের পাশে বসতে নিষেধ করেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) আমিনুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ের ভবনের দেয়াল ফেটে গেছে। ছাদে বিশাল ফাটল দেখা দিয়েছে। আতঙ্কের মধ্যদিয়েই আমাদেরকে ক্লাস নিতে হয়। যেকোনো সময় অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অভিজ্ঞমহল ও অভিভাবকরা মনে করেন, এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত যে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁরা এব্যাপারে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হুমায়ুন কবির তালুকদার বলেন, আমরা বিদ্যালয়গুলোর সমস্যা সম্পর্কে অবগত রয়েছি। ইতিমধ্যেই এসব বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ আসলেই কার্যক্রম শুরু করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. কামরুজ্জামান সরকার বলেন, আমি এসব বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছি। ইতিমধ্যে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য চাহিদা পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই ভবনগুলো নির্মাণ করা হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ-জরাজীর্ণ ভবনে পাঠদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী আতঙ্কে

প্রকাশের সময়: ০৬:৩৯:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ মে ২০২৫

দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় ৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস করছেন। এতে শিক্ষক- শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে। অপরদিকে, মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এসব বিদ্যালয়ের ভবনের ছাদগুলোতে দেখা দিয়েছে ফাটল। কোথাও কোথাও প্লাস্টার খসে পড়ছে এবং রড বেরিয়ে দেখা যাচ্ছে। এতে ক্লাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সর্বদা আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। তারপরেও বিদ্যালয়গুলোতে এসব ভবনেই চলছে পাঠদান। এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকেরা দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের দাবি করেছেন।

জানা গেছে, উপজেলার কৌগাঁও পাঠানপাড়া, বেলপুকুর, আঙ্গারপাড়া ও পূর্ব নলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই কোনো আধুনিক ভবন, নেই উপযুক্ত অবকাঠামো। এসব বিদ্যালয়ের ভবনগুলো জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিদ্যালয়গুলোর ভবনের ছাদে ফাটল দেখা দিয়েছে। রড বেরিয়ে গেছে। এসব বেরিয়ে যাওয়া রডে মরিচা ধরেছে। কোথাও কোথাও প্লাস্টার খসে পড়ছে। এতে ক্লাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সর্বদা আতঙ্কের মধ্যে থাকেন।

স্থানীয় ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ভাবকী ইউনিয়নের কৌগাঁও পাঠানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৭-৯৮ অর্থ বছর এলজিইডির অর্থায়নে একতলা ভবন নির্মিত হয়। যা বর্তমানে ভগ্নপ্রায় অবস্থা। দেয়াল ও ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। শিক্ষার্থীরা জানায়, এই জরাজীর্ণ ভবনে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লেখাপড়া করছেন। এ কারণে অনেক সময় তাদেরকে অভিভাবকেরা বিদ্যালয়ে আসতে বাঁধা-নিষেধ করে থাকেন। তারপরেও ওই ভবনেই শঙ্কার মধ্যদিয়ে ক্লাস করছেন তারা। দেয়াল ও ছাদ থেকে খসে পড়ছে চুন ও ইটের গুঁড়ো। বিদ্যালয় ভবনের এমন জরাজীর্ণতার কারণে কক্ষ ছেড়ে অনেকেই পাশেই অবস্থিত টিনশেডে ক্লাস করছেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইয়াসিন আলী বলেন, প্রতিনিয়তই ভবনটি ধসে পড়ার আশঙ্কা থাকে। অনেকবার কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিতভাবে জানানো হলেও এর কোনো সুরাহা হয়নি।
উপজেলার ভেড়ভেড়ী ইউনিয়নের বেলপুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ২০১৯ সালে উপজেলা প্রকৌশলী পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। তারপরেও সেই ভবনেই চলছে বিদ্যালয়ের পাঠদান। শিক্ষার্থী সিনথিয়া আক্তার বলেন, বিদ্যালয়ের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে। বিদ্যালয়ে এসে লেখাপড়ার চেয়ে ভয়ই বেশি লাগে। প্রধান শিক্ষক মীর আবুল খায়ের বলেন, বছরের পর বছর ধরে ভবনটি পরিত্যক্ত হলেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ক্লাস নিতে আমরা বাধ্য হচ্ছি।

এদিকে, ১৯৯৩ সালে উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নে আঙ্গারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়টিতে বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০৫ জন। এ বিদ্যালয়টিও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ বিদ্যালয়ে জরাজীর্ণ দুইটি টিনশেড ঘর ও একটি ছোট পাকা ভবনে কোনোরকমে চলছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদেন পাঠদান। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী বাবু ভুঁইয়া জানায়, আকাশের বৃষ্টি হলে ক্লাস রুমে পানি পড়ে। পানি হলে আমরা বেঞ্চে বসতে পারি না। এছাড়াও মাথায় পলেস্তারা খসে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। প্রধান শিক্ষক শামসুন্নাহার বলেন, এ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বসার জায়গা নেই। শ্রেণিকক্ষে আলো-বাতাস প্রবাহ নেই। বর্ষা মৌসুমে টিনের ওপর বৃষ্টি পড়লে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কথাবার্তাও শোনা যায় না।

এছাড়া উপজেলার গোয়ালডিহি ইউনিয়নের পূর্ব নলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৯৯৩-৯৪ অর্থ বছরে নির্মিত ভবনটিতে বিস্তর ফাটল দেখা দিয়েছে। ভবনের অনেক স্থানে ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। বের হয়েছে রড। এসব বের হওয়া রডে ধরেছে মরিচা।
শিক্ষার্থী সানজিদা আক্তার ও মাসুদ বলেন, বিদ্যালয়ের ছাদের নিচে বসতে আমাদের ভয় লাগে এবং ভয় হয়। স্যার-ম্যাডামরাও আমাদেরকে দেয়ালের পাশে বসতে নিষেধ করেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) আমিনুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ের ভবনের দেয়াল ফেটে গেছে। ছাদে বিশাল ফাটল দেখা দিয়েছে। আতঙ্কের মধ্যদিয়েই আমাদেরকে ক্লাস নিতে হয়। যেকোনো সময় অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অভিজ্ঞমহল ও অভিভাবকরা মনে করেন, এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত যে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁরা এব্যাপারে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হুমায়ুন কবির তালুকদার বলেন, আমরা বিদ্যালয়গুলোর সমস্যা সম্পর্কে অবগত রয়েছি। ইতিমধ্যেই এসব বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ আসলেই কার্যক্রম শুরু করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. কামরুজ্জামান সরকার বলেন, আমি এসব বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছি। ইতিমধ্যে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য চাহিদা পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই ভবনগুলো নির্মাণ করা হবে।