মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চিরিরবন্দরের সুব্রত খাজাঞ্চী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেশসেরা স্বীকৃতি লাভ

মো. রফিকুল ইসলাম: ব্যতিক্রমধর্মী পাঠদান, শিশুবান্ধব নির্মল পরিবেশ, সহশিক্ষা কার্যক্রম, ভালো ফলাফলের কারণে স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি রংপুর বিভাগের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিকটও পরিচিতি পেয়েছে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার সুব্রত খাজাঞ্চী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। মাত্র ১০ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়টি গত ১০ মে প্রাথমিক শিক্ষাপদক-২০২৪-এর অনুষ্ঠানে দেশসেরার স্বীকৃতি ও পুরষ্কার লাভ করেছে।

ব্যতিক্রমধর্মী পাঠদান, শিশুবান্ধব, প্রাকৃতিক স্বপ্নিল নির্মল পরিবেশ, সহশিক্ষা কার্যক্রম, ভালো ফলাফলের কারণে স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি রংপুর বিভাগের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিকটও পরিচিতি পেয়েছে চিরিরবন্দর উপজেলার সুব্রত খাজাঞ্চী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। মাত্র ১০ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়টি রংপুর বিভাগ সেরা এবং দেশসেরা বিদ্যালয়ের স্বীকৃতিও পেয়েছে। পাশ দিয়ে যাতায়াতের সময় বিদ্যালয়ের পরিবেশ দেখে যে কাউকে থমকে যেতে হয়।

‘ঢং ঢং ঢং’ শব্দে ঘন্টাধ্বনি বেজে উঠলে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়ে মাঠের সবুজ ঘাসে ছোটাছুটি ও হইহুল্লোড়ে মেতে উঠে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা। কেউ ভলিবল নিয়ে মাতামাতি করছে, কেউবা ইচিংবিচিং খেলছে। কেউ কেউ বিদ্যালয়ের প্রাচীরের পাশে থাকা দোলনায় দুলছে। টংঘরের কাঠামোয় তৈরিকৃত ‘স্লিপারে’ উঠতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পড়েছে আরও কিছু শিক্ষার্থী। প্রতিটি দলের সঙ্গে থাকছেন শিক্ষকেরাও। ছোট খেলার মাঠটি যেন হয়ে উঠেছে আরেকটি শ্রেণিকক্ষ। উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের কুশলপুর গ্রামের ফিরিঙ্গী বন্দরস্থ কোলাহলমুক্ত সুব্রত খাজাঞ্চী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলেই এমন চিত্র দেখা মিলে। টিফিনের বিরতিতে বিদ্যালয় মাঠে খেলাধুলায় মেতে উঠে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা।

সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে পথের দুই পাশে ঝাউগাছের সারি। সীমানা প্রাচীরের সঙ্গে চারপাশে হরেক রঙের ফুলের গাছের সৌন্দর্য। বিদ্যালয়ের প্রাচীর, ভবনের দেয়াল, এমনকি ভবনের ছাদেও অঙ্কিত হয়েছে বিভিন্ন ফুল, ফল, পশু-পাখি, সৌরজগৎ, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও মানচিত্রের ছবি। প্রতিটি ছবির পাশে সংশ্লিষ্ট বিষয়বস্তুর নাম নাম লেখা রয়েছে বাংলা ও ইংরেজিতে। বিদ্যালয়ের দেয়ালগুলো যেন একেকটা বইয়ের পাতা হিসেবে ধরা দিয়েছে শিক্ষার্থীদের নিকট। বিদ্যালয়টি সম্পূর্ণ সিসিটিভি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। শিক্ষার্থী উপযোগী এমন পরিবেশ দেখতে স্থানীয় লোকজনসহ আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকেও শিক্ষক-অভিভাবকেরা আসছেন।

বিগত ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে ১৫০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। শর্ত ছিল, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য কেউ জমিদান করলে ভবন ও শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব নেবে সরকার। এ প্রকল্পের আওতায় কুশলপুর গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য ৬৩ শতক জমি দান করেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বিরাজ খাজাঞ্চী ও সুনীল কুমার সরকার। বিরাজের বড়ভাই সুব্রত খাজাঞ্চী দিনাজপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তিনি ২০০৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর নামেই বিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয়। একতলা একটি ভবন নির্মাণ শেষে ২০১৪ সালে শিক্ষার্থী ভর্তি ও পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন জগদীশ চন্দ্র রায়। তিনি জানান, পশুনাথপাড়া ও বদরপাড়া মিলে কুশলপুর গ্রামে ১৭৬টি পরিবারের বসবাস। পাশাপাশি দুইটি গ্রামে দুইটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যেই সুব্রত খাজাঞ্চী বিদ্যালয়টি চালু করা হয়। শুরুতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে ৩৩ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। তবে উপবৃত্তির আওতায় না আসায় মাত্র ৩ মাসের মাথায় ১১জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয় ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। এমতাবস্থায় অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও বিদ্যালয়ের উন্নয়নে অর্থ সংগ্রহের কাজ শুরু করেন প্রধান শিক্ষক। তিনি শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি করতে বাগান করাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করেন। আস্তে আস্তে স্থানীয় লোকজনও তাঁর সহযোগী হয়ে ওঠেন। মাত্র ১০ বছর শেষে বিদ্যালয়টিতে বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩২০ জন। শুধু কুশলপুর নয়- আশপাশেন ৫-৬টি গ্রামের শিশুরাও এ বিদ্যালয়ে আসছে লেখাপড়া করার জন্য। ২০১৪ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় শুধু একতলা ভবনটিই ছিল। এরপর নির্মাণ করা হয়েছে সীমানা প্রাচীর, ফটক, শহীদ মিনার, অভিভাবকদের বিশ্রামাগার, লাইব্রেরি কর্ণার, সততা স্টোর, দোলনা, স্লিপার, অক্ষরগাছ, ভবনের ওপরে ছাদ বাগান, ওয়াশ ব্লক, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ। ভিতরের প্রতিটি কক্ষ ও বাইরে রঙের মাধ্যমে শিক্ষামূলক ছবি এবং বারান্দার ছাদে রয়েছে বিভিন্ন গ্রহের নাম ও ছবি অঙ্কন করা। ছাদ বাগানে রয়েছে আঙ্গুর, কমলা, আম, লেবু, মিক্সার মশলা, জলপাইসহ বিভিন্ন ফলের গাছ। ছাদ বাগানের এক পাশে রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য মুক্ত মঞ্চ। যেখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উপস্থিত বক্তব্য ও বির্তক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়ে থাকে। একতলা ভবনের পিছনে আরও দুইটি টিনশেডের শ্রেণিকক্ষ, সাইকেল গ্যারেজ ও সামনে মাঠ রয়েছে। এ মাঠের প্রাচীরে অঙ্কন করা রয়েছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সক্রেটিসেরর ছবিযুক্ত বিভিন্ন শিক্ষামূলক বাণী। বিদ্যালয়ের প্রাচীরে রয়েছে জাতীয় সংসদ, স্মৃতিসৌধ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটসহ পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ও জ্ঞান আহরণের জন্য অনেক কিছুই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বিদ্যালয়ের দেয়াল ও প্রাচীরগুলোতে। আরও জানা গেছে, সপ্তাহে এক দিন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয়। শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বিদ্যালয়ের পোশাকও দেয়া হয়। বিদ্যালয়ে সরকারি বেতনভুক্ত ৫জন শিক্ষক রয়েছেন। পাশাপাশি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আরও অতিরিক্ত ৪ জন নিয়োগ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগে অর্থের যোগানসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন বিদ্যালয়ের জমিদাতা পরিবার ও স্থানীয় লোকজন।

শিক্ষক নুরুল ইসলাম তৃতীয় শ্রেণিতে ভাষা আন্দোলন বিষয়ে পড়াচ্ছিলেন। তিনি প্রজেক্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভাষা আন্দোলন, ভাষা শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিষয়ক বিভিন্ন ছবি দেখাচ্ছেন, সঙ্গে গল্প বলছিলেন। এসময় তিনি বলেন, ‘বাচ্চারা শোনার চেয়ে দেখতে বেশি আগ্রহী। যেকোনো বিষয়ে পাঠদানের ক্ষেত্রে আমরা চেষ্টা করি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপকরণ বা ছবি তাদের সামনে উপস্থাপন করতে। এতে বাচ্চারা স্মৃতিতে তা ধরে রাখতে পারে।

একটি কক্ষে শিশু শ্রেণির ক্লাসের মেঝেতে মাদুর বিছানো। সেখানে শিক্ষক আঁখি আক্তার শিশুদের সঙ্গে যেন খেলায় মেতে আছেন। সেখানে কয়েকটি র্যাকে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন প্রকার খেলনা। রয়েছে ইলেকট্রনিক ম্যাজিক শ্লেট, বর্ণমালার বাড়ি-গাড়ি, কাঠ ও প্লাস্টিকের খেলনা বর্ণমালা, সংখ্যা, পাজল বই, বিজ্ঞান বাক্স, রং চেনার জিওমেট্রিক স্টিকার, ছবি অঙ্কনের সামগ্রী, বিল্ডিং ব্লকসহ বিভিন্ন প্রকার খেলনা। আঁখি আক্তার বলেন, ‘এসব উপকরণের মাধ্যমে খেলার ছলে বাচ্চাদের বর্ণমালা, রঙের ধারণা দেয়া ও গণিত শেখানো সহজ হয়। এতে শিশুদের মধ্যে লেখাপড়া ও বিদ্যালয়ে আসার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। এ বিদ্যালয়ে শিশুদের কখনও আদর করে, আবার কখনও গল্পের ছলে পড়াচ্ছেন শিক্ষকরা।’ তারা জানান এ বিদ্যালয়ের মূলমন্ত্রই হচ্ছে-মজার ছলে শেখানো। যাতে করে কেউ স্কুলকে বোঝা মনে না করে।

সহকারী শিক্ষক শাহীন আক্তার বলেন, ‘আমাদের শিক্ষা শুধুই লেখাপড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের উৎসাহ বৃদ্ধিতে আমরা পুরষ্কৃত করি।’

পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র তাম্মির আহমেদ বলেন, ‘আমি স্কুল কামাই করি না। আমাদের স্কুলে অনেকগুলো খেলনা সামগ্রী রয়েছে। খেলাধুলার পাশাপাশি নিয়মিত গান, কবিতা আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতার আয়োজনও করা হয়। আমাদের বিদ্যালয়টি সাজানো-গোছানো একটি পার্কের মতো।

আরেক শিক্ষার্থী বায়েজিদ ইসলাম বলেন, ‘স্কুলে আসতে আমার খুব ভালো লাগে। খেলাধুলা, নাচ-গান, বির্তকসহ আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি।

কুশলপুর গ্রামের কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, ‘এ বিদ্যালয়ের প্রতি সন্তানদের এতটাই আগ্রহ বেশি যে, সকাল হলেই অপেক্ষায় থাকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য। তারা আরও জানান, শিক্ষকদের আন্তরিকতায় বিদ্যালয়টির উন্নতি চোখে পড়ছে। আস্তে আস্তে স্থানীয় অনেকেই তাঁদের পাশে দাঁড়ান। যিনি জমিদাতা আছেন, তাঁর পরিবারের লোকজন সর্বদা বিদ্যালয়ের খোঁজখবর নেন। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকেরা আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। এখানে এলাকার ছেলেমেয়েরা নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যদিয়ে শিক্ষিত হয়ে উঠতেছে। এটাই অনেক বড় আনন্দের।

প্রধান শিক্ষক জগদীশ রায় বলেন, স্থানীয় লোকজন এগিয়ে না আসলে আমরা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারতাম না। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী অনুযায়ী শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষের সংকট রয়েছে। যদি এসব সংকট কাটিয়ে ওঠা যায়, তাহলে আমরা বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবো।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোছা. মিনারা বেগম বলেন, ‘সুব্রত খাজাঞ্চী বিদ্যালয়টি রংপুর বিভাগে ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছে এবং বিদ্যালয়টি জাতীয় পর্যায়ে দেশসেরা স্কুলের স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। বর্তমানে ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা বিদ্যালয়ের ভবন সম্প্রসারণের জন্য অধিদপ্তরে প্রস্তাবও পাঠিয়েছি।

চিরিরবন্দরের সুব্রত খাজাঞ্চী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেশসেরা স্বীকৃতি লাভ

প্রকাশের সময়: ০৪:১৭:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ মে ২০২৫

মো. রফিকুল ইসলাম: ব্যতিক্রমধর্মী পাঠদান, শিশুবান্ধব নির্মল পরিবেশ, সহশিক্ষা কার্যক্রম, ভালো ফলাফলের কারণে স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি রংপুর বিভাগের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিকটও পরিচিতি পেয়েছে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার সুব্রত খাজাঞ্চী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। মাত্র ১০ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়টি গত ১০ মে প্রাথমিক শিক্ষাপদক-২০২৪-এর অনুষ্ঠানে দেশসেরার স্বীকৃতি ও পুরষ্কার লাভ করেছে।

ব্যতিক্রমধর্মী পাঠদান, শিশুবান্ধব, প্রাকৃতিক স্বপ্নিল নির্মল পরিবেশ, সহশিক্ষা কার্যক্রম, ভালো ফলাফলের কারণে স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি রংপুর বিভাগের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিকটও পরিচিতি পেয়েছে চিরিরবন্দর উপজেলার সুব্রত খাজাঞ্চী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। মাত্র ১০ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়টি রংপুর বিভাগ সেরা এবং দেশসেরা বিদ্যালয়ের স্বীকৃতিও পেয়েছে। পাশ দিয়ে যাতায়াতের সময় বিদ্যালয়ের পরিবেশ দেখে যে কাউকে থমকে যেতে হয়।

‘ঢং ঢং ঢং’ শব্দে ঘন্টাধ্বনি বেজে উঠলে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়ে মাঠের সবুজ ঘাসে ছোটাছুটি ও হইহুল্লোড়ে মেতে উঠে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা। কেউ ভলিবল নিয়ে মাতামাতি করছে, কেউবা ইচিংবিচিং খেলছে। কেউ কেউ বিদ্যালয়ের প্রাচীরের পাশে থাকা দোলনায় দুলছে। টংঘরের কাঠামোয় তৈরিকৃত ‘স্লিপারে’ উঠতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পড়েছে আরও কিছু শিক্ষার্থী। প্রতিটি দলের সঙ্গে থাকছেন শিক্ষকেরাও। ছোট খেলার মাঠটি যেন হয়ে উঠেছে আরেকটি শ্রেণিকক্ষ। উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের কুশলপুর গ্রামের ফিরিঙ্গী বন্দরস্থ কোলাহলমুক্ত সুব্রত খাজাঞ্চী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলেই এমন চিত্র দেখা মিলে। টিফিনের বিরতিতে বিদ্যালয় মাঠে খেলাধুলায় মেতে উঠে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা।

সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে পথের দুই পাশে ঝাউগাছের সারি। সীমানা প্রাচীরের সঙ্গে চারপাশে হরেক রঙের ফুলের গাছের সৌন্দর্য। বিদ্যালয়ের প্রাচীর, ভবনের দেয়াল, এমনকি ভবনের ছাদেও অঙ্কিত হয়েছে বিভিন্ন ফুল, ফল, পশু-পাখি, সৌরজগৎ, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও মানচিত্রের ছবি। প্রতিটি ছবির পাশে সংশ্লিষ্ট বিষয়বস্তুর নাম নাম লেখা রয়েছে বাংলা ও ইংরেজিতে। বিদ্যালয়ের দেয়ালগুলো যেন একেকটা বইয়ের পাতা হিসেবে ধরা দিয়েছে শিক্ষার্থীদের নিকট। বিদ্যালয়টি সম্পূর্ণ সিসিটিভি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। শিক্ষার্থী উপযোগী এমন পরিবেশ দেখতে স্থানীয় লোকজনসহ আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকেও শিক্ষক-অভিভাবকেরা আসছেন।

বিগত ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে ১৫০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। শর্ত ছিল, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য কেউ জমিদান করলে ভবন ও শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব নেবে সরকার। এ প্রকল্পের আওতায় কুশলপুর গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য ৬৩ শতক জমি দান করেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বিরাজ খাজাঞ্চী ও সুনীল কুমার সরকার। বিরাজের বড়ভাই সুব্রত খাজাঞ্চী দিনাজপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তিনি ২০০৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর নামেই বিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয়। একতলা একটি ভবন নির্মাণ শেষে ২০১৪ সালে শিক্ষার্থী ভর্তি ও পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন জগদীশ চন্দ্র রায়। তিনি জানান, পশুনাথপাড়া ও বদরপাড়া মিলে কুশলপুর গ্রামে ১৭৬টি পরিবারের বসবাস। পাশাপাশি দুইটি গ্রামে দুইটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যেই সুব্রত খাজাঞ্চী বিদ্যালয়টি চালু করা হয়। শুরুতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে ৩৩ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। তবে উপবৃত্তির আওতায় না আসায় মাত্র ৩ মাসের মাথায় ১১জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয় ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। এমতাবস্থায় অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও বিদ্যালয়ের উন্নয়নে অর্থ সংগ্রহের কাজ শুরু করেন প্রধান শিক্ষক। তিনি শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি করতে বাগান করাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করেন। আস্তে আস্তে স্থানীয় লোকজনও তাঁর সহযোগী হয়ে ওঠেন। মাত্র ১০ বছর শেষে বিদ্যালয়টিতে বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩২০ জন। শুধু কুশলপুর নয়- আশপাশেন ৫-৬টি গ্রামের শিশুরাও এ বিদ্যালয়ে আসছে লেখাপড়া করার জন্য। ২০১৪ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় শুধু একতলা ভবনটিই ছিল। এরপর নির্মাণ করা হয়েছে সীমানা প্রাচীর, ফটক, শহীদ মিনার, অভিভাবকদের বিশ্রামাগার, লাইব্রেরি কর্ণার, সততা স্টোর, দোলনা, স্লিপার, অক্ষরগাছ, ভবনের ওপরে ছাদ বাগান, ওয়াশ ব্লক, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ। ভিতরের প্রতিটি কক্ষ ও বাইরে রঙের মাধ্যমে শিক্ষামূলক ছবি এবং বারান্দার ছাদে রয়েছে বিভিন্ন গ্রহের নাম ও ছবি অঙ্কন করা। ছাদ বাগানে রয়েছে আঙ্গুর, কমলা, আম, লেবু, মিক্সার মশলা, জলপাইসহ বিভিন্ন ফলের গাছ। ছাদ বাগানের এক পাশে রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য মুক্ত মঞ্চ। যেখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উপস্থিত বক্তব্য ও বির্তক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়ে থাকে। একতলা ভবনের পিছনে আরও দুইটি টিনশেডের শ্রেণিকক্ষ, সাইকেল গ্যারেজ ও সামনে মাঠ রয়েছে। এ মাঠের প্রাচীরে অঙ্কন করা রয়েছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সক্রেটিসেরর ছবিযুক্ত বিভিন্ন শিক্ষামূলক বাণী। বিদ্যালয়ের প্রাচীরে রয়েছে জাতীয় সংসদ, স্মৃতিসৌধ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটসহ পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ও জ্ঞান আহরণের জন্য অনেক কিছুই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বিদ্যালয়ের দেয়াল ও প্রাচীরগুলোতে। আরও জানা গেছে, সপ্তাহে এক দিন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয়। শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বিদ্যালয়ের পোশাকও দেয়া হয়। বিদ্যালয়ে সরকারি বেতনভুক্ত ৫জন শিক্ষক রয়েছেন। পাশাপাশি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আরও অতিরিক্ত ৪ জন নিয়োগ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগে অর্থের যোগানসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন বিদ্যালয়ের জমিদাতা পরিবার ও স্থানীয় লোকজন।

শিক্ষক নুরুল ইসলাম তৃতীয় শ্রেণিতে ভাষা আন্দোলন বিষয়ে পড়াচ্ছিলেন। তিনি প্রজেক্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভাষা আন্দোলন, ভাষা শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিষয়ক বিভিন্ন ছবি দেখাচ্ছেন, সঙ্গে গল্প বলছিলেন। এসময় তিনি বলেন, ‘বাচ্চারা শোনার চেয়ে দেখতে বেশি আগ্রহী। যেকোনো বিষয়ে পাঠদানের ক্ষেত্রে আমরা চেষ্টা করি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপকরণ বা ছবি তাদের সামনে উপস্থাপন করতে। এতে বাচ্চারা স্মৃতিতে তা ধরে রাখতে পারে।

একটি কক্ষে শিশু শ্রেণির ক্লাসের মেঝেতে মাদুর বিছানো। সেখানে শিক্ষক আঁখি আক্তার শিশুদের সঙ্গে যেন খেলায় মেতে আছেন। সেখানে কয়েকটি র্যাকে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন প্রকার খেলনা। রয়েছে ইলেকট্রনিক ম্যাজিক শ্লেট, বর্ণমালার বাড়ি-গাড়ি, কাঠ ও প্লাস্টিকের খেলনা বর্ণমালা, সংখ্যা, পাজল বই, বিজ্ঞান বাক্স, রং চেনার জিওমেট্রিক স্টিকার, ছবি অঙ্কনের সামগ্রী, বিল্ডিং ব্লকসহ বিভিন্ন প্রকার খেলনা। আঁখি আক্তার বলেন, ‘এসব উপকরণের মাধ্যমে খেলার ছলে বাচ্চাদের বর্ণমালা, রঙের ধারণা দেয়া ও গণিত শেখানো সহজ হয়। এতে শিশুদের মধ্যে লেখাপড়া ও বিদ্যালয়ে আসার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। এ বিদ্যালয়ে শিশুদের কখনও আদর করে, আবার কখনও গল্পের ছলে পড়াচ্ছেন শিক্ষকরা।’ তারা জানান এ বিদ্যালয়ের মূলমন্ত্রই হচ্ছে-মজার ছলে শেখানো। যাতে করে কেউ স্কুলকে বোঝা মনে না করে।

সহকারী শিক্ষক শাহীন আক্তার বলেন, ‘আমাদের শিক্ষা শুধুই লেখাপড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের উৎসাহ বৃদ্ধিতে আমরা পুরষ্কৃত করি।’

পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র তাম্মির আহমেদ বলেন, ‘আমি স্কুল কামাই করি না। আমাদের স্কুলে অনেকগুলো খেলনা সামগ্রী রয়েছে। খেলাধুলার পাশাপাশি নিয়মিত গান, কবিতা আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতার আয়োজনও করা হয়। আমাদের বিদ্যালয়টি সাজানো-গোছানো একটি পার্কের মতো।

আরেক শিক্ষার্থী বায়েজিদ ইসলাম বলেন, ‘স্কুলে আসতে আমার খুব ভালো লাগে। খেলাধুলা, নাচ-গান, বির্তকসহ আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি।

কুশলপুর গ্রামের কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, ‘এ বিদ্যালয়ের প্রতি সন্তানদের এতটাই আগ্রহ বেশি যে, সকাল হলেই অপেক্ষায় থাকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য। তারা আরও জানান, শিক্ষকদের আন্তরিকতায় বিদ্যালয়টির উন্নতি চোখে পড়ছে। আস্তে আস্তে স্থানীয় অনেকেই তাঁদের পাশে দাঁড়ান। যিনি জমিদাতা আছেন, তাঁর পরিবারের লোকজন সর্বদা বিদ্যালয়ের খোঁজখবর নেন। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকেরা আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। এখানে এলাকার ছেলেমেয়েরা নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যদিয়ে শিক্ষিত হয়ে উঠতেছে। এটাই অনেক বড় আনন্দের।

প্রধান শিক্ষক জগদীশ রায় বলেন, স্থানীয় লোকজন এগিয়ে না আসলে আমরা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারতাম না। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী অনুযায়ী শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষের সংকট রয়েছে। যদি এসব সংকট কাটিয়ে ওঠা যায়, তাহলে আমরা বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবো।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোছা. মিনারা বেগম বলেন, ‘সুব্রত খাজাঞ্চী বিদ্যালয়টি রংপুর বিভাগে ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছে এবং বিদ্যালয়টি জাতীয় পর্যায়ে দেশসেরা স্কুলের স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। বর্তমানে ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা বিদ্যালয়ের ভবন সম্প্রসারণের জন্য অধিদপ্তরে প্রস্তাবও পাঠিয়েছি।