সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শুধু বসতবাড়ি নয় গুড়িয়ে দিয়েছে আমাদের ঈদ আনন্দও 

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে আদালতের রায় বাস্তবায়নের নামে কোনো ধরনের নোটিশ বা প্রস্তুতির সময় না দিয়েই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ৩ পরিবারের বসতবাড়ি।
রক্ষা করতে পারেনি তাঁরা ঘরের আসবাবপত্র ও গৃহস্থালি সামগ্রীসহ শিক্ষার্থীদের বইখাতা। ফলে ঈদের আগ মুহূর্তে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন পরিবারগুলো।
তবে এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট কমিশনার আজিজুল ইসলাম বললেন অন্য কথা। তিনি বলেন  ‘আমরা তাদের এক ঘন্টা সময় দিয়েছিলাম। তারা সে সুযোগ কাজে লাগায়নি। পরে বাধ্য হয়ে বাদীকে তার জমির দখল বুঝিয়ে দিতে আমরা এ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছি। অভিযুক্ত জমিতে তিনটি পরিবার বসবাস করছিল এবং উচ্ছেদ কালে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলেও জানান এ আইনজীবী।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী বলেন, ‘উচ্ছেদ অভিযানে বাদী বিবাদী কাউকে নোটিশ করার নিয়ম নেই।
ভুক্তভোগী মনু মিয়ার স্ত্রী নার্গিস বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এত বছর ধরে বসবাস করছি। হঠাৎ নোটিশ ছাড়াই ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলল। কিছুই নিতে পারিনি। বাচ্চাদের জামাকাপড়, খাবার, বইখাতা—সব শেষ। এখন থাকার মতো জায়গাটুকুও নেই। তাঁরা বসতবাড়ি গুড়িয়ে দেয়ার সাথে সাথে গুড়িয়ে দিয়েছেন আমাদের ঈদ আনন্দও। তাঁদের পরিবারের সাথে অবিচার করা হয়েছে বলেও জানান নার্গিস বেগম।’
আরেক ভুক্তভোগী মো. অনু মিয়ার ছেলে মো. জীম মিয়া বলেন, ‘আমার দাদার আমল থেকে এখানে থাকি। এ জমি নিয়ে মামলা চলমান আছে এটা জানি। তবে তারা রায় পেয়েছে সেটা জানি না। কোনো নোটিশও দেয়া হয়নি আমাদের। আজ এমনভাবে সব ভেঙে দিলে কোথায় যাব? ঈদ পর্যন্ত থাকতে চেয়েছিলাম। সে সময়টুকু পর্যন্ত দিল না কেউ। ২-৩ দিন বাদে ঈদ। কি করবো কোথায় যাবো বলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন।
ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় স্থানীয় মো. মোর্শেদ আলম বলেন, ‘মানুষ তো মানুষই, সে যে-ই হোক। আদালতের রায় বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যদি নিরীহ মানুষকে পথে বসতে হয়, তাহলে সেই বিচার কতটা মানবিক?
তিনি আরও বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই হঠাৎ ও কঠোরভাবে পরিচালিত হয় যে, কেউ কোনো জিনিসপত্র সরানোর সুযোগই পাননি। ঘরে থাকা মূল্যবান সামগ্রী, অলংকার, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র কিছুই রক্ষা করতে পারেনি তাঁরা।
জমির দাবিদার হিলোন মিয়া বলেন, ‘এটি আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। দীর্ঘদিন ধরে অন্যরা দখলে রেখেছিল। মামলায় দীর্ঘ ৩৬ বছর পর আদালত আমাদের পক্ষে রায় দেন। সেই রায়ের আলোকে জমি উদ্ধার করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উচ্ছেদ হওয়া বাড়িগুলোর জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙাচোরা টিন-কাঠ, গৃহস্থালি জিনিসপত্র, পোড়া চুলা, উল্টে পড়া হাঁড়ি-পাতিল। শিশুদের বইখাতা মাটিতে পড়ে কাদায় মাখা, কোথাও ভিজে গেছে স্কুলব্যাগ। কেউ ধ্বংসস্তূপের পাশে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন, কেউ আবার শূন্য দৃষ্টিতে বসে আছেন নির্বাক হয়ে। ঘরহীন পরিবারগুলো আশেপাশের বাড়িতে বা খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার রামজীবন ইউনিয়নের বাজারপাড়া গ্রামের মৃত আব্দুর রশিদের প্রায় ১৭ একর পৈতৃক জমি দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি পরিবার ভোগদখল করে আসছিল। এ নিয়ে প্রায় ৩৫ বছর আগে তিনি আদালতে মামলা করেন। আব্দুর রশিদের মৃত্যুর পর তার সন্তানেরা মামলাটি পরিচালনা করেন এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত তাদের পক্ষে রায় দেন। সেই রায়ের বলে গত সোমবার বিকেলে এ উচ্ছেদ অভিযান করা হয়েছে। এতে মৃত মুরাদ মিয়ার তিন ছেলে—রিপু মিয়া, অনু মিয়া ও মনু মিয়ার ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করা হয়।

শুধু বসতবাড়ি নয় গুড়িয়ে দিয়েছে আমাদের ঈদ আনন্দও 

প্রকাশের সময়: ০৭:০৪:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ জুন ২০২৫
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে আদালতের রায় বাস্তবায়নের নামে কোনো ধরনের নোটিশ বা প্রস্তুতির সময় না দিয়েই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ৩ পরিবারের বসতবাড়ি।
রক্ষা করতে পারেনি তাঁরা ঘরের আসবাবপত্র ও গৃহস্থালি সামগ্রীসহ শিক্ষার্থীদের বইখাতা। ফলে ঈদের আগ মুহূর্তে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন পরিবারগুলো।
তবে এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট কমিশনার আজিজুল ইসলাম বললেন অন্য কথা। তিনি বলেন  ‘আমরা তাদের এক ঘন্টা সময় দিয়েছিলাম। তারা সে সুযোগ কাজে লাগায়নি। পরে বাধ্য হয়ে বাদীকে তার জমির দখল বুঝিয়ে দিতে আমরা এ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছি। অভিযুক্ত জমিতে তিনটি পরিবার বসবাস করছিল এবং উচ্ছেদ কালে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলেও জানান এ আইনজীবী।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী বলেন, ‘উচ্ছেদ অভিযানে বাদী বিবাদী কাউকে নোটিশ করার নিয়ম নেই।
ভুক্তভোগী মনু মিয়ার স্ত্রী নার্গিস বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এত বছর ধরে বসবাস করছি। হঠাৎ নোটিশ ছাড়াই ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলল। কিছুই নিতে পারিনি। বাচ্চাদের জামাকাপড়, খাবার, বইখাতা—সব শেষ। এখন থাকার মতো জায়গাটুকুও নেই। তাঁরা বসতবাড়ি গুড়িয়ে দেয়ার সাথে সাথে গুড়িয়ে দিয়েছেন আমাদের ঈদ আনন্দও। তাঁদের পরিবারের সাথে অবিচার করা হয়েছে বলেও জানান নার্গিস বেগম।’
আরেক ভুক্তভোগী মো. অনু মিয়ার ছেলে মো. জীম মিয়া বলেন, ‘আমার দাদার আমল থেকে এখানে থাকি। এ জমি নিয়ে মামলা চলমান আছে এটা জানি। তবে তারা রায় পেয়েছে সেটা জানি না। কোনো নোটিশও দেয়া হয়নি আমাদের। আজ এমনভাবে সব ভেঙে দিলে কোথায় যাব? ঈদ পর্যন্ত থাকতে চেয়েছিলাম। সে সময়টুকু পর্যন্ত দিল না কেউ। ২-৩ দিন বাদে ঈদ। কি করবো কোথায় যাবো বলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন।
ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় স্থানীয় মো. মোর্শেদ আলম বলেন, ‘মানুষ তো মানুষই, সে যে-ই হোক। আদালতের রায় বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যদি নিরীহ মানুষকে পথে বসতে হয়, তাহলে সেই বিচার কতটা মানবিক?
তিনি আরও বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই হঠাৎ ও কঠোরভাবে পরিচালিত হয় যে, কেউ কোনো জিনিসপত্র সরানোর সুযোগই পাননি। ঘরে থাকা মূল্যবান সামগ্রী, অলংকার, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র কিছুই রক্ষা করতে পারেনি তাঁরা।
জমির দাবিদার হিলোন মিয়া বলেন, ‘এটি আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। দীর্ঘদিন ধরে অন্যরা দখলে রেখেছিল। মামলায় দীর্ঘ ৩৬ বছর পর আদালত আমাদের পক্ষে রায় দেন। সেই রায়ের আলোকে জমি উদ্ধার করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উচ্ছেদ হওয়া বাড়িগুলোর জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙাচোরা টিন-কাঠ, গৃহস্থালি জিনিসপত্র, পোড়া চুলা, উল্টে পড়া হাঁড়ি-পাতিল। শিশুদের বইখাতা মাটিতে পড়ে কাদায় মাখা, কোথাও ভিজে গেছে স্কুলব্যাগ। কেউ ধ্বংসস্তূপের পাশে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন, কেউ আবার শূন্য দৃষ্টিতে বসে আছেন নির্বাক হয়ে। ঘরহীন পরিবারগুলো আশেপাশের বাড়িতে বা খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার রামজীবন ইউনিয়নের বাজারপাড়া গ্রামের মৃত আব্দুর রশিদের প্রায় ১৭ একর পৈতৃক জমি দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি পরিবার ভোগদখল করে আসছিল। এ নিয়ে প্রায় ৩৫ বছর আগে তিনি আদালতে মামলা করেন। আব্দুর রশিদের মৃত্যুর পর তার সন্তানেরা মামলাটি পরিচালনা করেন এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত তাদের পক্ষে রায় দেন। সেই রায়ের বলে গত সোমবার বিকেলে এ উচ্ছেদ অভিযান করা হয়েছে। এতে মৃত মুরাদ মিয়ার তিন ছেলে—রিপু মিয়া, অনু মিয়া ও মনু মিয়ার ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করা হয়।