সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, দেখার কেউ নেই

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ঢাকাগামী বাস মলিকদের কাছে যাত্রীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের কাছ থেকে দুই-তিনগুন বেশি বাস ভাড়া নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে ক্ষোভ জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ঢাকাগামী বাস যাত্রীরা।

সরেজমিনে গত শুক্রবারঢ়ঢ় রাতে গিয়ে দেখা যায়, কাউন্টারগুলোতে উপচে পড়া ভীর। কথা বলার সময় নেই কাউন্টার মাস্টারদের। দুই-তিনগুন বেশি দামে টিকেট বিক্রি করছেন তাঁরা। তবে তাঁরা এ ক্ষেত্রে কিছু কৌশল অবলম্বন করেছেন। প্রথমে যাত্রীদের বলেন টিকেট নেই। নিরুপায় যাত্রী যখন অনুরোধ করতে শুরু করেন তখন বলেন দেয়া যাবে তবে দাম বেশি লাগবে। দামটা ঠিক হয়ে গেলে কাউন্টার মাস্টার ওই যাত্রীকে বলেন এ দামের কথা কাউকে বলা যাবে না। বললে মাঝ রাস্তায় গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়া হবে। এতেও রাজি হলে তারপরে টিকেটের পালা। টিকেটের সবগুলো ঘর ফাঁকা রাখা হয়। না আছে তাতে যাত্রীর নাম।লেখা নেই কতো টাকা ভাড়া। কবে, কয়টায় ছাড়বে, কোথায় যাবে এসবের কিছুই লিখা নেই টিকেটে। আবার কোনো কোনো টিকেটের উল্টোপাশে লেখা আছে ভাড়া ৫০০ টাকা। আর জমা লেখা আছে ১ হাজার টাকা। এর কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা বলেন, এ টিকেটের দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা। কেউ আমাদের (যাত্রীদের) জিজ্ঞেস করলে বলতে হবে ভাড়া ৫০০ টাকা। খুচরা টাকা নেই সে কারণে ১ হাজার টাকার নোট জমা দিয়েছি। পরে গাড়িতে ৫০০ টাকা ফেরত দিবে আমাদের (যাত্রীদের)।

তবে বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের হাসানগঞ্জসহ কয়েকটি কাউন্টারে গিয়ে দেখা গেছে মাষ্টার টিকেট বিক্রি করছেন কিন্তু কাউন্টারে গাড়ি রাখা নেই। আশেপাশে দূরে কোথাও রেখে টিকিট বিক্রি করেন। যাত্রী ছাড়া অন্য কেউ গেলে বলেন গাড়ি যাবে না। উপজেলার বিভিন্ন কাউন্টার থেকে দিনে প্রায় ৪০-৫০ টি যাত্রীবাহী বাসে গড়ে ২০০০-২৫০০ জন যাত্রী ঢাকা যাতায়াত করেন।

এ বিষয়ে কথা হয় তারাপুর ইউনিয়নের ঘগোয়া গ্রামের ঢাকাগামী যাত্রী মো. রাজু মিয়ার (২৫) সাথে। তিনি বলেন, ‘বাই পাসের সবগুলো কাউন্টারে গিয়েছিলাম। কেউ কমে দিচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে ২ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে ২ টা টিকেট নিয়েছি। ঢাকা আসতেও অতিরিক্ত ভাড়া আবার ঢাকা ফিরে যেতেও অতিরিক্ত ভাড়া। যাইতে-আইতে টাকা শেষ। ঈদ করবো কি দিয়ে।প্রত্যেক ঈদে এটা হয়ে থাকে। এরকম থাকলে আগামী ঈদে ঈদ করতে গ্রামে আর আসবো বলেও জানান এ গার্মেন্টস কর্মী।

কথা হয় আরেক ঢাকাগামী যাত্রী মো. সেলিম মিয়ার (২৩) সাথে। তিনি পূর্ব বাইপাস মোড়স্থ সোনার বাংলা ট্রাভেল থেকে ২ টা টিকেট নিয়ে অপেক্ষা করছেন।

এ সময় কথা হয় তাঁর সাথে। তিনি বলেন, ‘২ হাজার টাকা দিয়ে ২ টা টিকেট নিয়েছি। একদম পিছনের ছিট তাই কমে পেয়েছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শখ করে কেউ বেশি টাকা দিয়ে টিকেট নেয়না ভাই। বিপদে পড়ে-ই নিয়েছি। বেশি টাকায় টিকেট কিনেছি এটাও বলা নিষেধ আছে। আমরা গরীব মানুষ ভাই। আজকে না গেলে চাকুরী থাকবে না। তাই বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিয়ে টিকেট নিয়েছি। করার কিছুই নাই।

কথা হয় আরেক গার্মেন্টস কর্মী মো. একরামুল হকের (২৬) সাথে। তিনি সুন্দরগঞ্জ পূর্ব বাইপাস মোড়স্থ ফারহানা পরিবহন থেকে টিকেট কিনে বাস ছাড়ার অপেক্ষায় কাউন্টারের পাশে বসে আছেন।

তিনি বলেন, উপজেলার বেলকা বাজার, পাঁচপীর বাজার ও হাসানগঞ্জসহ যত কাউন্টার আছে সবগুলোতেই যোগাযোগ করেছি। চৌদ্দ’শো থেকে পনেরো’শো টাকার কমে কেউ টিকেট বিক্রি করবেন না। পরে এখানে এসে ১ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে ১ টা টিকেট নিয়েছি। করার কিছুই নেই আমাদের। আপনারাও টাকা পেলে নিউজ আর করবেন না বলেই কাছ থেকে উঠে যান ওই গার্মেন্ট কর্মী।

বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের ফলগাছা গ্রামের মো. মতিয়ার রহমান। টিকেট কাটতে কাউন্টারে গিয়ে তুলে ধরেন নিজের অসহায়ত্বের কথা। তিনি বলেন. হাসানগ্জস্থ রিয়াদ কাউন্টারে টিকেট নিতে এসেছি। পার টিকেট ১ হাজার ৩০০ টাকা করে চাচ্ছেন। এর কমে রাজি হচ্ছে না কাউন্টার মাস্টার। নিরুপায় হয়ে ইউএনওকে ৩ বার ফোন করেছি। উনি ফোন ধরেননি। তাই টিকেট না কেটে বাড়ি ফিরছি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কাউন্টার মাস্টার বলেন, আমরা কর্মচারী ভাই। মালিকের হুকুম পালন করাই আমাদের চাকরি। তাঁরা যে ভাবে নির্দেশনা দেন সে ভাবেই আমরা টিকেট বিক্রি করি।

এ বিষয়ে কথা হয় বাস, ট্রাক ও মাইক্রোবাস ইউনিয়ন উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক স্বপন কুমার এর সাথে। তিনি বলেন, ডিসি অফিস থেকে ১ হাজার করে টাকা নিতে বলা হয়েছে। এ-র বেশি কেউ হয়তোবা ১-২ টাকা বেশি নিচ্ছেন। বিষয়টি আমাদের জানা নেই।

এ বিষয়ে কথা হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজ কুমার বিশ্বাসের সাথে। তিনি বলেন, ‘টিকেট কাউন্টারগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হবে। সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিষয়ে কথা হয় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক একেএম হেদায়েতুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনী মাঠে আছেন। ম্যাজিস্ট্রেটও কাজ করছেন। এ বিষয়ে ব্যাপক তৎপর প্রশাসন বলেও জানান এ কর্মকর্তা।

যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, দেখার কেউ নেই

প্রকাশের সময়: ০৭:০৭:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ জুন ২০২৫

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ঢাকাগামী বাস মলিকদের কাছে যাত্রীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের কাছ থেকে দুই-তিনগুন বেশি বাস ভাড়া নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে ক্ষোভ জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ঢাকাগামী বাস যাত্রীরা।

সরেজমিনে গত শুক্রবারঢ়ঢ় রাতে গিয়ে দেখা যায়, কাউন্টারগুলোতে উপচে পড়া ভীর। কথা বলার সময় নেই কাউন্টার মাস্টারদের। দুই-তিনগুন বেশি দামে টিকেট বিক্রি করছেন তাঁরা। তবে তাঁরা এ ক্ষেত্রে কিছু কৌশল অবলম্বন করেছেন। প্রথমে যাত্রীদের বলেন টিকেট নেই। নিরুপায় যাত্রী যখন অনুরোধ করতে শুরু করেন তখন বলেন দেয়া যাবে তবে দাম বেশি লাগবে। দামটা ঠিক হয়ে গেলে কাউন্টার মাস্টার ওই যাত্রীকে বলেন এ দামের কথা কাউকে বলা যাবে না। বললে মাঝ রাস্তায় গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়া হবে। এতেও রাজি হলে তারপরে টিকেটের পালা। টিকেটের সবগুলো ঘর ফাঁকা রাখা হয়। না আছে তাতে যাত্রীর নাম।লেখা নেই কতো টাকা ভাড়া। কবে, কয়টায় ছাড়বে, কোথায় যাবে এসবের কিছুই লিখা নেই টিকেটে। আবার কোনো কোনো টিকেটের উল্টোপাশে লেখা আছে ভাড়া ৫০০ টাকা। আর জমা লেখা আছে ১ হাজার টাকা। এর কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা বলেন, এ টিকেটের দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা। কেউ আমাদের (যাত্রীদের) জিজ্ঞেস করলে বলতে হবে ভাড়া ৫০০ টাকা। খুচরা টাকা নেই সে কারণে ১ হাজার টাকার নোট জমা দিয়েছি। পরে গাড়িতে ৫০০ টাকা ফেরত দিবে আমাদের (যাত্রীদের)।

তবে বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের হাসানগঞ্জসহ কয়েকটি কাউন্টারে গিয়ে দেখা গেছে মাষ্টার টিকেট বিক্রি করছেন কিন্তু কাউন্টারে গাড়ি রাখা নেই। আশেপাশে দূরে কোথাও রেখে টিকিট বিক্রি করেন। যাত্রী ছাড়া অন্য কেউ গেলে বলেন গাড়ি যাবে না। উপজেলার বিভিন্ন কাউন্টার থেকে দিনে প্রায় ৪০-৫০ টি যাত্রীবাহী বাসে গড়ে ২০০০-২৫০০ জন যাত্রী ঢাকা যাতায়াত করেন।

এ বিষয়ে কথা হয় তারাপুর ইউনিয়নের ঘগোয়া গ্রামের ঢাকাগামী যাত্রী মো. রাজু মিয়ার (২৫) সাথে। তিনি বলেন, ‘বাই পাসের সবগুলো কাউন্টারে গিয়েছিলাম। কেউ কমে দিচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে ২ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে ২ টা টিকেট নিয়েছি। ঢাকা আসতেও অতিরিক্ত ভাড়া আবার ঢাকা ফিরে যেতেও অতিরিক্ত ভাড়া। যাইতে-আইতে টাকা শেষ। ঈদ করবো কি দিয়ে।প্রত্যেক ঈদে এটা হয়ে থাকে। এরকম থাকলে আগামী ঈদে ঈদ করতে গ্রামে আর আসবো বলেও জানান এ গার্মেন্টস কর্মী।

কথা হয় আরেক ঢাকাগামী যাত্রী মো. সেলিম মিয়ার (২৩) সাথে। তিনি পূর্ব বাইপাস মোড়স্থ সোনার বাংলা ট্রাভেল থেকে ২ টা টিকেট নিয়ে অপেক্ষা করছেন।

এ সময় কথা হয় তাঁর সাথে। তিনি বলেন, ‘২ হাজার টাকা দিয়ে ২ টা টিকেট নিয়েছি। একদম পিছনের ছিট তাই কমে পেয়েছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শখ করে কেউ বেশি টাকা দিয়ে টিকেট নেয়না ভাই। বিপদে পড়ে-ই নিয়েছি। বেশি টাকায় টিকেট কিনেছি এটাও বলা নিষেধ আছে। আমরা গরীব মানুষ ভাই। আজকে না গেলে চাকুরী থাকবে না। তাই বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিয়ে টিকেট নিয়েছি। করার কিছুই নাই।

কথা হয় আরেক গার্মেন্টস কর্মী মো. একরামুল হকের (২৬) সাথে। তিনি সুন্দরগঞ্জ পূর্ব বাইপাস মোড়স্থ ফারহানা পরিবহন থেকে টিকেট কিনে বাস ছাড়ার অপেক্ষায় কাউন্টারের পাশে বসে আছেন।

তিনি বলেন, উপজেলার বেলকা বাজার, পাঁচপীর বাজার ও হাসানগঞ্জসহ যত কাউন্টার আছে সবগুলোতেই যোগাযোগ করেছি। চৌদ্দ’শো থেকে পনেরো’শো টাকার কমে কেউ টিকেট বিক্রি করবেন না। পরে এখানে এসে ১ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে ১ টা টিকেট নিয়েছি। করার কিছুই নেই আমাদের। আপনারাও টাকা পেলে নিউজ আর করবেন না বলেই কাছ থেকে উঠে যান ওই গার্মেন্ট কর্মী।

বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের ফলগাছা গ্রামের মো. মতিয়ার রহমান। টিকেট কাটতে কাউন্টারে গিয়ে তুলে ধরেন নিজের অসহায়ত্বের কথা। তিনি বলেন. হাসানগ্জস্থ রিয়াদ কাউন্টারে টিকেট নিতে এসেছি। পার টিকেট ১ হাজার ৩০০ টাকা করে চাচ্ছেন। এর কমে রাজি হচ্ছে না কাউন্টার মাস্টার। নিরুপায় হয়ে ইউএনওকে ৩ বার ফোন করেছি। উনি ফোন ধরেননি। তাই টিকেট না কেটে বাড়ি ফিরছি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কাউন্টার মাস্টার বলেন, আমরা কর্মচারী ভাই। মালিকের হুকুম পালন করাই আমাদের চাকরি। তাঁরা যে ভাবে নির্দেশনা দেন সে ভাবেই আমরা টিকেট বিক্রি করি।

এ বিষয়ে কথা হয় বাস, ট্রাক ও মাইক্রোবাস ইউনিয়ন উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক স্বপন কুমার এর সাথে। তিনি বলেন, ডিসি অফিস থেকে ১ হাজার করে টাকা নিতে বলা হয়েছে। এ-র বেশি কেউ হয়তোবা ১-২ টাকা বেশি নিচ্ছেন। বিষয়টি আমাদের জানা নেই।

এ বিষয়ে কথা হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজ কুমার বিশ্বাসের সাথে। তিনি বলেন, ‘টিকেট কাউন্টারগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হবে। সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিষয়ে কথা হয় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক একেএম হেদায়েতুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনী মাঠে আছেন। ম্যাজিস্ট্রেটও কাজ করছেন। এ বিষয়ে ব্যাপক তৎপর প্রশাসন বলেও জানান এ কর্মকর্তা।