মহামারি করোনাভাইরাসের থাবা পড়েছে গোটা বিশ্বে। শহর থেকে গ্রাম, বনজঙ্গল সব জায়গায় ভাইরাসটি আক্রান্ত করছে মানুষকে। ভাইরাসটির সংক্রমণ ঠেকাতে গোটা বিশ্বই লকডাউন পন্থায় গেছে। যা থেকে বাদ পড়েনি বাংলাদেশও।
২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো মানবদেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। আর ওই বছরের ২৬ মার্চ প্রথম লকডাউন আরোপ করে বাংলাদেশ সরকার। কয়েক দফায় বাড়িয়ে টানা ৬৬ দিন ছিল ওই লকডাউন। আর গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশে দ্বিতীয়বারের মতো ‘বিধিনিষেধ’ আরোপ করে সরকার। যা এখন পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে।
প্রথম দফার লকডাউনের শুরু থেকেই দেশে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দেশে বেড়েছে বাল্যবিয়ের সংখ্যা। যা থেকে বাদ পড়েনি সাতক্ষীরা জেলাও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জেলাটিতে যত বিয়ে হচ্ছে তার ৯০ শতাংশই বাল্যবিয়ে। আর করোনাকালে জেলাটিতে পাঁচ হাজার বাল্যবিয়ে হয়েছে। এসব বিয়ের বেশির ভাগই হচ্ছে গ্রামে। এমনকি ভোটের বাজার ঠিক রাখতে বাল্যবিয়েতে সহায়তা করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও।
জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের জুলাই মাসে সাতক্ষীরার সাত উপজেলায় ১২টি, আগস্ট মাসে সাতটি, সেপ্টেম্বর মাসে ১৪টি, অক্টোবর মাসে সাতটি, নভেম্বর মাসে আটটি, ডিসেম্বর মাসে পাঁচটি বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন ও জেলা বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ কমিটি।
করোনার কারণে গ্রামীণ পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণেই বাল্যবিয়ে বাড়ছে বলে ধারণা করছেন সচেতন মহল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, করোনার সময়ে আর্থিক সংকটে রয়েছে জেলাটির বেশির ভাগ পরিবার। এ সময়ে বিভিন্ন দেশে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকসহ ভালো বেতনে কর্মরত বিভিন্ন পেশার ছেলেরা দেশে ফিরছেন। ফলে অভিভাবকরা দেরি না করে জোর করেই তাদের মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছেন। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি কম থাকায় সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন অনেকে। এ সময়টায় মানুষের চলাফেরা কমে গেছে। তাই খুব বেশি মানুষকে আপ্যায়ন করতে হচ্ছে না। এতে তাদের খরচও কম হচ্ছে।
শহরের তুলনায় গ্রামে বাল্যবিয়ের সংখ্যা বেশি। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ভুয়া জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট তৈরি করে নাবালিকাদের বিয়ে হচ্ছে। আবার কেউ কেউ এফিডেভিট করে মেয়ের বয়স বাড়িয়ে দিয়ে দিচ্ছেন বাল্যবিয়ে।
সাতক্ষীরা জেলা বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ কমিটির প্রধান সাকিবুর রহমান বলেন, ‘করোনাকালে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ বাল্যবিয়ে হয়েছে। গত ১০ মাসে কমপক্ষে পাঁচ হাজার বাল্যবিয়ে হয়েছে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ কমিটিতে স্থানীয় প্রতিনিধিরা থাকলেও ভোট কাটা পড়বে বলে বিয়ে ঠেকাতে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘গত চার বছরে এক হাজার বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করেছি। স্থানীয় প্রশাসনের দু-একজন ছাড়া বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কেউ তেমন তৎপর নয়। একটিতেও স্থানীয় প্রতিনিধিরা যাননি। করোনাকালে অনেক বাল্যবিয়ের খবর প্রশাসনকে দিয়েছি; কিন্তু বিয়ে থামাতে কেউ যাননি।’
সাতক্ষীরা জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের প্রোগ্রাম অফিসার ফাতেমা জোহরা বলেন, ‘প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে বিপাকে পড়েছে হাজার হাজার পরিবার। তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দেখা দিয়েছে দারিদ্র্য। ফলে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে শত শত কিশোরীকে বাল্যবিয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন অভিভাবকরা।
‘আমরা খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে গিয়ে বাল্যবিয়ে বন্ধ করলেও পরে ফলোআপে দেখছি তাদের বেশির ভাগ কিশোরী শ্বশুরবাড়ি। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একযোগে বাল্যবিয়ে বন্ধে কাজ করতে হবে। তাহলে জেলাকে বাল্যবিয়ে মুক্ত করা সম্ভব হবে’, বলেন ফাতেমা জোহরা।
জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের উপপরিচালক এ কে এম শফিউল আযম বলেন, ‘সারা বিশ্বে যখন বাল্যবিয়ে কমছে তখন পারিবারিক অসচেতনতার কারণে সাতক্ষীরায় দিন দিন বাল্যবিয়ে বাড়ছে। তবে বাল্যবিয়ে বন্ধে আমরা কাজ করছি। জেলায় কোথাও বাল্যবিয়ে হলে ৯৯৯ বা ১০৯ নম্বরে ফোন দিলে বাল্যবিয়ে বন্ধে উপজেলা প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। এ ছাড়া স্কুল-মাদরাসা ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় বাল্যবিয়ে রোধে কাজ করছে মহিলা বিষয়ক অধিদফতর ও জেলা প্রশাসন।
করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট, সাতক্ষীরা 















