দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে পুরাতন কবরস্থানের জায়গায় রাজস্বের টাকায় ত্রাণের বাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। কবরস্থানের জায়গা রক্ষা ও হেফাজত করতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসি। এ নিয়ে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার আলোকডিহি ইউনিয়নের আলোকডিহি গ্রামের ৫নং ওর্য়াডের আলীপাড়ায় কবরস্থানটির অবস্থান। যার জেএল নং ১০, মৌজা নং ২৪, খতিয়ান নং ৮৯৫, দাগ নং ২২৬ এবং জমির পরিমাণ ১.২৯ একর। কবরস্থানের জায়গায় উপজেলা চেয়ারম্যান তারিকুল ইসলাম তারিকের নির্দেশে সরকারিভাবে ত্রাণের ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। ওই কবরস্থানটিতে ১৯৫০ সালের গুটি বসন্ত এবং কলেরা মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারীদের দাফন করা হয়। অত্রাঞ্চলে কোন সরকারি কবরস্থান না থাকায় সেসময় স্থানীয় লোকজন এখানে এখানে এনে গণকবর দেন ওইসব মৃত ব্যক্তিদের। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ৮০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি জানান, জমিটি গত ৩’শ বছর ধরে কবরস্থান হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। ওই কবরস্থানের জমিটির অবশিষ্ট জমিতে স্থানীয় মকবুল হোসেন, ফজলুল হক, সিরাজুল ইসলামসহ অন্যান্য ব্যক্তিরা বাঁশ লাগিয়ে ভোগদখল করে আসছিল।
এক পর্যায়ে গত ২০১৫ ইং সালের ২০ মে তৎকালিন ইউপি চেয়ারম্যান তারিকুল ইসলাম তারিক কবরস্থানের জমি দখল করে বাঁশ আবাদকারীদের ইউনিয়ন পরিষদে ডেকে নিয়ে জানান যে, কবরস্থানটির সংস্কার করা হবে। যারা কবরস্থানের জমি দখল করে বাঁশচাষ করছেন তারা সেগুলো সরিয়ে নিন। কবরস্থানটিতে মাটি ভরাট করে মেরামত এবং পুরো কবরস্থানটি প্রাচীর নির্মাণ করা হবে। চেয়ারম্যানের কথানুযায়ী সুবিধাভোগীরা তাদের বাঁশ নিধন করে সরিয়ে নেয়। এরপর চেয়ারম্যান ৪০দিনের কর্মসূচির ১০০ জন (৪০০০ জন) লোক দিয়ে মাটি কেঁটে নতুন-পুরাতন সব কবরই ভরাট করে মাঠে পরিণত করেন। কবরস্থানের জমিটিতে সৃষ্ট মাঠটি জনৈক হিন্দু ব্যক্তিকে ৬০ হাজার টাকায় কলাচাষের জন্য ২ বছরের ইজারা প্রদান করেন তৎকালিন ইউপি চেয়ারম্যান।
গত ২০১৫ সালের ২৩ জুলাই কলাচাষের জন্য কবরস্থানটি ট্রাক্টর দিয়ে চাষও করা হয়। সেই সময় আলীপাড়ার বাসিন্দাসহ স্থানীয় লোকজনের প্রতিবাদের মুখে কলাচাষ বন্ধ হয়। ওই কবরস্থান সংলগ্ন ফজলুল হক মেম্বারের পৈত্তিক কবরস্থানের উত্তর ও পশ্চিমপাশে কিছু অংশ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা হয়। সরকারিভাবে কবরস্থানের নামে কয়েকটি প্রকল্প হলেও রের্কডভুক্ত কবরস্থানটিতে অদ্যাবধি কোন প্রাচীর দেয়া হয়নি। গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ইং তারিখে সাবেক আলোকডিহি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান তারিকুল ইসলাম তারিক ওই কবরস্থানে গুচ্ছগ্রামের ত্রাণের ঘর নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কবরস্থানের লাগোয়া আলীপাড়ার মকবুল হোসেন (৭২) জানান, এটি একটি এলাকার পুরাতন কবরস্থান। ব্রিটিশ ম্যাপে কবরস্থানের নামে রের্কড আছে। উপজেলা চেয়ারম্যান ঘর নির্মাণ করে কবরস্থানের পবিত্রতা নষ্ট করছে। স্থানীয় বাসিন্দা মোকলেছ (৪০) জানান, আমি আমার মায়ের নিকট শুনেছি এই কবরস্থানে অনেক কবর ছিল।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক শর্তে স্থানীয় এলাকাবাসি জানান, উপজেলা চেয়ারম্যান গত ২৫ সেপ্টেম্বর শনিবার সকালে ঘটনাস্থলে এসে প্রচন্ড হুমকী-ধামকী দিয়ে আপাতত বাঁশের খুঁটি দিয়ে জোরপুর্বক কবরস্থানের জায়গায় বাঁশের কাঠামোর ঘর নির্মাণ করে কবরস্থান দখল শুরু করেছে।
কবরস্থানের জায়গায় নির্মাণাধীন ঘরটির বরাদ্দ পেয়েছেন আলীপাড়ার জাফর মনসুর আলীর স্ত্রী ছাবেদা বেগম (৫০)। তিনিও স্বীকার করেন যে এখানে কবর ছিল। অনেক জায়গায় কবরের উপর বাড়ি করি মানুষ থাকে।
সহকারি কমিশনার (ভূমি) ইরতিজা হাসান বলেন, প্রয়োজনীয় তদন্ত করে উপর্যুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ব্যাপারে চিরিরবন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান ও তৎকালীন আলোকডিহি ইউপি চেয়ারম্যান তারিকুল ইসলাম তারিক মুঠোফোনে বলেন, জমিটি অনেকেই ভোগদখল করে খাইত। ১০-১১ বছর পূর্বে আমি বলেছিলাম জায়গা ছেড়ে দেন, ওইস্থানে অর্ধেক কবরস্থান ও অর্ধেক গুচ্ছগ্রাম হবে। সকলেই মেনে নিয়েছিল। এখন যে জায়গায় ঘর নির্মাণ হচ্ছে, সে জায়গাটিতে কখনই কোন কবর ছিল না। আমার হুংকারে এতদিন কেউ ওই জায়গা দখল করতে পারে নাই। এখন কেউ দখল করলে তার দায়-দায়িত্ব আমি নেব না।
ওই পুরাতন কবরস্থানটি হেফাজত এবং পবিত্রতা রক্ষায় বাউন্ডারী প্রাচীর নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আয়েশা সিদ্দীকা জাগো২৪.নেট-কে বলেন, কবরস্থানের কথা পূর্বে কেউ বলেনি। এখন জেনেছি। কবরস্থানের জায়গা হলে ওইস্থানে ঘর নির্মাণ করা হবে না।
মো. রফিকুল ইসলাম, করেসপন্ডেন্ট জাগো২৪.নেট, চিরিরবন্দর (দিনাজপুর) 















