বিশ্বের সর্ববৃহৎ কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলাগুলোর মধ্যে মহেশখালী একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ। এ দ্বীপটি ভ্রমণের ইচ্ছে ছিল অনেক আগে থেকেই। দাখিল পরিক্ষা শেষ হওয়ায় আমরা রওনা হয়েছি একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীতে। সকাল ৭টায় কক্সবাজার সদর থেকে অটোরিকশায় চড়ে ৬নং জেটিঘাটে এসে নামলাম। এখান থেকে মহেশখালীর উদ্দেশ্যে স্পিডবোট এবং নৌকা ছেড়ে যায়। এছাড়া অন্য পথে আসা যায়, চট্টগ্রাম থেকে সড়ক পথে চকরিয়া থেকে বদরখালী হয়ে মহেশখালী। ৬নং জেটিঘাট থেকে উঠলাম স্পিডবোটে। ১০ জন যাত্রী হলেই স্পিডবোট ছাড়ে, আমরা ছিলাম ৯ জন। ভাড়া ২২০০ টাকা। নৌকায় ভাড়া ৪০ টাকা। স্পিডবোটে সময় লাগবে ১৫ মিনিট, নৌকায় ৪৫ মিনিট।
১৫৫৯ সালে প্রচণ্ড এক ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসে মূল ভূ-খণ্ড থেকে আলাদা হয়ে মহেশখালীর সৃষ্টি। বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এর অবস্থান। চারদিকে জলবেষ্টিত দ্বীপটির চারপাশে ঝাউবন, দূর থেকে মনে হবে সবুজের প্রাচীর। ঠিক ১৫ মিনিটের মধ্যে স্পিডবোটটি মহেশখালী ঘাটে পৌঁছে গেল। এই জেটিঘাটটি ১৯৮৯ সালে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড স্থাপন করে। ঝাউবনের মধ্যে দিয়ে ১৮২টি পিলারের ওপর জেটি দণ্ডায়মান। জেটি স্থাপন হওয়ার আগে মহেশখালীর যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল নাজুক। বোট থেকে নেমে ঝাউবনের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া সরু জেটি ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। দু’পাশে ঝাউবন, সুনসান নীরবতা, সাঁইসাঁই বাতাস সময়টাকে আরো রোমাঞ্চকর করে তুলেছে।
মহেশখালী দ্বীপ বাংলাদেশে লবণ চাষের জন্য অন্যতম। এর কারণ হলো, এখানের পানিতে লবণের ঘনত্ব অনেক বেশি। এখানে প্রায় ১২ হাজার লবণ চাষি রয়েছে। এই উপজেলার ধলঘাটা, তাজিঘাটা, ঘাটিভাঙা, গোরকঘাটা, কতুবজোম ইউনিয়নে লবণ চাষ হয়। যেদিকে চোখ যায় শুধু লবণের মাঠ। মহেশখালীর অন্যতম দর্শনীয় স্থান লবণ মাঠ। হাঁটা শুরু করলাম। কিছুদূর এগোতেই কয়েকজন লবণ শ্রমিক এগিয়ে এলো কৌতূহলবশত। তাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললাম।
লবণ মাঠ থেকে বেরিয়ে রিকশায় নতুন বাজার হয়ে রাখাইনপাড়া। এখানেই অবস্থিত ৩০০ বছরের পুরোনো বৌদ্ধ বিহার। ৫ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশের নিয়ম থাকলেও আমাদের তা প্রয়োজন হয়নি।। অসাধারণ স্থাপত্য নিদর্শন, দৃষ্টিনন্দন, কারুকার্যখচিত বৌদ্ধবিহার।
অন্যদিকে আদিনাথ-এর অন্য নাম মহেশ, যা থেকে মহেশখালী নামের সৃষ্টি। আদিনাথ মন্দিরের ম্যানেজার দুলাল কান্তির সঙ্গে কথা হলো বেশ কিছুক্ষণ। তিনি জানান, প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী এখানে ঘুরতে আসেন। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকল ধর্মের মানুষের জন্য এটা উন্মুক্ত। সমতল থেকে প্রায় ৮৫.৩ মিটার উঁচুতে (২৮০ ফুট উপরে) অবস্থিত এই মন্দির। প্রতি বছর মার্চের ৪ তারিখ চতুর্দশী মেলা বসে এখানে, লাখ লাখ মানুষের মিলনমেলা হয়। হিন্দুশাস্ত্র মতে, কয়েক হাজার বছর পূর্বে ত্রেতাযুগে মন্দিরের গোড়াপত্তন হয়েছে। ত্রেতাযুগে রাম ও রাবণের যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে রামকে পরাজিত করার জন্য রাবণ উপাসনা করে মহাদেবের কাছে অমরত্ব বর কামনা করেন। মহাদেব রাবণকে শর্ত দিলেন কৈলাস থেকে শিবরূপী শিবলিঙ্গ বহন করে লঙ্কায় নিয়ে এসে পূজা করতে হবে। পথে কোথাও রাখা যাবে না। রাখলে তা আর উঠানো যাবে না। রাবণ শর্ত মোতাবেক শিবকে নিয়ে রওনা দিলেন। কিন্তু যাত্রা পথে এই মৈনাক পাহাড়ে শিবকে রেখে রাবণ প্রকৃতিক ডাক সেরে ফিরে এসে শিবকে উঠাতে চাইলে তা আর উঠানো সম্ভব হয়নি। আর এই মৈনাক পাহাড়েই হয়ে গেল শিবের অবস্থান। এর আবিষ্কার সর্ম্পকে স্থানীয়ভাবে একটি জনশ্রুতি রয়েছে।
এলাকাবাসীর মতানুসারে, এই তীর্থ আবিষ্কৃত এবং মর্যাদা পায় নূর মোহাম্মদ শিকদার নামক একজন সচ্ছল মুসলিম ধর্মালম্বীর মাধ্যমে। তাঁর একটি গাভী হঠাৎ দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এ ঘটনায় তিনি রাখালের উপর সন্ধিহান হন। রাখাল বিষয়টির কারণ অনুসন্ধানে রাতের বেলায় গোয়ালঘরে গাভীটিকে পাহারা দেয়ার ব্যবস্থা করে দেখতে পায় গাভীটি গোয়ালঘর হতে বের হয়ে একটি কালো পাথরের উপর দাঁড়ায় এবং গাভীর বাট থেকে আপনা আপনি ওই পাথরে দুধ পড়তে থাকে। দুধ পড়া শেষ হলে গাভীটি পুনরায় গোয়ালঘরে চলে যায়। রাখাল বিষয়টি নূর মোহাম্মদ শিকদারকে জানালে তিনি গুরুত্ব না দিয়ে গাভীটি বড় মহেশখালী নামক স্থানে সরিয়ে রাখেন। একদিন শিকদার স্বপ্নাদেশ পান গাভীটিকে সরিয়ে রাখলেও তার দুধ দেওয়া বন্ধ হবে না বরং সেখানে তাকে একটি মন্দির নির্মাণ ও হিন্দু জমিদারদের পুঁজোদানের বিষয়ে বলতে হবে। স্বপ্নানুসারে শিকদার সেখানে একটি মন্দির নির্মাণ করেন এবং তা ধীরে ধীরে শিব তীর্থে পরিণত হয়।
মহেশখালীতে ঘুরতে যাওয়ার আগে পরিচয় হয় ক্যাম্পাসের সিফাতুল্লাহ আফনান ভাইয়ের বন্ধু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ভাইয়ের সঙ্গে। আবার অপরদিকে পরিচয় হয় মহেশখালীর সন্তান ও নারায়নগঞ্জের রুপগঞ্জ উপজেলার একটি মাদরাসা থেকে কামিল শেষ করা মাওলানা মহিউদ্দিন আলমগীর ভাইয়ের সাথে। তিনি সেখানে স্হানীয় বাচ্চাদের কুরআন শিক্ষা দেন।
মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ইউনিয়নের স্হানীয় সন্তান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আমাদের জানান, মহেশখালীর পান, শুঁটকির সুনাম জগৎজোড়া, তাই জায়গাটি ঘুরে দেখার পাশাপাশি পান ও শুঁটকি কেনার ইচ্ছে রয়েছে তাদের। মন্দিরের নিচেই চোখে পড়বে বেশ কিছু পোশাকের দোকান। সব দোকানদার রাখাইন তরুণী। হাতে কাজ করা কাপড়, চাদর, থ্রি পিস থরে থরে সাজানো। কাপড়ের দোকানগুলোর পাশে দ্বীপের ডাব পাবেন। এ দ্বীপে আরও ঘুরতে পারবেন রাখাইন পাড়া, পানের বরজ, শুঁটকি মহাল, চিংড়ি ঘের, চরপাড়া সৈকত এবং সোনাদিয়া দ্বীপ। তবে সোনাদিয়া দ্বীপ যেতে হলে হাজার পনেরশ টাকা খরচ করে স্পিডবোট ভাড়া নিতে হবে। মহেশখালীতে থাকার তেমন আবাসিক হোটেল নেই। একদিনেই পুরো দ্বীপটি ঘুরে শেষ করতে পারবেন। বেলা পড়েছে। আমরা হাঁটা ধরেছি জেটির উদ্দেশ্যে। জেটি ধরে হাঁটছি। ঝাউবনের সাঁইসাঁই বাতাস আর পাখির ডাকে শেষ বেলাটা আরো মনোমুগ্ধকর হয়ে উঠেছে। অতঃপর আমরা মহেশখালি থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশ্য ফিরে আসি। কক্সবাজার ঘুরতে আসলেই অবশ্যই পাহাড়িয়া এ দ্বীপটি ঘুরে আসবেন।
আব্দুল্লাহ আল নাঈম, জাগো২৪.নেট, কক্সবাজার থেকে ফিরেঃ 















