সঞ্জয় সাহা : পবিত্র ঈদ উল ফিতর এর বন্ধে গাইবান্ধা সাঘাটা উপজেলাধীন হাট ভরতখালীর ঐতিহ্যবাহী তীর্থস্থান শ্রী শ্রী কাষ্ঠকালী মন্দিরে জমে উঠেছে ভক্তবৃন্দের মনোবাসনা পূরণের মেলা। গাইবান্ধা শহর সহ বিভিন্ন দূর দুরান্ত জেলা থেকে মনোবাসনা পূরনের জন্য মা কাষ্ঠকালী মন্দিরে পুজা দেয়ার উদ্দেশ্যে ভক্তবৃন্দরা সমাগম ঘটাচ্ছে।
প্রতি শনি ও মঙ্গলবার এই তীর্থস্থানে সনাতনী ভক্তবৃন্দের মনোবাসনা পূরণের পুজা হয়ে থাকে।মানত পূরণের জন্য পাঠা বলি দিতে আসেন ভক্তবৃন্দরা। বৈশাখ মাস ছাড়াও ঈদের বন্ধে মঙ্গলবার পড়ায় দুটো পাঠা ছেড়ে দেয়া হয়েছে এবং ৫৪ টি ভেড়া বলি দেয়া হয়েছে।
শনি ও মঙ্গলবার পূজা হয়ে থাকলেও ভক্তবৃন্দের সমাগম কমই হয়। ভক্তবৃন্দের সমাগমে মন্দিরের বাহিরে সন্দেশ, সিন্দুর, সহ হরেক রকমের পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছেন দোকানিরা। মূলত: প্রতি বছরের বৈশাখ মাসে শনি ও মঙ্গলবার মাসব্যাপী মনোবাসনা পূরণের মেলা হয়ে থাকে। এতে গাইবান্ধা, দক্ষিন বঙ্গ, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা সহ ভারতসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানত পূরণের জন্য পাঠা বলি দিতে আসেন ভক্তবৃন্দরা।
আনুমানিক ৩শ বছর আগের কথা, তৎকালীন ভরতখালী কাষ্ঠকালী মন্দিরের সামনে যমুনা নদীর পানিতে একখানা কাঠ ভেসে আসে। জমিদার স্বপ্নে দেখেন এই কাঠ সংরক্ষণ করতে হবে। সেই সময় থেকে কাঠটি এই মন্দিরের মধ্যে অবস্থান করছে। ভক্তগণ পাঠাবলি দেয়া সহ নিজ সন্তান সহ পরিবারের সদস্যদের মঙ্গল কামনায় মায়ের গায়ের বিভিন্ন স্বর্নালংকার উপহার দিয়ে থাকেন। প্রতি বছরের বৈশাখ মাসে শনি ও মঙ্গলবার বৈশাখ মাসজুড়ে মেলা বসে। ভরতখালী কালী মন্দিরের সামনে ১ বৈশাখ থেকে মাসব্যাপী মেলা চলে। সনাতন ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস, এ সময় মন্দিরে পূজা অর্চনা ও বলি দান করলে মনোবাসনা পূরণ হয়।
প্রচলিত শ্রুতি কথা থেকে জানা যায়, ভরতখালী কাষ্ঠকালি মন্দির এ অঞ্চলের হিন্দু ধর্মালম্বীদের তীর্থস্থান। প্রায় তিনশত বছর পূর্বে এ মন্দির নির্মিত হয়েছিল। তৎকালীন জমিদার রমনী কান্ত রায় শ্রী শ্রী কাষ্ঠকালি দেবতার স্বপ্নাদেশ পান যে, ‘আমি তো ঘাটে এসেছি, তুই আমাকে পূজা দে।’ জমিদার এই পোড়া কাঠের টুকরোটিকে পূজা দিলে এখান থেকেই এটি কালী মূর্তিতে রূপান্তরিত হয়। তখন থেকে নিয়মিত পূজা অর্চনা হয়ে আসছে।
গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে এ মেলা বসে, পুণ্যার্থীদের পাশাপাশি মেলায় হাজারো দর্শনাথীদের ভিড় হয়। ভারতসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ মন্দিরে মানত নিয়ে আসেন মনোবাসনা পূরণের আশায়। মন্দিরে ধূপ, মোমবাতি, আগরবাতি জ্বালিয়ে ও তেল দিয়ে তারা মায়ের কাছে প্রার্থনা করেন। মন্দিরের চারপাশে অনেককেই পাঠা (ছাগল) নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মনোবাসনা পূরণের লক্ষ্যে প্রার্থনা শেষে মন্দিরের গুরুর (ঠাকুর) নির্দেশে ৫০ থেকে কয়েক শতাধিক জোড়া পাঠা বলি দেওয়া হয়।
এছাড়াও প্রার্থনা শেষে অনেকেই আবার বিভিন্ন খাবার ও মিষ্টি বিতরণ করছে। এ উপলক্ষে মন্দিরের পাশে পাকুর তলায় প্রায় ৭ একর এলাকা জুড়ে বসে গ্রামীণ মেলা। উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ মনোবাসনা পূরণে ও ঘুরতে আসেন এখানে। মেলায় নাগর দোলা, বাহারি খাবার, বাঁশের তৈরি কুলা, ডালি, চালনা, মাটির তৈরি হাড়ি, থালা, বিভিন্ন মূর্তি, পুতুল, বাঘ, আম এবং নানা তৈজসপত্রের পসরা সাজিয়ে দোকানিরা বেচা কেনা করছেন।
এলাকাবাসী জানান, ভরতখালী কাষ্ঠকালি মন্দির উত্তরাঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী মন্দির। এখানে গাইবান্ধার বিভিন্ন উপজেলাসহ অন্যান্য জেলার মানুষ মন্দিরে পূজা দিতে ও মনোবাসনা পূরণে আসে।
গাইবান্ধা ভিএইড রোড থেকে মানত পুরনে আসা শ্রাবণী সাহা বলেন- এই মন্দির একটি জাগ্রত মন্দির। সন্তান, স্বামী ও পরিবারের মঙ্গল কামনায় দীর্ঘদিন যাবত মায়ের কাছে পাঠা মানত করা ছিল। সময়ের অভাবে তা পূরন করতে আসতে পারিনি। এখন ঈদের বন্ধ থাকার সুবাদে মায়ের কাছে মানত পূরন করতে আসলাম।
কাষ্ঠকালী মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার সিনহা বলেন, এই মন্দির মনোবাসনা পূরনের মন্দির। বৈশাখ মাসের মাসব্যাপী মেলায় শনি ও মঙ্গলবার ভক্ত স্বজনের ভীড় হয়ে থাকে। কিন্তু বৈশাখ মাস ছাড়াই প্রায় কয়েক শতাধিক ভক্তবৃন্দের সমাগম এবার। ধারনা করছি ঈদের বন্ধ থাকার সুযোগে তারা তাদের মানত পুরনের জন্য এখানে এসেছেন। মানত পুরনে আজ মঙ্গলবার ৫৬ টি পাঠা মায়ের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছে।
এই মন্দিরে আমি দীর্ঘ ৫০ বছর যাবত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আশা করি, আগামী বৈশাখ মাসে আরও প্রচুর ভক্ত সমাগম হবে। এ বছর সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে এই মেলা চলবে। এটা একটি পুরাতন ঐতিহ্যবাহী জাগ্রত মন্দির।
সঞ্জয় সাহা, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট 
















