(মো. মাইনুল ইসলাম)
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আমাদের জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। তবে স্বাধীনতার ঘোষণা কে প্রথম দিয়েছিলেন—এই প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক চলে আসছে। ঐতিহাসিক সত্য ও প্রামাণ্য তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং তা তিনি করেন সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা চালায়। সেই ভয়াল রাতে জাতি ছিল দিশেহারা, নেতৃত্ব বিচ্ছিন্ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তে মেজর জিয়াউর রহমান, তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন সাহসী অফিসার, জাতির সামনে দৃঢ় কণ্ঠে স্বাধীনতার বার্তা তুলে ধরেন।
স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা
১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ, চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি ঘোষণা দেন—
“আমি, মেজর জিয়াউর রহমান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।”
এই ঘোষণা ছিল শুধুই একটি বার্তা নয়; এটি ছিল একটি জাতির পুনর্জন্মের ডাক। এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল দৃঢ় করেন, জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং বিশ্ববাসীর সামনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন। বাস্তবতা হলো—এই ঘোষণাই প্রথম কার্যকর ও প্রচারিত স্বাধীনতার ঘোষণা, যা মানুষ শুনতে পায়, বুঝতে পারে এবং যার ভিত্তিতে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়।
জিয়াউর রহমান: সৈনিক থেকে রাষ্ট্রনায়ক
শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন পেশাদার, সাহসী ও দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা। তাঁর পরিচয় কেবল একজন ঘোষক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি ছিলেন একজন সম্মুখসমরের যোদ্ধা।
পূর্ণ নাম: শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম)
জন্ম: ১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬ খ্রি.
মৃত্যু (শাহাদাত): ৩০ মে ১৯৮১ খ্রি.
সেনাবাহিনীর পদ (১৯৭১ সালে): মেজর, পাকিস্তান সেনাবাহিনী
খেতাব: বীর উত্তম
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি সেক্টর কমান্ডার হিসেবে অসামান্য নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধশেষে তিনি দেশ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বাংলাদেশকে স্থিতিশীলতা, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে নেন।
অনুপ্রেরণার চিরন্তন উৎস
জিয়াউর রহমানের জীবন আমাদের শেখায়—সংকটের মুহূর্তে সাহসী সিদ্ধান্তই ইতিহাস বদলে দেয়। তিনি কোনো নিরাপদ জায়গা থেকে কথা বলেননি; তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কথা বলেছেন। নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে তিনি জাতিকে স্বাধীনতার পথে আহ্বান জানিয়েছেন। তাই তাঁকে ঘিরে অনুপ্রেরণা আজও অমলিন।
তিনি বিশ্বাস করতেন—
দেশই সবার আগে
আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব অটুট রাখতে হলে সাহস দরকার
জনগণই রাষ্ট্রের আসল শক্তি
উপসংহার
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তিনিই প্রথম কার্যকরভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা জাতিকে দিকনির্দেশনা দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধকে সুসংগঠিত করে। ইতিহাসকে সত্যের আলোকে দেখাই আমাদের দায়িত্ব। ব্যক্তির ঊর্ধ্বে উঠে জাতির স্বার্থে যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের যথাযথ সম্মান দেওয়াই জাতির নৈতিক কর্তব্য।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ১ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। তিনি চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে সম্মুখসমরে নেতৃত্ব দেন। তাঁর সাহসী নেতৃত্ব ও অসামান্য রণকৌশল মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরে তিনি Z-Force (জেড ফোর্স)–এর অধিনায়ক হিসেবেও সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ সাহসিকতা, দেশপ্রেম ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ‘বীর উত্তম’ হলো বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব। এই উপাধি তাঁর আত্মত্যাগ, নেতৃত্ব ও স্বাধীনতার প্রতি অটল বিশ্বাসের উজ্জ্বল প্রমাণ।
শহীদ জিয়াউর রহমান শুধু একজন মানুষ নন—তিনি সাহস, নেতৃত্ব ও দেশপ্রেমের এক অনন্য প্রতীক, আল্লাহ হাফেজ, আমীন।
লেখক- মো. মাইনুল ইসলাম, সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি)
লেখক- মো. মাইনুল ইসলাম 
























