রবিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চারদিকে পানি, খাবার পানি নেই’

সুপেয় পানি। সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে এক কষ্ট ও দুর্দশার নাম। এক কলস খাবার পানির জন্য ছুটতে হয় এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে।
গ্রীষ্ম মৌসুম শুরু হতেই সুপেয় পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে এ অঞ্চলে। রয়েছে লবণপানির প্রভাব। আর মিষ্টি পানির দু-একটি পুকুর থাকলেও অধিকাংশ গ্রামেই নেই পুকুর। তাই পানি সংগ্রহে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষের ছুটে চলা।
তাদের দুঃখ-দুর্দশার খবর সংগ্রহে যায় সিটি নিউজ। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়- খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, রামপাল, চিতলমারী, মোরেলগঞ্জ, বাগেরহাট, মংলা ও শরণখোলা, শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ, তালা, দেবহাটার প্রায় ৫০ লাখ মানুষ কমবেশি খাবার পানির সংকটে রয়েছেন। এসব অঞ্চলের গ্রামীণ নারী ও শিশুরা পানি সংগ্রহের জন্য ছুটে যায় এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে আনে পানি। কোনো কোনো গ্রামে মিষ্টিপানির আধার বলতে আছে দু-একটি পুকুর। তবে অনেক গ্রামে পুকুরও নেই।
দাকোপ উপজেলার সুতারখালী গ্রামের গৃহবধূ আলেয়া বেগম (৩৯) বলেন, ‘বছরে ৩-৪ মাস আমরা ভালো পানি পাই। তাই খাবার পানির জন্য বর্ষাকালের অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকি। আর আল্লাহর কাছে দোয়া করি বর্ষাকাল যেন আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়। বৃষ্টি না হলে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। ফলে পানির জন্য আমাদের টিকে থাকার লড়াই আরও কঠিন।
গুনারি গ্রামের রুদ্রা রানী বিশ্বাস বলেন, ‘খাবার জলের অভাবের মধ্যে আমাদের বসবাস। অনেক কষ্টে জল সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু জল সংগ্রহ করা আমাদের জন্য খুবই কঠিন।
ছুতারখালী ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির বলেন, আমার ইউনিয়নের জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এই ইউনিয়নে খাবার পানির চরম সংকট রয়েছে। তবে গ্রীষ্ম মৌসুমে এ সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।
‘সরকার যদি প্রত্যেক গ্রামে পুকুর খনন করে, এ ছাড়া প্রতি পরিবারকে পানির ট্যাংক দেয় তাহলে খাবার পানির সংকট অনেকটাই কেটে যাবে’, দাবি করেন মাসুম আলী ফকির।
কয়রা সদর ইউপি চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্পানে ক্ষতবিক্ষত কয়রা উপজেলা। তার ওপর রয়েছে, তীব্র খাবার পানির সংকট। গ্রীষ্ম মৌসুমে এক কলস পানি ১০-১৫ টাকা দিয়েও পাওয়া যায় না।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার কুড়িকাহুনিয়া গ্রামের শাহজাহান মোড়ল বলেন, ‘বাংলাদেশের পশ্চিম উপকূলে ঠিক পাঁচ বছর আগে যেমন পানির কষ্ট ছিল, এখন সেই সংকট আরও বেড়েছে।
‘সংকট সমাধানে উদ্যোগের শেষ নেই। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। তবে পানির কষ্ট খুব একটা লাঘব হয়নি। ঘরের সবদিকে পানি। অথচ খাবারের পানি নেই’, বলেন শাহজাহান মোড়ল।
বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার মল্লিকেরবেড় ইউনিয়নের মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এমনিতেই সারা বছর পানির সংকটে ভুগি। আর তার ওপর গ্রীষ্ম মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাবার পানির সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।’
‘জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ত এলাকা সম্প্রসারণের পরিপ্রেক্ষিতে ‘সুপেয় পানির সন্ধানে’ শীর্ষক এক সেমিনারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল এলাকায় লবণাক্ততার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ জলাধারের বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ এলাকার অবস্থান বদ্বীপের নিম্নাংশ। তাই নদীবাহিত পলির আধিক্য বেশি। এ কারণে ভূগর্ভে জলাধারের জন্য উপযুক্ত মোটা দানার বালু বা পলির স্তর খুব কম পাওয়া যায়। পাওয়া গেলেও এই বালুর স্তরের পুরুত্ব খুবই কম। আর কোথাও কোথাও এই বালুর স্তরের ভূমি থেকে অনেক গভীরে। সেখান থেকে মিষ্টি পানি উত্তোলন অত্যন্ত দুরূহ।’
পানি কমিটি পর্যবেক্ষণে দেখেছে, বাংলাদেশের গভীর নলকূপগুলো সাধারণত ৩শ থেকে ১২শ ফুটের মধ্যে হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের ৩শ থেকে ৪শ ফুটের মধ্যে গভীর নলকূপ বসানো যায়। কিন্তু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় এই নলকূপের গভীরতা ৭শ থেকে ১২শ ফুটের মধ্যে। আর অধিক লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় সব এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন করা সম্ভব হয় না।
পানি ও জলবায়ু বিষয়ক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাওসেডের নির্বাহী পরিচালক শামীম আরফীন বলেন, ‘দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানি সংকটের প্রধান কারণ হচ্ছে মনুষ্যসৃষ্ট উন্নয়ন কার্যক্রম। যা স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশ ও প্রতিবেশের বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ সম্পৃক্ত হয়ে এই অঞ্চলের পানি সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলেছে।
খুলনার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আকমল হোসেন বলেন, ‘সারা বছরই উপকূলীয় অঞ্চলে খাবার পানির সংকট থাকে। তবে গ্রীষ্ম মৌসুমে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।
তিনি আরও জানান, উপকূলীয় এলাকায় সার্ফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া পুকুর, দিঘি, জলাশয় খনন করা হচ্ছে। বর্তমানে খুলনা উপকূলীয় এলাকায় ১৭টি পুকুর খননের কাজ চলছে। এ ছাড়া ৪০টি পুকুর খনন করা আছে বলেও জানান তিনি।
জনপ্রিয়

চারদিকে পানি, খাবার পানি নেই’

প্রকাশের সময়: ০৬:৪৫:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ মার্চ ২০২১
সুপেয় পানি। সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে এক কষ্ট ও দুর্দশার নাম। এক কলস খাবার পানির জন্য ছুটতে হয় এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে।
গ্রীষ্ম মৌসুম শুরু হতেই সুপেয় পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে এ অঞ্চলে। রয়েছে লবণপানির প্রভাব। আর মিষ্টি পানির দু-একটি পুকুর থাকলেও অধিকাংশ গ্রামেই নেই পুকুর। তাই পানি সংগ্রহে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষের ছুটে চলা।
তাদের দুঃখ-দুর্দশার খবর সংগ্রহে যায় সিটি নিউজ। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়- খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, রামপাল, চিতলমারী, মোরেলগঞ্জ, বাগেরহাট, মংলা ও শরণখোলা, শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ, তালা, দেবহাটার প্রায় ৫০ লাখ মানুষ কমবেশি খাবার পানির সংকটে রয়েছেন। এসব অঞ্চলের গ্রামীণ নারী ও শিশুরা পানি সংগ্রহের জন্য ছুটে যায় এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে আনে পানি। কোনো কোনো গ্রামে মিষ্টিপানির আধার বলতে আছে দু-একটি পুকুর। তবে অনেক গ্রামে পুকুরও নেই।
দাকোপ উপজেলার সুতারখালী গ্রামের গৃহবধূ আলেয়া বেগম (৩৯) বলেন, ‘বছরে ৩-৪ মাস আমরা ভালো পানি পাই। তাই খাবার পানির জন্য বর্ষাকালের অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকি। আর আল্লাহর কাছে দোয়া করি বর্ষাকাল যেন আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়। বৃষ্টি না হলে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। ফলে পানির জন্য আমাদের টিকে থাকার লড়াই আরও কঠিন।
গুনারি গ্রামের রুদ্রা রানী বিশ্বাস বলেন, ‘খাবার জলের অভাবের মধ্যে আমাদের বসবাস। অনেক কষ্টে জল সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু জল সংগ্রহ করা আমাদের জন্য খুবই কঠিন।
ছুতারখালী ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির বলেন, আমার ইউনিয়নের জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এই ইউনিয়নে খাবার পানির চরম সংকট রয়েছে। তবে গ্রীষ্ম মৌসুমে এ সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।
‘সরকার যদি প্রত্যেক গ্রামে পুকুর খনন করে, এ ছাড়া প্রতি পরিবারকে পানির ট্যাংক দেয় তাহলে খাবার পানির সংকট অনেকটাই কেটে যাবে’, দাবি করেন মাসুম আলী ফকির।
কয়রা সদর ইউপি চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্পানে ক্ষতবিক্ষত কয়রা উপজেলা। তার ওপর রয়েছে, তীব্র খাবার পানির সংকট। গ্রীষ্ম মৌসুমে এক কলস পানি ১০-১৫ টাকা দিয়েও পাওয়া যায় না।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার কুড়িকাহুনিয়া গ্রামের শাহজাহান মোড়ল বলেন, ‘বাংলাদেশের পশ্চিম উপকূলে ঠিক পাঁচ বছর আগে যেমন পানির কষ্ট ছিল, এখন সেই সংকট আরও বেড়েছে।
‘সংকট সমাধানে উদ্যোগের শেষ নেই। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। তবে পানির কষ্ট খুব একটা লাঘব হয়নি। ঘরের সবদিকে পানি। অথচ খাবারের পানি নেই’, বলেন শাহজাহান মোড়ল।
বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার মল্লিকেরবেড় ইউনিয়নের মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এমনিতেই সারা বছর পানির সংকটে ভুগি। আর তার ওপর গ্রীষ্ম মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাবার পানির সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।’
‘জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ত এলাকা সম্প্রসারণের পরিপ্রেক্ষিতে ‘সুপেয় পানির সন্ধানে’ শীর্ষক এক সেমিনারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল এলাকায় লবণাক্ততার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ জলাধারের বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ এলাকার অবস্থান বদ্বীপের নিম্নাংশ। তাই নদীবাহিত পলির আধিক্য বেশি। এ কারণে ভূগর্ভে জলাধারের জন্য উপযুক্ত মোটা দানার বালু বা পলির স্তর খুব কম পাওয়া যায়। পাওয়া গেলেও এই বালুর স্তরের পুরুত্ব খুবই কম। আর কোথাও কোথাও এই বালুর স্তরের ভূমি থেকে অনেক গভীরে। সেখান থেকে মিষ্টি পানি উত্তোলন অত্যন্ত দুরূহ।’
পানি কমিটি পর্যবেক্ষণে দেখেছে, বাংলাদেশের গভীর নলকূপগুলো সাধারণত ৩শ থেকে ১২শ ফুটের মধ্যে হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের ৩শ থেকে ৪শ ফুটের মধ্যে গভীর নলকূপ বসানো যায়। কিন্তু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় এই নলকূপের গভীরতা ৭শ থেকে ১২শ ফুটের মধ্যে। আর অধিক লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় সব এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন করা সম্ভব হয় না।
পানি ও জলবায়ু বিষয়ক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাওসেডের নির্বাহী পরিচালক শামীম আরফীন বলেন, ‘দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানি সংকটের প্রধান কারণ হচ্ছে মনুষ্যসৃষ্ট উন্নয়ন কার্যক্রম। যা স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশ ও প্রতিবেশের বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ সম্পৃক্ত হয়ে এই অঞ্চলের পানি সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলেছে।
খুলনার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আকমল হোসেন বলেন, ‘সারা বছরই উপকূলীয় অঞ্চলে খাবার পানির সংকট থাকে। তবে গ্রীষ্ম মৌসুমে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।
তিনি আরও জানান, উপকূলীয় এলাকায় সার্ফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া পুকুর, দিঘি, জলাশয় খনন করা হচ্ছে। বর্তমানে খুলনা উপকূলীয় এলাকায় ১৭টি পুকুর খননের কাজ চলছে। এ ছাড়া ৪০টি পুকুর খনন করা আছে বলেও জানান তিনি।