বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জীবনযুদ্ধে বৃদ্ধ দম্পতির অন্যের খামারে ঠাঁই

মো. রফিকুল ইসলাম: জীবনের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন দেশ সেবায়। তিনি ছিলেন আনসার বাহিনীর সদস্য। কর্মজীবন শেষ হলেও জীবনের লড়াই থেমে থাকেনি। শেষ বয়সে এসে তার নামে নেই এক চিলতে ভিটেমাটি, নেই মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়। তিনি হলেন দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের ছিট আলোকডিহি এলাকার মো. রমজান আলী। তাঁর স্ত্রী সাহিদা বেগমও নীরবে সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছেন এই দীর্ঘ কষ্টের জীবন যাত্রায়।

রাত গভীর হলে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসে। কিন্তু একটি ভাঙা ঘরের ভেতরে তখনও ঘুম আসে না দু’টি ক্লান্ত চোখে। টিনের ফাঁক গলে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকে শীতল ছোঁয়ায় কেঁপে ওঠে বৃদ্ধ শরীর। বৃষ্টির রাতে সেই শব্দ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। টিপটিপ করে পানি পড়ে মাচার ওপর। ভিজে যায় বিছানাপত্র। এইভাবেই দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে বৃদ্ধ মো. রমজান আলী-সাহিদা বেগমের জীবন। তারপরেও নেই কোনো অভিযোগ, নেই উচ্চস্বরে আহ্বান। শুধু নিঃশব্দে সহ্য করা ছাড়া কোনো উপায়ও নেই তাদের।

হাতে কোদাল নিয়ে রমজান আলী বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়েই প্রতিদিন কাজে বের হন। কাজ করেন একটি খামারে। গোয়ালঘর, গরু, মুরগি আর খামারের নিত্য কাজই এখন তার জীবন। তাঁর এই কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে মাস শেষে জোটে মাত্র এক হাজার টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই চলে স্বামী-স্ত্রীর জীবন। এ টাকা থেকেই তাদের অসুখ হলে ওষুধপত্রও কিনতে হয়। এতে অনেক সময় তাদের দু’বেলা ঠিকমতো খাওয়াই হয় না। এই ভাঙা ঘরের মধ্যে প্রতিদিন জমে থাকে দীর্ঘশ্বাস।

এ দম্পতির বড় ছেলে শাহাজাহান আলী উপজেলার পাকেরহাট বাজারের ফুটপাতে বাদাম বিক্রি করেন। দিনভর রোদে-পুড়ে, ধুলো মেখে তার আয় হয় মাত্র তিন-চারশ টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই ৬ সদস্যের সংসার চালাতে তাকে হিমশিম খেতে হয়। তাই বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে পারছেন না শাহাজাহান। এ অসহায়ত্ব তার চোখে জমে থাকে প্রতিদিন।

রমজান আলী কোনো দান চান না। চান না কোনো বিশেষ সুযোগ-সুবিধা। তিনি শুধু চান, শেষ বয়সে একটু নিশ্চিন্ত ঘুম। কাঁপা কণ্ঠে বলেন, গত ১৬ বছর ধরে আমি এই খামারে আছি। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে, শীতে শরীর কাঁপে। আর কিছু চাই না-শুধু ঘুমানোর মতো একটা নিরাপদ আশ্রয় চাই। এসময় তার পাশে বসে থাকা স্ত্রী সাহিদা বেগমের চোখও ভিজে ওঠে। তিনি এসময় নিচুস্বরে বলেন, আমাদের নিজের কিছু নেই। মানুষের জায়গায় থাকি। আমাদের কেউ খোঁজ নেয় না। এই শেষ বয়সে আমরা একটু ভালোভাবে বাঁচতে চাই। খামারের মালিক তাহেরা আজিজ মানবিকতা থেকে তাদের আশ্রয় দিয়েছেন।

তাহেরা আজিজ বলেন, এই দম্পতির মতো মানুষ সমাজে থাকার কথা নয়।তাদের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় ও নিরাপদ ঘরে
থাকার কথা। একজন সাবেক আনসার সদস্যের এমন জীবন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ব্যর্থতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

স্থানীয় সচেতন মহল দাবি করে বলেন, প্রশ্ন জাগে-যে মানুষটি একদিন রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় কাজ করেছেন।তার শেষ জীবনের নিরাপত্তা কি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়? অবিলম্বে এই পরিবারকে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা হোক। কারণ একটি ঘর শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নয়-এটি মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা আর শান্তির প্রতীক।

আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবু খায়ের বলেন, আমি দীর্ঘদিন এলাকায় অনুপস্থিত ছিলাম। সম্প্রতি ফিরে এসে এই দম্পতির বিষয়টি জানতে পেরেছি। এ বিষয়ে ইউএনও মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেব। ইনশাআল্লাহ।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তমিজুল ইসলাম জানান, এই দম্পতির বিষয়টি আমি জানতে পেরেছি। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে তাঁদের পুনর্বাসন করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জীবনযুদ্ধে বৃদ্ধ দম্পতির অন্যের খামারে ঠাঁই

প্রকাশের সময়: ০৬:৪৬:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

মো. রফিকুল ইসলাম: জীবনের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন দেশ সেবায়। তিনি ছিলেন আনসার বাহিনীর সদস্য। কর্মজীবন শেষ হলেও জীবনের লড়াই থেমে থাকেনি। শেষ বয়সে এসে তার নামে নেই এক চিলতে ভিটেমাটি, নেই মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়। তিনি হলেন দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের ছিট আলোকডিহি এলাকার মো. রমজান আলী। তাঁর স্ত্রী সাহিদা বেগমও নীরবে সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছেন এই দীর্ঘ কষ্টের জীবন যাত্রায়।

রাত গভীর হলে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসে। কিন্তু একটি ভাঙা ঘরের ভেতরে তখনও ঘুম আসে না দু’টি ক্লান্ত চোখে। টিনের ফাঁক গলে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকে শীতল ছোঁয়ায় কেঁপে ওঠে বৃদ্ধ শরীর। বৃষ্টির রাতে সেই শব্দ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। টিপটিপ করে পানি পড়ে মাচার ওপর। ভিজে যায় বিছানাপত্র। এইভাবেই দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে বৃদ্ধ মো. রমজান আলী-সাহিদা বেগমের জীবন। তারপরেও নেই কোনো অভিযোগ, নেই উচ্চস্বরে আহ্বান। শুধু নিঃশব্দে সহ্য করা ছাড়া কোনো উপায়ও নেই তাদের।

হাতে কোদাল নিয়ে রমজান আলী বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়েই প্রতিদিন কাজে বের হন। কাজ করেন একটি খামারে। গোয়ালঘর, গরু, মুরগি আর খামারের নিত্য কাজই এখন তার জীবন। তাঁর এই কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে মাস শেষে জোটে মাত্র এক হাজার টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই চলে স্বামী-স্ত্রীর জীবন। এ টাকা থেকেই তাদের অসুখ হলে ওষুধপত্রও কিনতে হয়। এতে অনেক সময় তাদের দু’বেলা ঠিকমতো খাওয়াই হয় না। এই ভাঙা ঘরের মধ্যে প্রতিদিন জমে থাকে দীর্ঘশ্বাস।

এ দম্পতির বড় ছেলে শাহাজাহান আলী উপজেলার পাকেরহাট বাজারের ফুটপাতে বাদাম বিক্রি করেন। দিনভর রোদে-পুড়ে, ধুলো মেখে তার আয় হয় মাত্র তিন-চারশ টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই ৬ সদস্যের সংসার চালাতে তাকে হিমশিম খেতে হয়। তাই বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে পারছেন না শাহাজাহান। এ অসহায়ত্ব তার চোখে জমে থাকে প্রতিদিন।

রমজান আলী কোনো দান চান না। চান না কোনো বিশেষ সুযোগ-সুবিধা। তিনি শুধু চান, শেষ বয়সে একটু নিশ্চিন্ত ঘুম। কাঁপা কণ্ঠে বলেন, গত ১৬ বছর ধরে আমি এই খামারে আছি। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে, শীতে শরীর কাঁপে। আর কিছু চাই না-শুধু ঘুমানোর মতো একটা নিরাপদ আশ্রয় চাই। এসময় তার পাশে বসে থাকা স্ত্রী সাহিদা বেগমের চোখও ভিজে ওঠে। তিনি এসময় নিচুস্বরে বলেন, আমাদের নিজের কিছু নেই। মানুষের জায়গায় থাকি। আমাদের কেউ খোঁজ নেয় না। এই শেষ বয়সে আমরা একটু ভালোভাবে বাঁচতে চাই। খামারের মালিক তাহেরা আজিজ মানবিকতা থেকে তাদের আশ্রয় দিয়েছেন।

তাহেরা আজিজ বলেন, এই দম্পতির মতো মানুষ সমাজে থাকার কথা নয়।তাদের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় ও নিরাপদ ঘরে
থাকার কথা। একজন সাবেক আনসার সদস্যের এমন জীবন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ব্যর্থতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

স্থানীয় সচেতন মহল দাবি করে বলেন, প্রশ্ন জাগে-যে মানুষটি একদিন রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় কাজ করেছেন।তার শেষ জীবনের নিরাপত্তা কি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়? অবিলম্বে এই পরিবারকে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা হোক। কারণ একটি ঘর শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নয়-এটি মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা আর শান্তির প্রতীক।

আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবু খায়ের বলেন, আমি দীর্ঘদিন এলাকায় অনুপস্থিত ছিলাম। সম্প্রতি ফিরে এসে এই দম্পতির বিষয়টি জানতে পেরেছি। এ বিষয়ে ইউএনও মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেব। ইনশাআল্লাহ।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তমিজুল ইসলাম জানান, এই দম্পতির বিষয়টি আমি জানতে পেরেছি। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে তাঁদের পুনর্বাসন করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।