মো. রফিকুল ইসলাম: দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে বিভিন্ন এলাকায় চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হলেও বাজারে দামের ধ্বসের কারণে আলুচাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। মাঠে ফলন ভালো হওয়ায় শুরুতে আশাবাদী ছিলেন চাষিরা। কিন্তু ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এখন সেই আশাই হতাশায় পরিণত হয়েছে। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে বিঘাপ্রতি হাজার হাজার টাকা লোকসান গুনছেন চাষিরা।
উৎপাদন খরচ ও সংরক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় আলুচাষিদের অবস্থা যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’-হয়ে দাঁড়িয়েছে। আক্ষেপে অনেক আলুচাষি জমি থেকে আলুই তুলছেন না। বর্তমানে প্রতিকেজি আলু ৬ থেকে ৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম। এখন আলু উত্তোলন পুরোদমে শুরু হয়েছে। এবছর আলু উৎপাদনে খরচ অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে প্রতি হেক্টর জমিতে অতিরিক্ত ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। গত বছর সরকারি বীজের কেজি ছিল ২৮ থেকে ৩০ টাকা, যা এ বছর বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ থেকে ৬০ টাকা হয়। বেসরকারি বীজের দামও কেজিপ্রতি ৪০ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকায় পৌঁছে। এতে মাঠ পর্যায়ে আলুর উৎপাদন খরচ পড়েছে কেজিপ্রতি ১৮ থেকে ২০ টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬ থেকে ৮ টাকা দরে। ফলে মৌসুমের শুরুতে বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন আলু চাষিরা। ভালো ফলনের আশায় কার্ডিনাল, ডায়মন্ড, রোমানা, ক্যারেজ, এস্টারিজ, সাদা পাকরী, লাল পাকরীসহ জাতের আলু চাষ করেন চাষিরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আলুর ফলনও ভালো হয়েছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবছর চিরিরবন্দর উপজেলায় ২ হাজার ৭শ’ ৩১ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৮শ’ ৮০ হেক্টর জমিতে। অনুকূল আবহাওয়া ও রোগবালাই কম থাকায় আলুর ফলন ভালো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই বিঘাপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ মণ পর্যন্ত আলু উৎপাদন হয়েছে। তবে বাজারদর কমে যাওয়ায় এই ভালো ফলনও কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে পারেনি। বর্তমানে কেজিপ্রতি আলুর পাইকারি দাম ৬ থেকে ৮ টাকার মধ্যে। এতে উৎপাদন খরচ উঠছে না। এক বিঘা জমিতে আলুচাষে গড়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ হলেও বিক্রি করে তা পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। ফলে বিঘাপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানান চাষিরা।
উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের জফির উদ্দিন জানান, আমি এবছর সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। প্রতিবিঘা জমিতে আলু উৎপাদন হয়েছে ৯০ থেকে ১০০ মণ। প্রতিবিঘা জমিতে আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। বর্তমানে প্রতিবিঘা জমির আলু ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মজুরি বাদ দিলে হাতে কিছুই থাকছে না। বাজারদর কম থাকায় কৃষকদের হাজার হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। ওই গ্রামের আলু চাষি রবিউল ইসলাম জানান, ধার-দেনা করে এবং সার-কীটনাশকের দোকানে বাকি রেখে ২ বিঘা জমিতে আলু লাগিয়েছি। আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে কিন্তু বাজারে দাম নেই। আলু যে সংরক্ষণ করে রাখবো তার জন্য উপজেলায় কোনো কোল্ড স্টোরেজ নেই। কৃষক তারিকুল ইসলাম জানান, নিজস্ব আবাদী জমিসহ ১বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে আলু চাষ করেছি। এক কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ১৮ থেকে ২০ টাকা। স্টোর ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন খরচ দিয়ে কৃষকের পকেটে টাকা ঢোকা তো দূরের কথা, ঘর থেকে আরও টাকা দিতে হচ্ছে। আলুর বাজার ধ্বসের কারণে অনেকেই জমি থেকে আলুই তুলেননি। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কৃষক বলেন, বর্তমানে আলু কেনার ক্রেতাই নেই। আমরা কৃষকরা বরাবরই ‘বলির পাঁঠা’। কৃষকদের অভিযোগ-অতিরিক্ত সরবরাহ, চাহিদার ঘাটতি ও বাজারে সিন্ডিকেটের কারণে এই দরপতন হয়েছে। তাদের দাবি, সরকারিভাবে আলু রপ্তানি ও আলুভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপন করা গেলে বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে। কৃষক বাঁচাতে সরকারের প্রতি আলুর ন্যায্য মূল্য নির্ধারণের দাবি করেন তারা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জোহরা সুলতানা জানান, জেলায় আলুভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা গেলে স্থানীয়ভাবে নতুন বাজার সৃষ্টি হবে ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। এতে কৃষকেরা আলুর ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং সরকারও রাজস্ব আয় করতে পারবে।
মো. রফিকুল ইসলাম, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট, চিরিরবন্দর (দিনাজপুর) 
















