গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার খোর্দ্দকোমরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আর সদস্যদের দ্বন্দ্বের জেরে বন্ধ রাখা রয়েছে ইউনিয়নের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড। এ কারণে নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষজন।
জানা যায়, এই শীতে খোর্দ্দকোমরপুর ইউনিয়নে ৭ শতাধিক সরকারি কম্বল বিতরণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চেয়ারম্যান আর সদস্যদের সমন্বয় না থাকায় সম্ভব হয়নি। একইভাবে এখানকার দরিদ্র মানুষরা বঞ্চিত হয়েছে দুম্বার মাংস থেকে। অন্যান্য ইউনিয়নে দুম্বার মাংস পাঠানো হলেও খোর্দ্দকোমরপুর ইউনিয়নে দেওয়া হয়নি। এসব নিশ্চিত করেছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস।
অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচীতে খোর্দ্দকোমরপুর ইউনিয়নে ১৩৮ জন শ্রমিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৫৫ জন আর নারী ৮৩ জন। চেয়ারম্যান আর সদস্যদের দ্বন্দ্বে চলতি মৌসুমে এই শ্রমিকরা কোনো কাজ করতে পারেনি। ফলে শ্রমিকদের ৪০ দিনের মজুরীর ২২ লক্ষ ২৬ হাজার টাকা ফেরত যাচ্ছে। হতদরিদ্র শ্রমিকদের এই অর্থ থেকে বঞ্চিক করলো জনপ্রতিনিধিদের দ্বন্দ্ব।
ইউনিয়ন পরিষদের অসহযোগিতার কারণে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা এবং প্রতিবন্ধি ভাতা প্রতিস্থাপন কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে বলে জানান উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মানিক চন্দ্র রায়। এ কারণে বয়স্ক ভাতার জন্য ৯৩ জন, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতার ৩৯ জন এবং প্রতিবন্ধি ভাতার জন্য ১১ জন সুবিধাভোগী বঞ্চিত। অথচ এই ১৪৩ জন দরিদ্র মানুষ প্রতি মাসে ভাতা পেতেন ৮৬ হাজার ৬০০ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে খোর্দ্দকোমরপুর ইউনিয়নে কাবিটা প্রকল্পে বরাদ্দ ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৫ টাকা। কাবিখা প্রকল্পে চাল বরাদ্দ ১ মেট্রিকটন ৬৩০ কেজি, গম বরাদ্দ ১ মেটিকট্রন ৬৩০ কেজি। টিআর প্রকল্পে বরাদ্দ ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৭৪ টাকা। কিন্তু ওই দ্বন্দ্বের কারণে এসব প্রকল্পের কাজ স্থগিত রাখেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অথচ এই বরাদ্দে ৭ থেকে ৮ টি উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়ন হত।
এদিকে নতুনভাবে ওই ইউনিয়নের কোনো নারীকে মাতৃত্ব ভাতার আওতায় আনা যাচ্ছেনা। উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের সভার রেজুলেশন না থাকায় মাতৃত্ব ভাতার জন্য কাউকে নির্বাচন করা যাচ্ছে না। এতে গত চার মাসে ২৪ জন নারী মাতৃত্ব ভাতা থেকে বঞ্চিত হলেন। তারা চার মাসে ভাতা পেতেন ৭৬ হাজার ৮০০ টাকা।
সরকারি উন্নয়নমূলক কাজের স্বার্থে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-সদস্যদের সমন্বয়ের জন্য বিভিন্ন ভাবে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে বলে জানান উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রেজাউল করিম। কিন্তু তারা আপোসরফার পক্ষে না থাকায় উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ওই ইউনিয়নের সমস্ত উন্নয়ন কাজ বন্ধ আছে। এতে অনেকেরই সমস্যা হচ্ছে।
খোর্দ্দকোমরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মাহাবুব হাসান বলেন চেয়ারম্যান ও সদস্যরা পরিষদে না আসায় সভা হচ্ছে না। তাদের কারণে ব্যহত হচ্ছে জন্ম ও মৃত্যুর নিবন্ধন কার্যক্রম। কারণ এসব সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান-সদস্যের প্রতিস্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। কিন্তু এখন তারা প্রতিস্বাক্ষর দিতে চাননা। এতে সেবা প্রত্যাশী মানুষ ক্ষিপ্ত ।
স্থানীয়রা জানান নিজেদের মধ্যে আর্থিক সুবিধার ভাগাভাগির জেরে কয়েক মাস আগে দ্বন্দে জড়ায় চেয়ারম্যান এবং সদস্যরা। একপর্যায়ে চেয়ারম্যান সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম রেজওয়ানের বিরুদ্ধে আনাস্থা আনেন সদস্যরা। তারা লিখিত অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্ট দফতরে। ইতিমধ্যে এই ইউনিয়ন সংক্রান্তে একাধিক তদন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিউল আলম জানান প্রায় আড়াই মাস আগে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সদস্যদের আনিত আনাস্তা সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত করেছেন। এর পর একই বিষয়ে বৃহস্পতিবার তদন্ত করেছেন নির্বাহী ম্যাজিট্রেট ও সহকারি কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান।
অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচীর নারী শ্রমিক রেখা বেগম বলেন মজুরী বাবদ সরকার আমাদের জন্য অর্থ দিয়েছেন। কিন্তু চেয়ারম্যান-সদস্যরা সেই ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করেছেন। তাদের সম্মানী ভাতা বন্ধ করলে খেটেখাওয়া গরীব মানুষদের কষ্ট বুঝতেন।
ইউপি সদস্য এনামুল হক বলেন, চেয়ারম্যানের বিভিন্ন অনিয়মের কারণে ১১ জন সদস্য একত্রে সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছি। তাতে চেয়ারম্যানের আনাস্তা দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতিদ্রুত সিন্ধান্ত না দেওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তাই জনগণের কথা বিবেচনায় এনে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
সদস্যদের অভিযোগ উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে দাবি করেন চেয়ারম্যান সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম রেজওয়ান। তাদের কারণে ইউনিয়নের মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। স্বাভাবিক কাজকর্ম স্থবির হয়ে পড়েছে। তিনি কোন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন। কারো সঙ্গে খারাপ আচরণ কিংবা কাউকে গালিগালাজ করেন না।
করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট, গাইবান্ধা 













