ভোরের বাতাসে হালকা শীতের পরশ। ঘাসের ডগায় জমতে শুরু করেছে শিশির। প্রকৃতিতে জানান দিচ্ছে হেমন্তের আগমনী বার্তা। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাংলার চিরচেনা এক কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন গাছিরা। খেজুরগাছের ডালপালা পরিষ্কার করে রস সংগ্রহের উপযোগী করে তুলছেন তাঁরা। কারও হাতে ধারালো দা, কেউ ব্যস্ত গাছের মাথা পরিষ্কার করতে। তাঁদের চোখেমুখে এখন নতুন মৌসুমের প্রত্যাশা।
বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে শুরু হয়েছে খেজুরগাছ ঝোড়ার কাজ। বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড়, গ্রামের মেঠোপথ কিংবা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা খেজুরগাছগুলোতে চলছে এই প্রস্তুতি। গাছিরা আশা করছেন, আর ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যেই গাছে গাছে হাঁড়ি ঝুলবে। রাতভর ফোঁটা ফোঁটা রস জমবে সেই হাঁড়িতে। ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হবে রস সংগ্রহের ব্যস্ততা।
শীতের সকালে খেজুরের তাজা রস খাওয়ার আনন্দ গ্রামবাংলার মানুষের কাছে আলাদা। কাঁচা রসের মিষ্টি স্বাদ, চুলায় জ্বাল দেওয়া রসের ঘ্রাণ আর নতুন গুড়ের আকর্ষণ—সব মিলিয়ে খেজুরের রসের মৌসুম যেন গ্রামীণ জীবনের এক বিশেষ উৎসব।
গাছ ঝোড়ার কাজে ব্যস্ত গাছিরা
খেজুরের রস সংগ্রহের আগে গাছের মাথার শুকনো ও অপ্রয়োজনীয় অংশ পরিষ্কার করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট অংশ প্রস্তুত করতে হয়। স্থানীয়ভাবে এ কাজকে বলা হয় ‘গাছ ঝোড়া’। কাজটি করতে প্রয়োজন হয় অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সতর্কতার। কারণ, গাছের সঠিক অংশ প্রস্তুত করতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত রস পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
নন্দীগ্রাম উপজেলার হাটলাল গ্রামের আফছার আলীরও রয়েছে ১২টি খেজুরগাছ। রস সংগ্রহের প্রস্তুতি হিসেবে গাছগুলো ঝোড়ানোর কাজ করাচ্ছেন তিনি।
আফছার আলী বলেন, “আমার ১২টি খেজুরগাছ আছে। প্রতিটি গাছ ঝোড়ানোর জন্য গাছিকে ১৫০ টাকা করে মজুরি দিতে হয়েছে। এখন পুরোদমে গাছ ঝোড়ার কাজ চলছে। কয়েক দিনের মধ্যেই রস সংগ্রহের প্রস্তুতি শেষ হবে বলে আশা করছি।”
গাছিরা জানান, খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করতে হলে আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে হয়। গাছের ধরন ও অবস্থা বুঝে কাজ করতে হয়। এরপর নির্দিষ্ট অংশে হাঁড়ি বসিয়ে রস সংগ্রহ করা হয়। শীত যত বাড়ে, ততই জমে ওঠে রস সংগ্রহের মৌসুম।
রস-গুড় ঘিরে জমবে হাটবাজার
খেজুরের রস শুধু পানীয় নয়, গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও অংশ। এই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় সুস্বাদু তরল গুড় ও পাটালি। এসব গুড় দিয়ে তৈরি হয় পিঠা-পুলি, পায়েসসহ নানা রকমের মুখরোচক খাবার। শীতের সকালে খেজুরের রস আর সন্ধ্যায় গুড়ের পিঠা—এ যেন বাংলার চিরচেনা গ্রামীণ জীবনের ছবি।
রস সংগ্রহ শুরু হলে নন্দীগ্রামের বিভিন্ন হাটবাজারে বাড়বে খেজুরের গুড়ের বেচাকেনা। উপজেলার কুন্দারহাট, ওমরপুর, রণবাঘা ও নন্দীগ্রাম হাটে খেজুরের পাটালি ও তরল গুড়ের ভালো বেচাকেনা হয়ে থাকে। এ ছাড়া উপজেলার অন্যান্য বাজারেও পাওয়া যায় এসব পণ্য।
খেজুরের রস ও গুড়ের মৌসুমকে ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তৈরি হয় বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য। গাছিরা রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পাশাপাশি শীতের ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরির প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন গৃহস্থ পরিবারের সদস্যরা।
শীতের ঐতিহ্য ঘিরে অপেক্ষা
একসময় গ্রামবাংলার শীতের সকাল মানেই ছিল খেজুরের রস সংগ্রহ, নতুন গুড়ের ঘ্রাণ আর বাড়িতে বাড়িতে পিঠা তৈরির আয়োজন। সময়ের পরিবর্তনে জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন এলেও খেজুরের রস ও গুড়ের প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমেনি।
তাই শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে খেজুরগাছ ঝোড়ার এই ব্যস্ততা কেবল একটি মৌসুমি কাজ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ ঐতিহ্য, জীবিকা ও মানুষের আবেগ।
এখন শুধু অপেক্ষা—গাছে গাছে হাঁড়ি ঝোলার, ভোরে টাটকা রস নামানোর, আর নতুন গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণে শীতের সকাল মুখর হয়ে ওঠার।
নাজমুল হুদা, করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট, নন্দীগ্রাম (বগুড়া) 


















