শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৫:৫১ পূর্বাহ্ন

ফেলনা পণ্যে বিদেশি মুদ্রা

মাসুদ রানা, করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট, পাবনা
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২৩
সবুজ ছায়াঘেরা নিভৃত গ্রাম। বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে বিডি ক্রিয়েশন। দ্বিতল ভবনের কারখানাটি কর্মীতে পূর্ণ। যাঁদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। তাঁত ও সেলাই মেশিনে কাজ চলছে। কেউবা নিপুণ হাতের বুননে তৈরি করছেন নানা জিনিস।
ছন সংগ্রহ করা হচ্ছে কুষ্টিয়া থেকে। ভোলা থেকে আসছে হোগলাপাতা। খেজুরপাতা আসছে যশোর থেকে। আশপাশের পুকুর থেকে নেওয়া হচ্ছে কচুরিপানা। এমন প্রায় ফেলনা উপকরণ দিয়ে তৈরি হচ্ছে নান্দনিক সব পণ্য। যা রপ্তানি করা হচ্ছে বিশ্বের ৭৪টি দেশে।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়কারী কারখানাটি গড়ে উঠেছে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের মুনশিদপুর গ্রামে। সেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েক হাজার মানুষের। কারখানাটিকে কেন্দ্র করে বদলে যাচ্ছে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের চিত্র।
দাশুড়িয়া গ্রামের মুস্তফা আহম্মেদের (৪৫) হাত ধরে এসেছে এ পরিবর্তন। কারখানাটির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কচুরিপানা, ছন, হোগলাপাতা, খেজুরপাতা, তালপাতা, পাট, বাঁশ ও বেত। তৈরি হচ্ছে ট্রি-প্লান্টার (গাছ লাগানোর পাত্র), লন্ড্রি বাস্কেট (কাপড় রাখার ঝুড়ি), ডগ হাউস (কুকুরের ঘর), ক্যাট হাউস (বিড়ালের ঘর), ল্যাম্প, পাপোশ ও ফ্লোর ম্যাটসহ বাহারি সব পণ্য।
১৫ বছর আগে নিজের ভাগ্য–অন্বেষণে বিদেশে গিয়েছিলেন মুস্তফা আহম্মেদ। বিদেশ ঘুরে দেখেছিলেন কুটিরশিল্পের চাহিদা তুঙ্গে। এরপর আর বিদেশে থাকেননি তিনি। দেশে ফিরে কুটিরশিল্পের কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেন বলে জানান মুস্তফা আহম্মেদ। ‘অব্যবহৃত পণ্য ব্যবহার’—মন্ত্রেই তিনি যশোরের বেলাল হোসেনের (৫৫) সঙ্গে অল্প পুঁজিতে গড়ে তোলেন ‘বিডি ক্রিয়েশন’ নামের কারখানাটি।
২০১১ সালে ঢাকার গাজীপুর থেকে যাত্রা শুরু করে বিডি ক্রিয়েশন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। দিন দিন এর পরিধি বেড়েছে। বর্তমানে পাবনা ও যশোরসহ মোট পাঁচটি কারখানায় এসব পণ্য তৈরি হচ্ছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মানুষের।
এর মধ্যে পাবনার দাশুড়িয়ার কারখানাটিতে কাজ করছেন ৮৫০ নারী-পুরুষ। এর বাইরে কারখানার আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামে মানুষ বাড়িতে বসে পণ্য তৈরি করছেন। এ রকম নারীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। সংসারের কাজের পাশাপাশি এ কাজ করে তাঁরা বাড়তি আয় করছেন।
সম্প্রতি ঘুরে দেখা গেছে, সবুজ ছায়াঘেরা নিভৃত গ্রাম। এর মধ্যেই বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে বিডি ক্রিয়েশন। দ্বিতল ভবনের কারখানাটি কর্মীতে পূর্ণ। যাঁদের মধে৵ প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। তাঁত ও সেলাই মেশিনে কাজ চলছে। কেউবা নিপুণ হাতের বুননে তৈরি করছেন নানা জিনিস। কারখানা থেকে বেরিয়ে আশপাশের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, গাছের ছায়া, বাড়ির উঠান বা ঘরের বারান্দায় নারীরা ঝুড়িসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করছেন।
কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারখানাটি চালুর আগে তাঁরা বেকার ছিলেন। এখন সংসারের কাজের পাশাপাশি এখানে বসে কাজ করছেন। এ টাকায় কারও সন্তানের পড়ালেখা করছে, কেউ নিজের পড়ালেখা চালাচ্ছেন, কেউ সংসার চালাচ্ছেন। কারখানার কর্মীরা জানান, তাঁরা এখানে কাজ করে ১৪ থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন। কিছু কর্মী ২০ হাজার টাকার বেশিও আয় করেন। যাঁরা বাড়িতে বসে কাজ করেন, তাঁরা ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন।
কর্মী সালেহা খাতুনের (৪০) বাড়ি উপজেলার সাতমাইল গ্রামে। চার বছর আগে স্বামী মারা গেছেন। হঠাৎ স্বামীর মৃত্যুতে তিন সন্তান নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছিলেন। এরপর কাজ মেলে বিডি ক্রিয়েশনে। গত তিন বছর ধরে বেশ ভালোই আছেন।
মিষ্টি খাতুন নামে এক কর্মী বলেন, ‘কারখানাডা হয়া আমাগের মেলা উপকার হইছে। আশপাশের কুনু গিরামের মানুষ আর বেকার নাই। সগলেই কিছু না কিছু কাজ করতেছে।’
কারখানার সহকারী ব্যবস্থাপক এনামুল হাসান জানান, শুধু স্থানীয় লোকজন নয়, কারখানাটির সঙ্গে আশপাশের বিভিন্ন জেলার মানুষ জড়িত হয়েছেন। কুষ্টিয়া থেকে ছন সংগ্রহ করা হচ্ছে। ভোলা থেকে আসছে হোগলাপাতা। খেজুরপাতা আসছে যশোর থেকে। ফলে এসব কাঁচামাল সরবরাহ করেও বহু মানুষ উপকৃত হয়েছেন।
অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে ৮০ টাকা মণ দরে কচুরিপানা সংগ্রহ করা হচ্ছে। গ্রামের বহু লোক কচুরিপানা সরবরাহ করছেন। এগুলো সংগ্রহের পর শুকিয়ে পণ্য তৈরির উপযোগী করা হচ্ছে। পরে তা দিয়েই তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ঝুড়ি। এতে একদিকে ফসলের মাঠ, খাল-বিল কচুরিপানামুক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে।
বিডি ক্রিয়েশনের উদ্যোক্তা মুস্তফা আহম্মেদ বলেন, ‘আমাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল ব্যবহার অনুপযোগী পণ্যের ব্যবহার। সে উদ্দেশ্য থেকে কচুরিপানা, ছন ও হোগলাপাতা, তালপাতা, খেজুরপাতার মতো উপকরণ দিয়ে পণ্য তৈরি শুরু হয়। যা এখন ৭৪টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, তাঁদের কোনো পণ্য দেশের বাজারে বিক্রি হয় না। পুরোটাই রপ্তানি করা হয়। এসব পণ্য রপ্তানি করে প্রতিবছর প্রায় শতকোটি টাকার বিদেশি মুদ্রা দেশে আসে।

শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | জাগো২৪.নেট

কারিগরি সহায়তায় : শাহরিয়ার হোসাইন