গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দরিদ্র পরিবারের যুবক ভুট্রু মিয়া (৩০) ও মাইদুল ইসলাম (৩২)। তারা মোটা অংকের টাকা দিয়ে স্থানীয় কামরুল হাসান লিটন (৪০) নামের এক দালালের মাধ্যমে পাড়ি দেন- সৌদি আরবে। নতুন প্রবাসের এই যুবকদের দেওয়া হয়নি কাজের অনুমতিপত্র। যার ফলে প্রায় আট মাস ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে ভুট্রু ও মাইদুল। এদিকে গ্রামের বাড়িতে দুর্বিষহ মানবেতর জীবনযাপন করছে তাদের পরিবার-পরিজন।
সম্প্রতি খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের পূর্ব বাছহাটী গ্রামের কৃষক মো. দুলু মিয়ার বাক প্রতিবন্ধী মেয়ে পারভীন আক্তার (২৫)। প্রায় আট মাস আগে এ মেয়ের সংসারে সুখে আশায় জামাই প্রতিবেশি মৃত মোজাফফর হোসনের ছেলে ভুট্টু মিয়াকে (৩০) সৌদিতে পাঠানো হয়। কিন্তু বিদেশ পাঠানোটায় যে সর্বনাশ ডেকে আনবে এটা বুঝতে পারিনি। জামাই বিদেশ গিয়েছে ঠিকই কিন্তু পালিয়ে বেড়াচ্ছে জীবন বাঁচানোর ভয়ে। অনুরূপ পরিস্থিতির শিকার পূর্ব বাছহাটী গ্রামের সৌদি প্রবাসী মাইদুল ইসলামেরও।
এ বিষয়ে কৃষক দুলু মিয়া বলেন, মেয়েজামাই ভুট্রু মিয়াকে বিদেশ পাঠাতে চাইনি। প্রতিবেশি ফরমান আলীর ছেলে মো. কামরুল হাসান লিটন আমার জামাইকে বিদেশ পাঠানোর লোভ দেখায়। এ প্রলোভনে একটা গরু বিক্রি করি পঞ্চাশ হাজার আর সুদে নিই এক লাখ মোট দেড় লাখ আমি দেই। আর বিধবা বিয়ানি তার জমি বন্ধক এবং সুদে দেয় বাকি টাকা। লিটনের কথামতো মোট ৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা দিই গত ফেব্রুয়ারী মাসের ৪ তারিখে। ৩ দিন পর ৭ তারিখে ফ্লাইট হয়। ভাবছিলাম বিদেশে গেলেই উপার্জন করবে। টাকা পাঠালেই আগে সুদের টাকা পরিশোধ করবো। কিন্তু আট মাস হচ্ছে টাকা পাঠানো তো দূরের কথা কাজের অনুমতিপত্র না থাকায় জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বেড়াচ্ছে জামাই। এদিকে সুদের টাকা এখন বেড়েছে কয়েকগুণ। পরিশোধ করতে চাপও দিচ্ছেন দাদনরা। অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে মেয়ের সংসারেও। এখন কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না। এ বিষয়ে কামরুল হাসান লিটনের সাথে একাধিক মিটিং করা হয়েছে। তিনি আমাদের পাত্তাই দিচ্ছেন না। পরে বাধ্য হয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।
অপরদিকে কথা হয় আরেক প্রতারণার শিকার কাকলী বেগমের সাথে (২৫)। তিনি বলেন, মাঝে মধ্যে অপরিচিত মোবাইল নাম্বার থেকে আমার স্বামী মাইদুল মোবাইল করে বলেন, খুবই বিপদে আছি। কাজের অনুমতিপত্র বা আকামা দেওয়া হয়নি। জীবন বাঁচাতে তাই পালিয়ে বেড়াচ্ছি। তোমরা আমাদের উদ্ধার করো।
কাকলী বেগম আরও বলেন, আমিও বিদেশ পাঠাতে চাইনি আমার স্বামীকে। কামরুল হাসান লিটন দিন-রাত আমাদের ফুসলিয়ে ফুসলিয়ে রাজি করান। নিজের জমানো কোনো টাকা ছিলো না। বিদেশ পাঠাতে পুরো ৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা পুরোটাই সুদের উপর নিয়ে দিয়েছি। আট মাস হচ্ছে বাড়িতে স্বামী নেই। পালিয়ে বেড়াচ্ছে বিদেশের মাটিতে। মেয়ে আছে দুইটি। অনাহারে আর অর্ধাহারে দিন কাটছে আমাদের। তার উপর সুদের টাকা পরিশোধ করতে বাড়তি চাপ। সবমিলিয়ে ভীষণ কষ্টে আছি আমি। এ নিয়ে প্রতারক কামরুল হাসান লিটনের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন অভিযুক্ত কামরুল হাসান লিটন। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে বিদেশে পাঠাইনি। এখানে আমি মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছি। তারা সৌদিতে ভালো আছেন। আমার বাবা একজন মেম্বার। আমাদের সুনাম ক্ষুন্ন করতে তারা এ অপবাদক দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে কথা হয় সর্বানন্দ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম বলেন, লিটনের প্রতারণা বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছিলাম। স্থানীয়ভাবে সালিসের নির্ধারিত দিনে কামরুল হাসান লিটন ও তার বাবা মো. ফরমান আলী আসেননি। বাবা-ছেলে দু-জনেই প্রতারক বলেও জানান এই চেয়ারম্যান।
এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)মাহবুব আলম বলেন, ওই সংক্রান্ত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জাহিদ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট 


















