রাশেদুল ইসলাম (৮)। রাসেদুল একজন সেরিব্রাল পালসি প্রতিবন্ধি শিশু। রাশেদুল গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার কাবিলপুর চরের হারুনুর রশিদ ও মিসেস রাশেদা বেগমের ছেলে। রাশেদুল বাবা-মা ও বড় বোনের সাথে বসবাস করে। রাশেদুলের জন্মের পর তার বাবা ও মা খুব খুশি হলেও সে খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। বাবা-মা লক্ষ্য করেছিল রাশেদুলের চলাফেরা স্বাভাবিকের থেকে অন্য রকম। সে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা। কথা বলতে ও হাটতে পারেনা। তখন তার বাবা-মা তার কবিরাজের শরণাপন্ন হন ও তিন বছর চিকিৎসা চালিয়ে গেলেও কোনো উন্নতি না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন। অবশেষে তারা তাদের ভাগ্যকে দায়ী করে। অন্যদিকে ফ্রেন্ডশিপ ২০২০ সালের জুলাই মাস থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন মান উন্নয়নে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল জলবায়ু প্রভাবিত এলাকায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের একটি মর্যাদা পূর্ণ জীবন প্রতিষ্ঠা ও তাদের অধিকার নিশ্চিত করা। প্রকল্প কর্ম এলাকার মধ্যে রাশেদুলের বাড়ি একটি বিচ্ছিন্ন চরে। ২০২০ সালে প্রকল্পের শুরুতে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার সময় ফ্রেন্ডশিপ কর্মী রাশেদুলকে শনাক্ত করেন। প্রকল্পের ফিজিওথেরাপিষ্ট স্ক্রিনিং এর পর রাশেদুলের প্রতিবন্ধিতার ধরন শনাক্ত করেন ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রদান করে সেই সাথে তার বাবা-মাকে প্রশিক্ষণ দেয় কিভাবে দৈনন্দিন কার্যকলাপ ও বিভিন্ন থেরাপির মাধ্যমে শারীরিক উন্নতি সাধন করা যায়। তার দ্রুত বিকাশের জন্য ফ্রেন্ডশিপ তাকে বিভন্ন সহায়ক উপকরন যেমন: স্ট্যান্ডিং ফ্রেম, ওয়াকার ও মানসিক বিকাশের জন্য ছবির বই, পেন্সিলসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ প্রদান করে সেইসাথে পিতা-মাতার সাথে কাউন্সিলিং অব্যাহত রাখেন। নিয়মিত ফিজিওথেরাপিতে তার অবস্থার উন্নতি হয় এবং সে সাপোর্ট নিয়ে হাঁটতে শুরু করে এবং বর্তমানে সে সাপোর্ট ছাড়া হাঁটতে পারে। এছাড়া ফ্রেন্ডশিপ রাশেদুলের প্রতিবন্ধী কার্ডের জন্য উপজেলা সমাজসেবা অফিসে আবেদন জমা দিতে সহায়তা করে এবং সমাজসেবা অফিসের সাথে এডভোকেসি চালিয়ে যান। ফলস্বরুপ রাশেদুল প্রতিবন্ধী কার্ড পান। বর্তমানে রাশেদুল নিয়মিত প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে। রাশেদুলের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় ফ্রেন্ডশিপ কর্মী ও রাশেদুলের বাবা-মা খুশী। তারা তাদের ছেলের জীবনের এই অসাধারণ পরিবর্তনের জন্য ফ্রেন্ডশিপ এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
মুলত : ফ্রেন্ডশিপ ২০০২ সাল থেকে চরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় অক্টোবর ২০২০ গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার ৫০ টি চরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন মান উন্নয়নের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্দেশিত সমাজ ভিত্তিক পূর্ণবাসন বা বেজড রিহাবিলেশন সিআরবি এ্যাপ্রোচের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিককরন ক্ষমতায়ন ও জীবিকায়ন নিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এই প্রকল্পে লক্ষ্যগুলো হলো সমাজভিত্তিক পূর্ণবাসনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা। ফ্রেন্ডশিপ এর অনন্য সেক্টরের সহায়তায় একটি সমন্বিত প্রকল্প মডেল তৈরীর মাধ্যমে ফ্রেন্ডশিপ সংস্থাকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব করে গড়ে তোলা। ২০২৩ এর অক্টোবর হতে ২০২৬ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার ৫০ টি চরে এই প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান থাকবে এবং এই ৫০ টি চরের মধ্যে ২০ গাইবান্ধা জেলা ও ৩০ টি কুড়িগ্রাম জেলায়।
প্রজেক্ট ম্যানেজার “লাকি ম্যারান্ডি” পত্রিকার প্রতিবেদককে বলেন- প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের প্রকল্পের কাজ ও উদ্দেশ্য। ফ্রেন্ডশিপ প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে কাজ শুরু করে ২০২০ সাল থেকে। প্রকল্পের শুরুতে মোট ১৫ টি চরে কাজ শুরু করে। এর মধ্যে গাইবান্ধায় ৬ টি চর ও কুড়িগ্রাম চিলমারীর ৯ টি চর। তখন অনুধাবন করি গাইবান্ধার চর এলাকা, কুড়িগ্রাম ও চিলমারীতে প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা অনেকটাই বেশি। ২০২২;সালের জনসুমারির প্রতিবেদন অনুযায়ী রংপুর বিভাগ হচ্ছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারি, যেখানে প্রতিবন্ধি ব্যক্তির সংখ্যায় বেশি। তাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য ২০২৩ এর অক্টোবর হতে ২০২৬ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত ফ্রেন্ডশিপ ডিসএবিলিটি ইনক্লুসন প্রোগ্রাম নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। প্রতিবন্ধী মানুষদের যদি মর্যাদা পূর্ণ জীবন দিতে চাই তাহলে তার স্বাস্থ্য সেবা দরকার। তার প্রবেশগম্য দরকার। সেটা শিক্ষা ক্ষেত্রে হোক, যাতায়াতের জন্য হোক, কথাবলার জন্য হোক এবং আয় রোজগারের যে উপায় সে জন্য হোক। প্রকল্পের মাধ্যমে বিনামূল্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পেয়ে আসছে। প্রকল্পের আওতায় ২ টি ফিজিওথেরাপি সেন্টার রয়েছে। একটি গাইবান্ধা ও অপরটি চিলমারিতে অবস্থিত। এখানে ৫জন ফিজিওথেরাপিষ্ট রয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যাক্তি যাদের ফিজিওথেরাপি দরকার তাদের বিনামূল্যে ফিজিওথেরাপি তারা দিয়ে থাকে। ফ্রেন্ডশিপে এখন আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি ২০২০ সাল ২০২৪ সাল পর্যন্ত যে সমস্ত ফিজিওথেরাপি দিয়েছি তাদের অনেক সাফল্যের গল্প রয়েছে। যারা বসতে পারত না, চলতে পারত না, কথা বলতে পারত না, তাদের দৈনন্দিন যে কার্যক্রম তা করতে পারত না। এখন তারা বসতে পারে, হাটতে পারে, ভবিষ্যতে তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম তারা করতে পারবে। আমরা বারান্দা স্কুল নামে ৪টি স্কুল স্থাপন করছি। একটি গাইবান্ধা, দুটি চিলমারী ও একটি কুড়িগ্রামে। যেখানে চরের প্রতিবন্ধী শিশুরা বিশেষ শিক্ষা গ্রহণ করবে। ইতিমধ্যে প্রকল্পের উদ্যোগে ২১৩ জন প্রতিবন্ধী শিশু একীভূত শিক্ষার আওতায় এসেছে। একইসাথে প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য জন্য ১২০টি স্ব-দল গঠন করেছি। আমরা জানি প্রতিবন্ধী ব্যাক্তির জীবন গড়ে তোলা আমাদের একার পক্ষে সম্ভব না। সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ফ্রেন্ডশিপ ছাড়াও অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থা রয়েছে তাদেরকে প্রতিবন্ধীদের জন্য এগিয়ে আসতে হবে। সবাই মিলে কাজ করলে প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
সঞ্জয় সাহা, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট 


















