শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সাঁথিয়ায় পানিবন্দী ৩ হাজার পরিবার

উজানের ঢল আর টানা বর্ষণে যমুনা নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পাবনার সাঁথিয়ার নিম্নাঞ্চল খ্যাত নাগডেমড়া ইউনিয়নের ১৬ গ্রামের প্রায় তিন হাজার পরিবার দীর্ঘ দুই মাস ধরে পানিবন্দী হয়ে রয়েছে। এসব এলাকায় দেখা দিয়েছে চরম দুর্ভোগ। মানবেতর জীবনযাপন করছে ত্রাণবঞ্চিত এসব মানুষ। প্রয়োজনীয় খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও ঔষধের অভাব প্রকটভাবে অনুভব করছে বানভাসি কর্মহীন হয়ে পড়া হাজার হাজার মানুষ। পানিবাহিত ও মশাবাহিত রোগ ছড়িয়ে পরার আশঙ্কা স্থানীয়দের।এদিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত কয়েকদিনে ৪শ’ পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দিলেও বাকি পরিবারগুলোতে খাবারের জন্য হাহাকার অবস্থা তৈরি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পানিবন্দি সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমড়া ইউনিয়নের বড় সোনাতলা, ছোট সোনাতলা, বৈরাগী সোনাতলা, হাড়িয়া,পাটগাড়ী, চিনানাড়ী, ছোট নারিন্দা, নাগডেমড়া, ছোট পাতাইলহাট, বড় পাতাইলহাট, সেলন্দা, ক্ষিদিরগ্রাম,আটিয়াপাড়াসহ প্রায় ১৬টি গ্রামে দেখা যায় শুধু পানি আর পানি। প্রায় প্রতিটা বাড়ির শোবার ঘরের মধ্যে হাঁটু পানির উপরে। এদের কেউ কেউ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। আবার কেউ কেউ ঘরের সাথে বাঁশের সাকো বেধে এরপর কলার ভেলা দিয়ে বাইরে এসে বিভিন্ন কাজকর্ম করছে। পানিবন্দি হওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে এসব এলাকার মানুষ। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট।নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার শিলামনি, শামসুন্নাহার, শারমিন আক্তারসহ বেশ কয়েকজন গৃহবধূর সাথে কথা বলে জানা যায়, দুই মাসের ও অধিক সময় ধরে পানিবন্দী রয়েছে। বাড়িতে রান্না করার মতো জায়গা নেই। খেয়ে না খেয়ে পানির মধ্যে জীবনযাপন করতেছি। গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী বিক্রি করে দিয়েছি। বিশুদ্ধ খাবার পানি নেই। বাথরুমসহ যাবতীয় জিনিসপত্র পানিতে ডুবে আছে। রাত আসলে আমরা নির্ঘুম রাতযাপন করি। সাপ বিচ্ছু পোকা-মাকড় আমাদের শরীরে এসে বসে। সরকারের পক্ষ থেকে কোন সাহায্য সহযোগিতা আসেনি। আমাদের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র কেউ দেখতে আসেনা। মিন্টু শেখ ও হামিদুল শেখ জানান, দিনের পর দিন সপ্তাহের পর সপ্তাহ রয়েছি পানিবন্দী, নানা যন্ত্রনায় বসবাস করতেছি। অবশেষে পরিবারের সবাইকে শ্বশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। গরু, ছাগল বিক্রি করে দিয়েছি। আমাদের প্রতি বছরই এমন ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এর থেকে পরিত্রাণ চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন জানান তারা। নাগডেমড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ বলেন, আমার ইউনিয়নের ১৬টি গ্রামের প্রায় ৩ হাজার পরিবার ২ মাস ধরে পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। ফলে এ সব এলাকায় দেখা দিয়েছে চরম দুর্ভোগ। মানবেতর জীবনযাপন করছে হাজার হাজার ত্রাণহীন এসব মানুষ। প্রয়োজনীয় খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ঔষধের অভাব প্রকটভাবে অনুভব করছে। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা পাইনি। সপ্তাহখানেক আগে সামান্য ৪ টন খাদ্যসামগ্রী পেয়েছিলাম। আমি নিজ থেকে যতটুকু পারছি সহযোগিতা দিয়েছি।সাঁথিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মামুন আব্দুল্লাহ জানান, দীর্ঘদন ধরে পানিবন্দী থাকার দরুণ পানিবাহিত ও মশাবাহিত রোগের প্রকোপ হতে পারে। পানিবাহিত রোগের মধ্যে টাইফয়েড, কলেরা, ডাইরিয়া, জন্ডিস হতে পারে। মশাবাহিত রোগের মধ্যে ডেঙ্গুরোগ, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া রোগ হতে পারে। এছাড়াও জ্বর ঠান্ডা কাশি হতে পারে। বন্যাকবলিত এলাকায় জরুরী চিকিৎসাসেবা না দিলে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হতে পারে বলে তিনি জানান।সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এসএম জামাল আহমেদ বলেন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান থেকে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, প্রায় আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। পানিবন্দী এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে । প্রায় ৪শ’ পরিবারের মাঝে ৪ মে.টন ত্রাণ সামগ্রী দেয়া হয়েছে। বাকি পরিবারের জন্য ত্রাণ বরাদ্দ নিতে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সাথে আলোচনা করব। এরপর বাজেট বরাদ্ধ পেলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিতরণ করা হবে।

পাবনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন দফতরের কর্মকর্তা রেজাউল করিম জাগো২৪.নেট-কে বলেন, বন্যা কবলিত এলাকার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে, যেকোনো সময় বন্যাকবলিতদের নিকট পৌঁছে যাবে। তিনি আরও জানান, গবাদী পশুর জন্য গো-খাদ্য ও শিশু খাদ্য বরাদ্ধ আসছে। সেগুলোরও তালিকা তৈরি হয়ে গেছে। সময়মত প্রাপ্তদের মালামাল বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

 

জনপ্রিয়

সাঁথিয়ায় পানিবন্দী ৩ হাজার পরিবার

প্রকাশের সময়: ০৭:৪২:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

উজানের ঢল আর টানা বর্ষণে যমুনা নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পাবনার সাঁথিয়ার নিম্নাঞ্চল খ্যাত নাগডেমড়া ইউনিয়নের ১৬ গ্রামের প্রায় তিন হাজার পরিবার দীর্ঘ দুই মাস ধরে পানিবন্দী হয়ে রয়েছে। এসব এলাকায় দেখা দিয়েছে চরম দুর্ভোগ। মানবেতর জীবনযাপন করছে ত্রাণবঞ্চিত এসব মানুষ। প্রয়োজনীয় খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও ঔষধের অভাব প্রকটভাবে অনুভব করছে বানভাসি কর্মহীন হয়ে পড়া হাজার হাজার মানুষ। পানিবাহিত ও মশাবাহিত রোগ ছড়িয়ে পরার আশঙ্কা স্থানীয়দের।এদিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত কয়েকদিনে ৪শ’ পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দিলেও বাকি পরিবারগুলোতে খাবারের জন্য হাহাকার অবস্থা তৈরি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পানিবন্দি সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমড়া ইউনিয়নের বড় সোনাতলা, ছোট সোনাতলা, বৈরাগী সোনাতলা, হাড়িয়া,পাটগাড়ী, চিনানাড়ী, ছোট নারিন্দা, নাগডেমড়া, ছোট পাতাইলহাট, বড় পাতাইলহাট, সেলন্দা, ক্ষিদিরগ্রাম,আটিয়াপাড়াসহ প্রায় ১৬টি গ্রামে দেখা যায় শুধু পানি আর পানি। প্রায় প্রতিটা বাড়ির শোবার ঘরের মধ্যে হাঁটু পানির উপরে। এদের কেউ কেউ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। আবার কেউ কেউ ঘরের সাথে বাঁশের সাকো বেধে এরপর কলার ভেলা দিয়ে বাইরে এসে বিভিন্ন কাজকর্ম করছে। পানিবন্দি হওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে এসব এলাকার মানুষ। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট।নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার শিলামনি, শামসুন্নাহার, শারমিন আক্তারসহ বেশ কয়েকজন গৃহবধূর সাথে কথা বলে জানা যায়, দুই মাসের ও অধিক সময় ধরে পানিবন্দী রয়েছে। বাড়িতে রান্না করার মতো জায়গা নেই। খেয়ে না খেয়ে পানির মধ্যে জীবনযাপন করতেছি। গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী বিক্রি করে দিয়েছি। বিশুদ্ধ খাবার পানি নেই। বাথরুমসহ যাবতীয় জিনিসপত্র পানিতে ডুবে আছে। রাত আসলে আমরা নির্ঘুম রাতযাপন করি। সাপ বিচ্ছু পোকা-মাকড় আমাদের শরীরে এসে বসে। সরকারের পক্ষ থেকে কোন সাহায্য সহযোগিতা আসেনি। আমাদের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র কেউ দেখতে আসেনা। মিন্টু শেখ ও হামিদুল শেখ জানান, দিনের পর দিন সপ্তাহের পর সপ্তাহ রয়েছি পানিবন্দী, নানা যন্ত্রনায় বসবাস করতেছি। অবশেষে পরিবারের সবাইকে শ্বশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। গরু, ছাগল বিক্রি করে দিয়েছি। আমাদের প্রতি বছরই এমন ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এর থেকে পরিত্রাণ চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন জানান তারা। নাগডেমড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ বলেন, আমার ইউনিয়নের ১৬টি গ্রামের প্রায় ৩ হাজার পরিবার ২ মাস ধরে পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। ফলে এ সব এলাকায় দেখা দিয়েছে চরম দুর্ভোগ। মানবেতর জীবনযাপন করছে হাজার হাজার ত্রাণহীন এসব মানুষ। প্রয়োজনীয় খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ঔষধের অভাব প্রকটভাবে অনুভব করছে। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা পাইনি। সপ্তাহখানেক আগে সামান্য ৪ টন খাদ্যসামগ্রী পেয়েছিলাম। আমি নিজ থেকে যতটুকু পারছি সহযোগিতা দিয়েছি।সাঁথিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মামুন আব্দুল্লাহ জানান, দীর্ঘদন ধরে পানিবন্দী থাকার দরুণ পানিবাহিত ও মশাবাহিত রোগের প্রকোপ হতে পারে। পানিবাহিত রোগের মধ্যে টাইফয়েড, কলেরা, ডাইরিয়া, জন্ডিস হতে পারে। মশাবাহিত রোগের মধ্যে ডেঙ্গুরোগ, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া রোগ হতে পারে। এছাড়াও জ্বর ঠান্ডা কাশি হতে পারে। বন্যাকবলিত এলাকায় জরুরী চিকিৎসাসেবা না দিলে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হতে পারে বলে তিনি জানান।সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এসএম জামাল আহমেদ বলেন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান থেকে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, প্রায় আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। পানিবন্দী এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে । প্রায় ৪শ’ পরিবারের মাঝে ৪ মে.টন ত্রাণ সামগ্রী দেয়া হয়েছে। বাকি পরিবারের জন্য ত্রাণ বরাদ্দ নিতে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সাথে আলোচনা করব। এরপর বাজেট বরাদ্ধ পেলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিতরণ করা হবে।

পাবনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন দফতরের কর্মকর্তা রেজাউল করিম জাগো২৪.নেট-কে বলেন, বন্যা কবলিত এলাকার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে, যেকোনো সময় বন্যাকবলিতদের নিকট পৌঁছে যাবে। তিনি আরও জানান, গবাদী পশুর জন্য গো-খাদ্য ও শিশু খাদ্য বরাদ্ধ আসছে। সেগুলোরও তালিকা তৈরি হয়ে গেছে। সময়মত প্রাপ্তদের মালামাল বুঝিয়ে দেওয়া হবে।