বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আলুর দাম না পেয়ে হতাশ চাষিরা

oppo_0

দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে আলুর কাঙ্খিত দাম না পেয়ে হতাশ কৃষকেরা। ফলন ভালো হলেও বাজারদর একেবারেই কম। গত বছরের তুলনায় এবার অর্ধেকে নেমে এসেছে আলুর দাম। উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের। প্রতিকেজি আলু উৎপাদনে খরচ ২৫ টাকা হলেও বর্তমান বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৮-২০ টাকায়। এতে করে বিঘাপ্রতি কৃষকদের বড় অঙ্কের টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
জানা গেছে, এ বছর অধিক দামে আলুর বীজ কিনতে হয়েছে চাষিদের। সময়মতো রোপণের জন্য কৃষকেরা অধিক দামে এসব বীজ কিনে জমিতে রোপণ করেন। নিয়মিত পরিচর্যা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর খুবই কম। এতে ভালো ফলন হওয়া সত্ত্বেও লাভের মুখ দেখা হচ্ছে না চাষিদের। কৃষকেরা বলছেন, সার, কীটনাশক ও দিনমজুরের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় আলুর উৎপাদন ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী আলু বিক্রি করে লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনছেন তাঁরা।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, গত বছর আলুতে ভালো লাভ হওয়ায় এবার আবাদ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম কমেছে।
উপজেলার নান্দেড়াই গ্রামের কৃষক সাজ্জাদ হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে ৪ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। তাতে তাঁর বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে ৭৫-৮০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, আগাম জাতের এক বিঘা (৫০ শতক) জমিতে আলু উৎপাদিত হয়েছে ২৪০০ কেজি বা ৬০ মণ। প্রতিকেজি মাঠে ব্যবসায়ীরা ১৮ টাকা দরে কিনছেন। তাতে বিঘা প্রতি আলু বিক্রি ৫৪ হাজার টাকার হয়। সব মিলিয়ে তার ৪ বিঘা জমিতে লোকসান হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। আলুতে লোকসান হওয়ার কারণ জানিয়ে একই এলাকার কৃষক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, এ বছর আলুবীজ ও সার বেশি দামে কিনতে হয়েছে। ফলে বাজারে ২৫ টাকা বা ২৬ টাকা দরে বিক্রি করেও লোকসান গুনতে হচ্ছে।
অমরপুর ইউনিয়নের কৃষক শামসুল ইসলাম ও গোলাম মোস্তফা বলেন, আরও ১৫-২০ দিন পর আলু তুলব বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু অন্য ফসল লাগানোর জন্য তড়িঘড়ি করে আলু তুলতে হচ্ছে। তাতে বিঘাপ্রতি ৫-৬ মণ কম আলু পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে দামও কম। যেসব মহিলারা জমি থেকে আলু তুলে দিচ্ছেন, তাদের বিঘাপ্রতি ২ হাজার টাকা করে দিতে হচ্ছে। কৃষক মোকলেছ বলেন, গত বছর ৩ বিঘা জমির আলু আবাদে ৩৫ হাজার টাকা লাভ হয়েছে। এ বছর একই জমিতে ১০ হাজার টাকা লোকসান হলো।
অমরপুর এলাকার আলুচাষি আজিজুল হক শাহ বলেন, নিম্ন দরের কারণে আলু বাজারজাত করা সম্ভব না হলে বিপুল আলু অবিক্রীত থেকে যাবে এবং আলু ফেলে দেয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। সন্তোষপাড়া এলাকার মোকছেদ আলী নামের আরেক কৃষক বলেন, ৫০ শতক জমিতে আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৮০-৮৫ হাজার টাকা। সেই হিসাবে ৩০-৩২ টাকা কেজিতে বিক্রি করতে না পারলে লোকসান হবে। অথচ গত বছর এই সময়ে কেজিপ্রতি আলু বিক্রি হয়েছে ৪০-৫০ টাকায়। বর্তমানে কেজি প্রতি উৎপাদন খরচ যেখানে ২৫-২৬ টাকা, সেখানে ২০-২২ টাকায় সে আলু  বিক্রি হওয়ায় হতাশ কৃষকেরা।
উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলায় ৩ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবাদ হয়েছে ৩ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে। যা গত অর্থবছরের তুলনায় ১৩৫ হেক্টর বেশি। এর মধ্যে আগাম জাতের আলু চাষ হয়েছে ৫০-৫৫ হেক্টর জমিতে।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি অফিসার কৃষিবিদ জোহরা সুলতানা শারমিন বলেন, গত বছর আলুর চাহিদা বেশি ছিল। সে তুলনায় জোগান ছিল কম। তাই ভালো দাম পেয়েছে কৃষকেরা। গতবারের দেখাদেখি এবার আবাদ বৃদ্ধি করে একটু বেকায়দায় পড়েছেন চাষিরা। তবে সমস্যা উত্তোরণ হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষি অফিস থেকে বিক্রির পর অতিরিক্ত আলু হিমাগারে রাখার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
জনপ্রিয়

আলুর দাম না পেয়ে হতাশ চাষিরা

প্রকাশের সময়: ০৬:৫৯:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৫
দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে আলুর কাঙ্খিত দাম না পেয়ে হতাশ কৃষকেরা। ফলন ভালো হলেও বাজারদর একেবারেই কম। গত বছরের তুলনায় এবার অর্ধেকে নেমে এসেছে আলুর দাম। উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের। প্রতিকেজি আলু উৎপাদনে খরচ ২৫ টাকা হলেও বর্তমান বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৮-২০ টাকায়। এতে করে বিঘাপ্রতি কৃষকদের বড় অঙ্কের টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
জানা গেছে, এ বছর অধিক দামে আলুর বীজ কিনতে হয়েছে চাষিদের। সময়মতো রোপণের জন্য কৃষকেরা অধিক দামে এসব বীজ কিনে জমিতে রোপণ করেন। নিয়মিত পরিচর্যা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর খুবই কম। এতে ভালো ফলন হওয়া সত্ত্বেও লাভের মুখ দেখা হচ্ছে না চাষিদের। কৃষকেরা বলছেন, সার, কীটনাশক ও দিনমজুরের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় আলুর উৎপাদন ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী আলু বিক্রি করে লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনছেন তাঁরা।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, গত বছর আলুতে ভালো লাভ হওয়ায় এবার আবাদ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম কমেছে।
উপজেলার নান্দেড়াই গ্রামের কৃষক সাজ্জাদ হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে ৪ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। তাতে তাঁর বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে ৭৫-৮০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, আগাম জাতের এক বিঘা (৫০ শতক) জমিতে আলু উৎপাদিত হয়েছে ২৪০০ কেজি বা ৬০ মণ। প্রতিকেজি মাঠে ব্যবসায়ীরা ১৮ টাকা দরে কিনছেন। তাতে বিঘা প্রতি আলু বিক্রি ৫৪ হাজার টাকার হয়। সব মিলিয়ে তার ৪ বিঘা জমিতে লোকসান হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। আলুতে লোকসান হওয়ার কারণ জানিয়ে একই এলাকার কৃষক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, এ বছর আলুবীজ ও সার বেশি দামে কিনতে হয়েছে। ফলে বাজারে ২৫ টাকা বা ২৬ টাকা দরে বিক্রি করেও লোকসান গুনতে হচ্ছে।
অমরপুর ইউনিয়নের কৃষক শামসুল ইসলাম ও গোলাম মোস্তফা বলেন, আরও ১৫-২০ দিন পর আলু তুলব বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু অন্য ফসল লাগানোর জন্য তড়িঘড়ি করে আলু তুলতে হচ্ছে। তাতে বিঘাপ্রতি ৫-৬ মণ কম আলু পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে দামও কম। যেসব মহিলারা জমি থেকে আলু তুলে দিচ্ছেন, তাদের বিঘাপ্রতি ২ হাজার টাকা করে দিতে হচ্ছে। কৃষক মোকলেছ বলেন, গত বছর ৩ বিঘা জমির আলু আবাদে ৩৫ হাজার টাকা লাভ হয়েছে। এ বছর একই জমিতে ১০ হাজার টাকা লোকসান হলো।
অমরপুর এলাকার আলুচাষি আজিজুল হক শাহ বলেন, নিম্ন দরের কারণে আলু বাজারজাত করা সম্ভব না হলে বিপুল আলু অবিক্রীত থেকে যাবে এবং আলু ফেলে দেয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। সন্তোষপাড়া এলাকার মোকছেদ আলী নামের আরেক কৃষক বলেন, ৫০ শতক জমিতে আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৮০-৮৫ হাজার টাকা। সেই হিসাবে ৩০-৩২ টাকা কেজিতে বিক্রি করতে না পারলে লোকসান হবে। অথচ গত বছর এই সময়ে কেজিপ্রতি আলু বিক্রি হয়েছে ৪০-৫০ টাকায়। বর্তমানে কেজি প্রতি উৎপাদন খরচ যেখানে ২৫-২৬ টাকা, সেখানে ২০-২২ টাকায় সে আলু  বিক্রি হওয়ায় হতাশ কৃষকেরা।
উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলায় ৩ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবাদ হয়েছে ৩ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে। যা গত অর্থবছরের তুলনায় ১৩৫ হেক্টর বেশি। এর মধ্যে আগাম জাতের আলু চাষ হয়েছে ৫০-৫৫ হেক্টর জমিতে।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি অফিসার কৃষিবিদ জোহরা সুলতানা শারমিন বলেন, গত বছর আলুর চাহিদা বেশি ছিল। সে তুলনায় জোগান ছিল কম। তাই ভালো দাম পেয়েছে কৃষকেরা। গতবারের দেখাদেখি এবার আবাদ বৃদ্ধি করে একটু বেকায়দায় পড়েছেন চাষিরা। তবে সমস্যা উত্তোরণ হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষি অফিস থেকে বিক্রির পর অতিরিক্ত আলু হিমাগারে রাখার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।