একসময় বই-খাতা কাঁধে নিয়ে স্কুলে যেত রাকিব। বন্ধুদের সঙ্গে করতো খেলাধুলাও। লেখাপড়ার পর ভবিষ্যৎ নিয়ে তার ছিল অগণিত স্বপ্ন। পরিবারের একমাত্র সন্তানকে ঘিরে বাবা-মায়েরও ছিল অনেক আশা-আকাঙ্খা। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। কয়েক বছরের ব্যবধানে তার সেই স্বপ্ন আজ অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন রাকিবের বড় চাওয়া-এই সুন্দর পৃথিবী, বাবা-মায়ের মুখ আর আপনজনদের আরেকবার নিজের চোখে দেখতে পারা। একটি মানবিক উদ্যোগই হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে এক তরুণের হারিয়ে যাওয়া চোখের আলো, অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং নতুন করে বেঁচে থাকার অধিকার।
রাকিব হোসেন (২৩) দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আলোকঝাড়ী ইউনিয়নের বাসুলী গ্রামের মাঝিপাড়ার বাসিন্দা মো. একরামুল হকের একমাত্র ছেলে। সে ২০২১ সালে খানসামা সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। ঠিক সেই সময় হঠাৎ তার ডান চোখ লাল হয়ে যায়। চোখ দিয়ে পড়তে থাকে পানি এবং শুরু হয় তীব্র ব্যথা। প্রথমে সাধারণ সমস্যা মনে করলেও কয়েকদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। পরিবার প্রথমে তাকে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার বিবি কাঞ্চন চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে ঢাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করায়। ওই বছরের শেষদিকে তার ডান চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়। ভেবেছিল-চিকিৎসার পর হয়তো সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু মাত্র ৮ মাসের মাথায় একই সমস্যা দেখা দেয় বাম চোখেও। শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসাযুদ্ধ। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল, এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটে বেড়াতে থাকে তার পরিবার।
দেশে আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় ২০২২ সালে রাকিবকে ভারতের কলকাতার অ্যাপোলো মাল্টি স্পেশালিটি হাসপাতাল এবং পরে শিলিগুড়ির হিমালয় আই ইনস্টিটিউটে নেয়া হয়। সেখানকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের শংকর নেত্রালয়া হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন। চেন্নাইয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা তার পরিবারের সদস্যদের জানান, বাংলাদেশে পূর্বে দেয়া চিকিৎসায় গুরুতর ত্রুটি ছিল। একই ধরনের মতামত দেন ঢাকার ভিশন আই চক্ষু হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও। এতে তার পরিবার আরও হতাশ হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে তার চোখের চিকিৎসার পিছনে ব্যয় হয়েছে বিপুল অর্থ। সহায়-সম্বল বিক্রি, ধারদেনা এবং আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় চিকিৎসা চালিয়েও শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা যায়নি রাকিবের চোখের আলো। বর্তমানে সে দুই চোখই সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন। তবে অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো নিভে যায়নি। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা এখনও রয়েছে। কিন্তু সেই চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন অন্তত ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। যা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।
রাকিব হোসেন বলেন, আমি বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সমাজের বিত্তবান, দানশীল এবং মানবিক সংগঠনগুলোর নিকট বিনীত আবেদন জানাই-আপনারা আমার পাশে দাঁড়ান। আপনাদের সহযোগিতা পেলে হয়তো আবারও এই সুন্দর পৃথিবী দেখতে পাবো এবং নতুন করে জীবন শুরু করতে পারব।
রাকিবের বাবা মো. একরামুল হক বলেন, একজন বাবার জন্য এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কিছু হতে পারে। নিজের সন্তানের সামনে থেকেও সে আমাকে দেখতে পায় না। ছেলের চিকিৎসার জন্য যা ছিল সব ব্যয় করেছি। এখন উন্নত চিকিৎসার জন্য আরও ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা প্রয়োজন। এত টাকা জোগাড় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সরকার, সমাজের বিত্তবান, বিভিন্ন মানবিক সংগঠন ও দেশের সকল হৃদয়বান মানুষের কাছে আমার আকুল আবেদন-আপনারা আমার সন্তানের পাশে দাঁড়ান।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহনিমা তরফদার বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আমাদের দেশে অসংখ্য মানুষ রয়েছেন। সবাই যদি সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প অল্প করে এগিয়ে আসেন, তাহলে ছেলেটির চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সম্ভব হবে। সে আবারও চোখের আলো ফিরে পাওয়ার আশা করতে পারে। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো একটি মহৎ কাজ। অসহায়কে সাহায্য করলে মহান আল্লাহও সন্তুষ্ট হন। তাই মানবতার এই প্রয়োজনে তিনি সকলকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুজ্জামান সরকার বলেন, রাকিবের বিষয়টি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা হলে রাকিবের উন্নত চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। মানবিক কাজে এগিয়ে আসা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক সংগঠন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
রাকিবের পরিবার জানায়, সময়মতো প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করা গেলে দ্রুত বিদেশে উন্নত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব। তাই তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ, প্রবাসী বাংলাদেশি, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও মানবিক সংগঠনের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান। একটি মানবিক উদ্যোগই হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে এক তরুণের হারিয়ে যাওয়া চোখের আলো, অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং নতুন করে বেঁচে থাকার অধিকার। সাহায্য পাঠানোর ঠিকানা: রাকিব হোসেনের বাবা মো. একরামুল হক। বিকাশ/নগদঃ ০১৭৭৬-৯৬৯৭৭৯
সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট, চিরিরবন্দর (দিনাজপুর) 
















