শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শাশুরির জায়গায় থাকি, ছেলে বেঁচে থাকলে নিজের বাড়িভিটা হতো: শহীদ নাজমুলের মা

আমার রিকশা চালক স্বামী অনেক আগে মারা গেছেন। একমাত্র ছেলে নাজমুল মিয়াকে (২৩) নিয়ে শ্বাশুরির বাড়িতে থাকি। নিজের বাড়িভিটা করার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করছেলিন নাজমুল। এরই মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের পতন আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় নাজমুল। আমার এই ছেলেটি বেঁচে থাকলে নিজস্ব বাড়িভিটা হতো। আমাকে যদি সরকারের পক্ষ থেকে ঘরবাড়ি করে দিতো তাহলে হয়তো ছেলের সেই স্বপ্ন পূরণ হতো। এভাবে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বললেন চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শহীদ নাজমুল মিয়ার মা গোলেভান বেওয়া।

সম্প্রতি সরেজমিনে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার কামারপাড়া ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়- ছেলেহারা শোক আর মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে দুঃচিন্তায় যেনো আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠছে গোলেভানের।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অতিদরিদ্র পরিবারের একমাত্র ছেলে নাজমুল হাসান। তার রিকশাচালক বাবা হাইদুল ইসলাম অনেক আগে মারা গেছেন। সেই থেকে মা গোলেভান বেওয়া আর ছোট দুই বোন- হিরা মনি ও আয়শা খাতুনকে নিয়ে সংসারে হাল ধরেন নাজমুল। জীবিকার তাগিদে ঢাকার আশুলিয়া এলাকার সিয়াম গার্মেন্টেসে চাকরি করছিলেন। এরই মধ্যে চব্বিশে সারাদেশ যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলনে উত্তাল, তখন নাজমুল মিয়াও এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। গত ২০২৪ সালে ৪ আগস্ট আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হন। সেই গুলি ঢোকে তার পেটের ডান পাশ ভেতর। এসময় কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ আগস্ট সন্ধ্যার পর মারা যায় নাজমুল। এরপর ধারদেনা করে তার লাশ গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। সেখানে ১০ আগস্ট সকালে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। এরপর গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সেই করব থেকে শহীদ নাজমুলের লাশ উত্তোলনের জন্য প্রস্তুতি নেয় প্রশাসন। এসময় স্থানীয়দের বাধার মুখে লাশ তুলতে ব্যর্থ হয় প্রশাসন মহল।

শহীদ নাজমুল হাসানের বোনজামাই আব্দুল মজিদ মিয়া বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গিয়ে ভাইটির মৃত্যুর পর শাশুরি তার অস্থায়ী বাড়িতে একাই হয়ে পড়েন। তাকে কিছুটা সহযোগীতার করতে তখন থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এ বাড়িতে বসবাস করছি।

এই শহীদ নাজমুল হাসানের মা গোলেভান বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা গরীব মানুষ। নেই বসত ভিটা। দাদী শাশুরি রাহেলা বেওয়ার জায়গায় টিনসেড ঘর তুলে বসবাস করছি। সেখানেও নেই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা।  স্বামী অনেকদিন আগে মারা গেছেন। আমাদের একটায় ছেলে নাজমুল। বিয়ে না করে গার্মেন্টেসের চাকরি নিয়ে আমাকে দেখাশুনা করছিল। এরপর শেখ হাসিনার বিরুদ্দে আন্দোলনে গিয়ে বন্দুকের গুলিতে নিহত হয়।

এ বিষয়ে গাইবান্ধা জুলাই যোদ্ধা সংগঠনের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের শহীদ নাজমুল হাসানের পরিবারে সহযোগীতা করাসহ খোঁজখঁবর নেওয়া হচ্ছে। আমরা সকল যোদ্ধাদের পাশে আছি।

সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহীদ নাজমুল মিয়ার পরিবারের সহযোগীতা অব্যাহত রয়েছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন দিবসে এ পরিবারের সম্মাননা দেওয়া হয়।

জনপ্রিয়

শাশুরির জায়গায় থাকি, ছেলে বেঁচে থাকলে নিজের বাড়িভিটা হতো: শহীদ নাজমুলের মা

শাশুরির জায়গায় থাকি, ছেলে বেঁচে থাকলে নিজের বাড়িভিটা হতো: শহীদ নাজমুলের মা

প্রকাশের সময়: ০৩:০৪:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

আমার রিকশা চালক স্বামী অনেক আগে মারা গেছেন। একমাত্র ছেলে নাজমুল মিয়াকে (২৩) নিয়ে শ্বাশুরির বাড়িতে থাকি। নিজের বাড়িভিটা করার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করছেলিন নাজমুল। এরই মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের পতন আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় নাজমুল। আমার এই ছেলেটি বেঁচে থাকলে নিজস্ব বাড়িভিটা হতো। আমাকে যদি সরকারের পক্ষ থেকে ঘরবাড়ি করে দিতো তাহলে হয়তো ছেলের সেই স্বপ্ন পূরণ হতো। এভাবে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বললেন চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শহীদ নাজমুল মিয়ার মা গোলেভান বেওয়া।

সম্প্রতি সরেজমিনে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার কামারপাড়া ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়- ছেলেহারা শোক আর মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে দুঃচিন্তায় যেনো আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠছে গোলেভানের।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অতিদরিদ্র পরিবারের একমাত্র ছেলে নাজমুল হাসান। তার রিকশাচালক বাবা হাইদুল ইসলাম অনেক আগে মারা গেছেন। সেই থেকে মা গোলেভান বেওয়া আর ছোট দুই বোন- হিরা মনি ও আয়শা খাতুনকে নিয়ে সংসারে হাল ধরেন নাজমুল। জীবিকার তাগিদে ঢাকার আশুলিয়া এলাকার সিয়াম গার্মেন্টেসে চাকরি করছিলেন। এরই মধ্যে চব্বিশে সারাদেশ যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলনে উত্তাল, তখন নাজমুল মিয়াও এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। গত ২০২৪ সালে ৪ আগস্ট আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হন। সেই গুলি ঢোকে তার পেটের ডান পাশ ভেতর। এসময় কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ আগস্ট সন্ধ্যার পর মারা যায় নাজমুল। এরপর ধারদেনা করে তার লাশ গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। সেখানে ১০ আগস্ট সকালে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। এরপর গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সেই করব থেকে শহীদ নাজমুলের লাশ উত্তোলনের জন্য প্রস্তুতি নেয় প্রশাসন। এসময় স্থানীয়দের বাধার মুখে লাশ তুলতে ব্যর্থ হয় প্রশাসন মহল।

শহীদ নাজমুল হাসানের বোনজামাই আব্দুল মজিদ মিয়া বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গিয়ে ভাইটির মৃত্যুর পর শাশুরি তার অস্থায়ী বাড়িতে একাই হয়ে পড়েন। তাকে কিছুটা সহযোগীতার করতে তখন থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এ বাড়িতে বসবাস করছি।

এই শহীদ নাজমুল হাসানের মা গোলেভান বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা গরীব মানুষ। নেই বসত ভিটা। দাদী শাশুরি রাহেলা বেওয়ার জায়গায় টিনসেড ঘর তুলে বসবাস করছি। সেখানেও নেই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা।  স্বামী অনেকদিন আগে মারা গেছেন। আমাদের একটায় ছেলে নাজমুল। বিয়ে না করে গার্মেন্টেসের চাকরি নিয়ে আমাকে দেখাশুনা করছিল। এরপর শেখ হাসিনার বিরুদ্দে আন্দোলনে গিয়ে বন্দুকের গুলিতে নিহত হয়।

এ বিষয়ে গাইবান্ধা জুলাই যোদ্ধা সংগঠনের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের শহীদ নাজমুল হাসানের পরিবারে সহযোগীতা করাসহ খোঁজখঁবর নেওয়া হচ্ছে। আমরা সকল যোদ্ধাদের পাশে আছি।

সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহীদ নাজমুল মিয়ার পরিবারের সহযোগীতা অব্যাহত রয়েছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন দিবসে এ পরিবারের সম্মাননা দেওয়া হয়।