দিনাজপুরের চিরিরবন্দর-পার্বতীপুর উপজেলার সীমান্তের পার্বতীপুর অংশে বাড়িতে যাওয়ার রাস্তার দ্বন্দ্ব ও নতুন বাড়ি নির্মাণের মালামাল ক্রয়ে ক্ষোভের জেরে মনোরঞ্জন রায় (৫৫) নামে এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এঘটনায় নিহতের ছেলে বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছে। এ হত্যা ঘটনার সাথে জড়িত আসাদুজ্জামান (৩৬) নামে এক যুবককে ঘটনাস্থল থেকেই আটক ও গভীর রাতে চিরিরবন্দর উপজেলার ফতেজংপুর ইউনিয়নের বড় হাশিমপুর সরকারপাড়া থেকে আলম হোসেন আলোকে (৪০) আটক করেছে পুলিশ। এঘটনাটি গত ২৫ অক্টোবর রবিবার বেলা আনুমানিক ১১টায় উপজেলার বেলাইচন্ডি ইউনিয়নের রাবেয়ার মোড় এলাকার সোনাপুকুর নয়া মোল্লাপাড়ায় ঘটেছে। নিহত মনোরঞ্জন রায় চিরিরবন্দর উপজেলার ইসবপুর ইউনিয়নের চকসুকদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও চকসুকদেবপুর গ্রামের মালিপাড়ার অসীম চন্দ্র রায়ের ছেলে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, নিহত মনোরঞ্জন রায়ের সাথে নয়া মন্ডলপাড়ার মৃত আজিজুর রহমানের কলেজে লেখাপড়া করার সময় থেকেই বন্ধুত্ব ও সু-সম্পর্ক ছিল। অসুস্থ্যতাজনিত কারণে আজিজুর রহমান মৃত্যুবরণ করলে সমসাময়িক বন্ধুরা একত্রিত হয়ে (মনোরঞ্জন রায়ের বেশকিছু জমি মৃত বন্ধু আজিজুরের বাড়ির পাশে হওয়াতে) তার পরিবারকে দেখভালের দায়িত্ব দেয় শিক্ষক বন্ধু মনোরঞ্জনকে। তখন থেকেই ওই পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল শিক্ষক মনোরঞ্জনের। অপরদিকে, মৃত আজিজুরের স্ত্রী রোমানা বেগম বাড়ির পার্শ্ববর্তী এলাকার ফরতাজ হোসেন (৫৬) নামে এক ব্যক্তিকে ধর্মপিতা হিসেবে গ্রহণ করেন। সেই থেকে ওই ধর্মপিতা প্রায়ই ওই বাড়িতে যাতায়াত শুরু করে। গত কয়েকমাস পুর্বে মৃত আজিজুরের স্ত্রী রোমানা বেগম ও সন্তানেরা পাড়ার মধ্যবর্তী তাদের পুরাতন বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলে নয়া মোল্লাপাড়ার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে নতুন বাড়ি নির্মাণ শুরু করে। এতে করে নবনির্মিত বাড়ির পার্শ্ববর্তী বাড়ির মালিক মোস্তাহার, আলম হোসেন, আসাদুজ্জামান, শরিফুল ইসলামের বাড়িতে যাতায়াতের রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। এতে রাস্তা নিয়ে তাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। পর্যাপ্ত জায়গা না ছেড়ে নতুন বাড়ি নির্মাণের জন্য শিক্ষক মনোরঞ্জনকে দায়ী করেন প্রতিবেশিরা। তখন থেকেই ওই শিক্ষকের উপর ক্ষোভ ছিল মোস্তাহার পরিবারের। এছাড়াও নতুন বাড়ি নির্মাণের সময় কাঠের পাইড়, বাতা, উয়া, টিনসহ বিভিন্ন মালামাল ক্রয় ও নির্মাণ শ্রমিক ম্যানেজ করতে মৃত আজিজুরের স্ত্রীকে ধর্মপিতা ফরতাজ হোসেন বেশি দর টাকার প্রস্তাব দেয়, শিক্ষক মনোরঞ্জন কম দর টাকার প্রস্তাব দেয়। শেষ পর্যন্ত মৃত আজিজুরের স্ত্রী ও সন্তানেরা মনোরঞ্জনের প্রস্তাব মেনে নিয়ে মালামাল ক্রয় বাড়ি নির্মাণ শেষ করেন। এ নিয়ে ধর্মপিতা ফরতাজ হোসেন চরম ক্ষুদ্ধ হন। ধর্মপিতা ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে ধর্ম মেয়ের বাড়িতে এসে অশালীন কথাবার্তাসহ বকাবকি শুরু করে। এসময় ধর্মমেয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে ধর্মপিতা মারপিট করে। এ ঘটনাটি ধর্মমেয়ে রোমানা বেগম মুঠোফোনে মনোরঞ্জনকে জানিয়ে দ্রুত তাদের বাড়িতে আসতে বলে। মনোরঞ্জন মৃত আজিজুরের আপন বড়ভাইকে সাথে নিয়ে বেলা ১১টার দিকে ওই বাড়িতে যান। বাড়িতে পৌঁছামাত্র ধর্মপিতা ফরতাজ মনোরঞ্জনকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে ও ধর্মমেয়ের সাথে পরকিয়া সম্পর্কের অভিযোগ করে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে মনোরঞ্জন ধর্মপিতা ফরতাজ হোসেনের গালে একটি চড় দেয়। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে ফরতাজ হোসেন প্রতিবেশী মোস্তাহার ও তার ছেলে আলম হোসেন, আসাদুজ্জামান ও শরিফুলকে ডেকে আনেন। তারা এসে বেড়ার বাঁশের খুঁটি, কাঠের বাতা, বাঁশের মুড়া জাতীয় বস্তুসহ লাঠি দিয়ে মনোরঞ্জনকে বেধড়ক মারপিট শুরু করে। মৃত আজিজুরের বড়ভাই, স্ত্রী, সন্তানেরা এসময় তাদের আটকানোর চেষ্টা করে। এসময় তাদেরকেও মারপিট করা হয়। তাদের মধ্যে প্রচন্ড ধস্তাধস্তি হয়। এই ধস্তাধস্তিতে মোস্তাহারের স্ত্রী আরজু বেগম (৫০), ছেলে আলম হোসেনের স্ত্রী শারমিন (২৫), প্রতিবেশী মিনু আরা জড়িয়ে পড়ে। সুযোগ পেয়ে মনোরঞ্জন দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করলে আলম হোসেন, ফরতাজ হোসেন, আসাদুজ্জামান, শরিফুল একটি গাছের ডাল ভেঙ্গে পিছনে ধাওয়া করে মারতে মারতে প্রায় দেড়শ’ মিটার দূরে একটি ধানক্ষেতে ফেলে চলে যায়। পাড়ার লোকজন মনে করে মনোরঞ্জন পালিয়ে গেছে। তারা চুপচাপ থেকে যায়। দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে জনৈক এক ছেলে ঘাস কাটার সময় শিক্ষক মনোরঞ্জনকে ধানক্ষেতে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার শুরু করে। এসময় মৃত আজিজুরের স্ত্রী, সন্তানেরা ঘটনাস্থলে যায় এবং মরদেহটি বাড়িতে নিয়ে আসে। জরুরীসেবা ৯৯৯ নম্বরে সংবাদ পেয়ে থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে ও হত্যার সাথে জড়িত আসাদুজ্জামানকে আটক করলে অন্যান্যরা পালিয়ে যায়।
দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আনোয়ার হোসেন জানান, ঘটনার পর জাতীয় জরুরিসেবা ৯৯৯ নম্বরে খবর পেয়ে পার্বতীপুর মডেল থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় আসাদুজ্জামান নামে এক যুবককে ঘটনাস্থল থেকেই আটক করা হয় ও গভীর রাতে বড় হাশিমপুর সরকারপাড়া থেকে আলম হোসেন আলোকে আটক করা হয়।
থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, এ ঘটনায় নিহতের বড় ছেলে চন্দন কুমার রায় বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য দিমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এজাহারভুক্ত অন্যান্য আসামীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। পরবর্তীতে ময়নাতদন্ত রিপোর্টের আলোকে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে, গতকাল ২৬ অক্টোবর সোমবার দুপুরে চিরিরবন্দর উপজেলার চক সুকদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোরঞ্জন রায়কে পিটিয়ে হত্যার প্রতিবাদে ও হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তিসহ ফাঁসির দাবিতে ফতেজংপুর ইউনিয়নের দেবিগঞ্জ বাজারে প্রায় ঘন্টাব্যাপি দিনাজপুর-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে এলাকাবাসী।
সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট, চিরিরবন্দর (দিনাজপুর) 



















