সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এখন চরবাসীর ভরসা হবে ‘খুদি বাড়ি’

তোফায়েল হোসেন জাকির: বর্ষা এলেই বাড়ে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি। একসময় সেই পানি ঢুকে পড়ে ঘরবাড়িতে। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। তখন মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে হয় গাইবান্ধা সদর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল সিধাই গ্রামের মানুষকে। কেউ আশ্রয় নেন উঁচু জায়গায়, কেউবা কলাগাছের ভেলা কিংবা নৌকায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে বিপাকে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। ঘরের আসবাবপত্র, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও জমির দলিল রক্ষা করাও হয়ে ওঠে কঠিন। এমন দুর্ভোগের মধ্যে চরবাসীর মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে ‘খুদি বাড়ি’।

বন্যার সময় নিরাপদ আশ্রয়ের কথা চিন্তা করে সিধাই গ্রামে এই বিশেষ ঘর নির্মাণ করেছে সৃজনশীল গাইবান্ধা ফাউন্ডেশন নামে একটি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। টানা পাঁচ দিনের প্রচেষ্টায় বাঁশ ও ইস্পাতের কাঠামো দিয়ে নির্মিত ঘরটি ইতোমধ্যে স্থানীয় মানুষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

সিধাই গ্রামের বাসিন্দা রিনা বেগমের কাছে বন্যা মানেই দুর্ভোগ আর অনিশ্চয়তা। পানি বাড়লে কোথায় আশ্রয় নেবেন, কীভাবে পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে রাখবেন—সেই চিন্তা পেয়ে বসে তাকে। অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগে বন্যার সময় আমাদের কলাগাছের ভেলা কিংবা উঁচু জায়গায় থাকতে হতো। এ রকম বাড়ি থাকলে অনেক উপকার হবে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারবেন।

একই গ্রামের মনিরুল ইসলামের দুশ্চিন্তা ঘরবাড়ি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে। বন্যার পানি বাড়লেই এসব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তার আশা, নতুন ঘরটি দুর্যোগের সময় গ্রামের মানুষের কাজে আসবে।

আরেক বাসিন্দা শামিম হোসেন বলেন, বন্যার সময় গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, বিশেষ করে জমির দলিল নিরাপদে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের ঘরে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখা গেলে আমাদের অনেকটা দুশ্চিন্তা কমবে।

চরবাসী বলছেন, আমাদের এই দুর্ভোগের কথা ভেবেই এগিয়ে এসেছেন সৃজনশীল গাইবান্ধা ফাউন্ডেশনের তরুণ সদস্যরা। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ‘যুব নেতৃত্বে জলবায়ু অভিযোজন’ উদ্যোগের আওতায় সংগঠনটি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা অনুদান পায়। এর সঙ্গে নিজস্ব তহবিলের আরও ২০ হাজার টাকা যুক্ত করে মোট দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে ঘরটি নির্মাণ করা হয়।

খ্যাতিমান স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুমের নকশা করা ‘খুদি বাড়ি’র আদলে নির্মিত ঘরটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ১০ ফুট করে। উচ্চতা প্রায় ১৩ ফুট। নির্মাণকাজে কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছে ফেস বাংলাদেশ। ঘরটি নির্মাণের জন্য নিজের জায়গা দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা সাজেদা বেগম (৪৫)।

সাজেদা বেগম জানান, বন্যার সময় গ্রামের মানুষ যেন নিরাপদ আশ্রয় পান, সেই চিন্তা থেকেই তিনি জায়গা দিয়েছেন। এখন দুর্যোগের দিনে ঘরটি অসহায় মানুষের কাজে আসবে।

সৃজনশীল গাইবান্ধা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. মেহেদী হাসান বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি। বন্যার সময় ঘরটিতে সাত থেকে আটজন আশ্রয় নিতে পারবেন। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে আরও এমন ঘর নির্মাণ করতে চাই।

তিনি আরও বলেন, ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে থাকা সিধাই চরের মানুষের কাছে বন্যা নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর পানির সঙ্গে লড়াই করেই তাদের জীবন চলে। সেই জনপদে নির্মিত একটি ছোট্ট ঘর হয়তো সবার আশ্রয়ের সংকট দূর করতে পারবে না। তবে দুর্যোগের দিনে অন্তত কয়েকজন মানুষের মাথা গোঁজার নিরাপদ ঠাঁই হয়ে উঠবে।

জনপ্রিয়

এখন চরবাসীর ভরসা হবে ‘খুদি বাড়ি’

প্রকাশের সময়: ০১:৩৫:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

তোফায়েল হোসেন জাকির: বর্ষা এলেই বাড়ে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি। একসময় সেই পানি ঢুকে পড়ে ঘরবাড়িতে। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। তখন মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে হয় গাইবান্ধা সদর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল সিধাই গ্রামের মানুষকে। কেউ আশ্রয় নেন উঁচু জায়গায়, কেউবা কলাগাছের ভেলা কিংবা নৌকায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে বিপাকে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। ঘরের আসবাবপত্র, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও জমির দলিল রক্ষা করাও হয়ে ওঠে কঠিন। এমন দুর্ভোগের মধ্যে চরবাসীর মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে ‘খুদি বাড়ি’।

বন্যার সময় নিরাপদ আশ্রয়ের কথা চিন্তা করে সিধাই গ্রামে এই বিশেষ ঘর নির্মাণ করেছে সৃজনশীল গাইবান্ধা ফাউন্ডেশন নামে একটি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। টানা পাঁচ দিনের প্রচেষ্টায় বাঁশ ও ইস্পাতের কাঠামো দিয়ে নির্মিত ঘরটি ইতোমধ্যে স্থানীয় মানুষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

সিধাই গ্রামের বাসিন্দা রিনা বেগমের কাছে বন্যা মানেই দুর্ভোগ আর অনিশ্চয়তা। পানি বাড়লে কোথায় আশ্রয় নেবেন, কীভাবে পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে রাখবেন—সেই চিন্তা পেয়ে বসে তাকে। অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগে বন্যার সময় আমাদের কলাগাছের ভেলা কিংবা উঁচু জায়গায় থাকতে হতো। এ রকম বাড়ি থাকলে অনেক উপকার হবে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারবেন।

একই গ্রামের মনিরুল ইসলামের দুশ্চিন্তা ঘরবাড়ি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে। বন্যার পানি বাড়লেই এসব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তার আশা, নতুন ঘরটি দুর্যোগের সময় গ্রামের মানুষের কাজে আসবে।

আরেক বাসিন্দা শামিম হোসেন বলেন, বন্যার সময় গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, বিশেষ করে জমির দলিল নিরাপদে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের ঘরে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখা গেলে আমাদের অনেকটা দুশ্চিন্তা কমবে।

চরবাসী বলছেন, আমাদের এই দুর্ভোগের কথা ভেবেই এগিয়ে এসেছেন সৃজনশীল গাইবান্ধা ফাউন্ডেশনের তরুণ সদস্যরা। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ‘যুব নেতৃত্বে জলবায়ু অভিযোজন’ উদ্যোগের আওতায় সংগঠনটি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা অনুদান পায়। এর সঙ্গে নিজস্ব তহবিলের আরও ২০ হাজার টাকা যুক্ত করে মোট দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে ঘরটি নির্মাণ করা হয়।

খ্যাতিমান স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুমের নকশা করা ‘খুদি বাড়ি’র আদলে নির্মিত ঘরটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ১০ ফুট করে। উচ্চতা প্রায় ১৩ ফুট। নির্মাণকাজে কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছে ফেস বাংলাদেশ। ঘরটি নির্মাণের জন্য নিজের জায়গা দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা সাজেদা বেগম (৪৫)।

সাজেদা বেগম জানান, বন্যার সময় গ্রামের মানুষ যেন নিরাপদ আশ্রয় পান, সেই চিন্তা থেকেই তিনি জায়গা দিয়েছেন। এখন দুর্যোগের দিনে ঘরটি অসহায় মানুষের কাজে আসবে।

সৃজনশীল গাইবান্ধা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. মেহেদী হাসান বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি। বন্যার সময় ঘরটিতে সাত থেকে আটজন আশ্রয় নিতে পারবেন। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে আরও এমন ঘর নির্মাণ করতে চাই।

তিনি আরও বলেন, ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে থাকা সিধাই চরের মানুষের কাছে বন্যা নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর পানির সঙ্গে লড়াই করেই তাদের জীবন চলে। সেই জনপদে নির্মিত একটি ছোট্ট ঘর হয়তো সবার আশ্রয়ের সংকট দূর করতে পারবে না। তবে দুর্যোগের দিনে অন্তত কয়েকজন মানুষের মাথা গোঁজার নিরাপদ ঠাঁই হয়ে উঠবে।