শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পুর্ব প্রকাশের পর: পলাশবাড়ী উপজেলার নামকরণ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য

(পুর্ব প্রকাশের পর)

অনেকেই মনে করে, কোন এক পলাশ ফুলের গাছ থেকে আজকের পলাশবাড়ী নামকরণ হয়েছে।কিন্ত এ দাবির প্রমাণ আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেন নি। যদি কোন গাছের থেকেই পলাশবাড়ী উপজেলার নামের উৎপত্তি হয়, তবে আড়াইশো বছর আগের জেমস রেনেলের বা তারও আগের চারশ(৪শ) বছরের পুরাতন ভ্যান ডে ব্রুকের ম্যাপে পলাশবাড়ীর অস্তিত্ব কোথা থেকে আসলো?

পলাশবাড়ি কি শুধু দুই-চারশো বছর আগের? নাকি এর দীর্ঘ ইতিহাস আছে? চলুন, তাহলে জানা যাক… ১৯১৫ সালে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর দামোদরপুর থেকে ৫টি প্রাচীন পান্ডুলিপি আবিস্কার হয়, পাঁচটি পান্ডুলিপির একটি, দামোদর গুপ্ত কর্তৃক ২১৪ গুপ্ত সনে (৫৪৩ খ্রিস্টাব্দের) । এখানে উল্লেখিত, পলাশবৃন্দ কেন্দ্রস্থল কে বর্তমান গাইবান্ধার পলাশবাড়ী বলে কোন কোন গবেষক ধারণা করেন। আবার ১৯৩০ সালের হিলির বৈগ্রাম থেকে প্রথম কুমার গুপ্তের যে পান্ডুলিপি আবিষ্কার হয়েছে তাতে পলাশবৃন্দক ও পুরাণবৃন্দকহরি স্থানের নাম পাওয়া যায়। যেগুলো ঘোড়াঘাটের আশেপাশে অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা ছিল, খুব সম্ভবত পান্ডুলিপির পলাশবৃন্দক ও পুরাণবৃন্দক হরি আজকের পলাশবাড়ী নামের অপভ্রংশ।

আনুমানিক ২৮০ থেকে ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল এই গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। (ছবিঃ প্রথম কমেন্টে) একটি শহর বেশিরভাগ সময়েই নদী বা রাস্তার ওপর গড়ে ওঠে। সেই শহরের ইতিহাস জানতে হলে সেই নদী বা রাস্তার ইতিহাস জানতে হবে। মেজর জেমস রেনেলের ১৭৭৩ সালের ম্যাপ, ভ্যা ডে ব্রুকের ম্যাপ, বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন থেকে তথ্য নিয়ে আজকের এই প্রতিবেদন। আচ্ছা কেউ কি বলতে পারেন পলাশবাড়ী কোন নদীর তীরে অবস্থিত? নদীটার নাম আখিরা মাচ্চা। এই নদীটি পাউবো দ্বারা চিহ্নিত উত্তর পশ্চিমাঞ্চল অর্থাৎ পুরো রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের এক নম্বর নদী। অর্থাৎ এই অঞ্চলের নদীর হিসাব, এখান থেকেই শুরু হয়।

অনেকেই ভাবছেন যে কোথায় এটি? পলাশবাড়ীর পাশে বিটিসির মোড়ে চলে যান। বামের রাস্তা ধরে একটু ভিতরে গেলেই পেয়ে যাবেন আখিরা মাচ্চা নদী। অথবা ঘোড়াঘাটের ব্রীজের অদূরে যমুনেশ্বরী আর বাঙ্গালী নদীর মোহনায় যে ছোট্ট নদীটি উত্তর দিকে চলে গিয়েছে সেটিই আখিরা মাচ্চা। ধাপের হাটের আগে ঢাকা রংপুর মহাসড়কের পাশে যে নদীটি দেখা যায় সেটিই আখিরা মাচ্চা। এখন বলবেন ওটা নদী? ওটা তো খাল। হুম, দেখতে খাল মনে হলেও এই নদীর আছে দীর্ঘ ইতিহাস। এটি যে কত বড় নদী ছিল তা বন্যার সময় টের পাওয়া যায়। এই নদীর সূত্র ধরেই বেড়িয়ে আসতে পারে পলাশবাড়ীর আদি ইতিহাস । একটু শুরু থেকে বলি……. প্রাচীন কালে করতোয়া এক বিশাল নদী ছিল। এত বড় যে এটি পার হতে গিয়ে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি তার তিব্বত অভিযান বাতিল করেছিলেন।

এটি ছিল সেসময়ে ভারতের প্রধান নদীগুলোর একটি। তখন কিন্ত আজকের যমুনা নদী বা তিস্তা নদী ছিল না। এগুলো আঠারো শতকে জন্ম নেয়। পরবর্তিতে করতোয়া নদী শুকিয়ে যায়। এর বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন জায়গাতে ছোট নদী রুপে টিকে থাকে। তেমনি একটি পার্ট হল এই আখিরা নদী। ঠাকুরগাঁও পঞ্চগড় অঞ্চলে যে করতোয়া দেখা যায় সেটি মূল করতোয়া। এটি ঠাকুরগাঁও অঞ্চলেই শেষ। তারপরের অংশগুলো শুকিয়ে গিয়েছে। এই শুকনো অংশগুলো দিয়েই আগে মূল করতোয়া প্রবাহিত হত। যার একটি অংশ মিঠাপুকুরের পশ্চিমাংশে বিলাঞ্চলে পড়েছে।

এই খান থেকেই আধুনিক আখিরার জন্ম। সুতরাং আখিরাই যে প্রাচীনকালে করতোয়া ছিল তার সপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এটি পরবর্তিতে ঘোড়াঘাটের পার্শ্বে যমুনেশ্বরীর সাথে মিলে বাঙালী নদীর সৃষ্টি করে। এই বাঙালী নদীকেই আমরা কাটাখালি ব্রীজের ওখানে দেখি। এটি সর্বজন স্বীকৃত যে বাঙালী নদীই করতোয়ার দক্ষিনাংশ। মোটের ওপর যা দাড়াচ্ছে তা হল এই আখিরাই আদি করতোয়া। সতেরো ও আঠারো শতকের জেমস রেনেল এবং ভ্যান ডে ব্রুকের মানচিত্রে তাই দেখানো হয়েছে। সেই বিশাল করতোয়া।

বিখ্যাত করতোয়া। যার তীরে গড়ে উঠেছিল পুন্ড্র নগর। শুধু পুন্ড্র নগরই না আরও একটি নগরও গড়ে উঠেছিল বর্তমান গোড়াঘাটে যা মধ্যযুগে উত্তর বাংলার রাজধানী ছিল। কেউ কেউ বলে এটিই সেই শ্রাবস্তী নগরী যার বর্ণনা পাওয়া যায় জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন কবিতাতে । এই দুটি শহর কারিদিয়ান সভ্যতার কেন্দ্র ছিল। এরা উভয়েই করতোয়ার পারে গড়ে উঠেছিল। আর এই শ্রাবস্তী নগরের অপর তীরে ছিল একটি গঞ্জ যার নাম পরশবিজ্জ। এই নাম থেকেই হয়তো উৎপত্তি আজকের পলাশবাড়ীর।

সুতরাং দুই-চারশো বছর আগের কোন পলাশ গাছ থেকে না। বরং ‘প্রাগৈতিহাসিক’ যুগের কোন গঞ্জ (পলাশবৃন্দক পরবর্তীতে পরশবিজ্জ) এর নাম থেকে পলাশবাড়ীর উৎপত্তি। তবে এই শহরের দীর্ঘ ইতিহাস আজও লুকিয়ে আছে।

জনপ্রিয়

পুর্ব প্রকাশের পর: পলাশবাড়ী উপজেলার নামকরণ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রকাশের সময়: ১২:০২:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ অগাস্ট ২০২১

(পুর্ব প্রকাশের পর)

অনেকেই মনে করে, কোন এক পলাশ ফুলের গাছ থেকে আজকের পলাশবাড়ী নামকরণ হয়েছে।কিন্ত এ দাবির প্রমাণ আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেন নি। যদি কোন গাছের থেকেই পলাশবাড়ী উপজেলার নামের উৎপত্তি হয়, তবে আড়াইশো বছর আগের জেমস রেনেলের বা তারও আগের চারশ(৪শ) বছরের পুরাতন ভ্যান ডে ব্রুকের ম্যাপে পলাশবাড়ীর অস্তিত্ব কোথা থেকে আসলো?

পলাশবাড়ি কি শুধু দুই-চারশো বছর আগের? নাকি এর দীর্ঘ ইতিহাস আছে? চলুন, তাহলে জানা যাক… ১৯১৫ সালে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর দামোদরপুর থেকে ৫টি প্রাচীন পান্ডুলিপি আবিস্কার হয়, পাঁচটি পান্ডুলিপির একটি, দামোদর গুপ্ত কর্তৃক ২১৪ গুপ্ত সনে (৫৪৩ খ্রিস্টাব্দের) । এখানে উল্লেখিত, পলাশবৃন্দ কেন্দ্রস্থল কে বর্তমান গাইবান্ধার পলাশবাড়ী বলে কোন কোন গবেষক ধারণা করেন। আবার ১৯৩০ সালের হিলির বৈগ্রাম থেকে প্রথম কুমার গুপ্তের যে পান্ডুলিপি আবিষ্কার হয়েছে তাতে পলাশবৃন্দক ও পুরাণবৃন্দকহরি স্থানের নাম পাওয়া যায়। যেগুলো ঘোড়াঘাটের আশেপাশে অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা ছিল, খুব সম্ভবত পান্ডুলিপির পলাশবৃন্দক ও পুরাণবৃন্দক হরি আজকের পলাশবাড়ী নামের অপভ্রংশ।

আনুমানিক ২৮০ থেকে ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল এই গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। (ছবিঃ প্রথম কমেন্টে) একটি শহর বেশিরভাগ সময়েই নদী বা রাস্তার ওপর গড়ে ওঠে। সেই শহরের ইতিহাস জানতে হলে সেই নদী বা রাস্তার ইতিহাস জানতে হবে। মেজর জেমস রেনেলের ১৭৭৩ সালের ম্যাপ, ভ্যা ডে ব্রুকের ম্যাপ, বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন থেকে তথ্য নিয়ে আজকের এই প্রতিবেদন। আচ্ছা কেউ কি বলতে পারেন পলাশবাড়ী কোন নদীর তীরে অবস্থিত? নদীটার নাম আখিরা মাচ্চা। এই নদীটি পাউবো দ্বারা চিহ্নিত উত্তর পশ্চিমাঞ্চল অর্থাৎ পুরো রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের এক নম্বর নদী। অর্থাৎ এই অঞ্চলের নদীর হিসাব, এখান থেকেই শুরু হয়।

অনেকেই ভাবছেন যে কোথায় এটি? পলাশবাড়ীর পাশে বিটিসির মোড়ে চলে যান। বামের রাস্তা ধরে একটু ভিতরে গেলেই পেয়ে যাবেন আখিরা মাচ্চা নদী। অথবা ঘোড়াঘাটের ব্রীজের অদূরে যমুনেশ্বরী আর বাঙ্গালী নদীর মোহনায় যে ছোট্ট নদীটি উত্তর দিকে চলে গিয়েছে সেটিই আখিরা মাচ্চা। ধাপের হাটের আগে ঢাকা রংপুর মহাসড়কের পাশে যে নদীটি দেখা যায় সেটিই আখিরা মাচ্চা। এখন বলবেন ওটা নদী? ওটা তো খাল। হুম, দেখতে খাল মনে হলেও এই নদীর আছে দীর্ঘ ইতিহাস। এটি যে কত বড় নদী ছিল তা বন্যার সময় টের পাওয়া যায়। এই নদীর সূত্র ধরেই বেড়িয়ে আসতে পারে পলাশবাড়ীর আদি ইতিহাস । একটু শুরু থেকে বলি……. প্রাচীন কালে করতোয়া এক বিশাল নদী ছিল। এত বড় যে এটি পার হতে গিয়ে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি তার তিব্বত অভিযান বাতিল করেছিলেন।

এটি ছিল সেসময়ে ভারতের প্রধান নদীগুলোর একটি। তখন কিন্ত আজকের যমুনা নদী বা তিস্তা নদী ছিল না। এগুলো আঠারো শতকে জন্ম নেয়। পরবর্তিতে করতোয়া নদী শুকিয়ে যায়। এর বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন জায়গাতে ছোট নদী রুপে টিকে থাকে। তেমনি একটি পার্ট হল এই আখিরা নদী। ঠাকুরগাঁও পঞ্চগড় অঞ্চলে যে করতোয়া দেখা যায় সেটি মূল করতোয়া। এটি ঠাকুরগাঁও অঞ্চলেই শেষ। তারপরের অংশগুলো শুকিয়ে গিয়েছে। এই শুকনো অংশগুলো দিয়েই আগে মূল করতোয়া প্রবাহিত হত। যার একটি অংশ মিঠাপুকুরের পশ্চিমাংশে বিলাঞ্চলে পড়েছে।

এই খান থেকেই আধুনিক আখিরার জন্ম। সুতরাং আখিরাই যে প্রাচীনকালে করতোয়া ছিল তার সপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এটি পরবর্তিতে ঘোড়াঘাটের পার্শ্বে যমুনেশ্বরীর সাথে মিলে বাঙালী নদীর সৃষ্টি করে। এই বাঙালী নদীকেই আমরা কাটাখালি ব্রীজের ওখানে দেখি। এটি সর্বজন স্বীকৃত যে বাঙালী নদীই করতোয়ার দক্ষিনাংশ। মোটের ওপর যা দাড়াচ্ছে তা হল এই আখিরাই আদি করতোয়া। সতেরো ও আঠারো শতকের জেমস রেনেল এবং ভ্যান ডে ব্রুকের মানচিত্রে তাই দেখানো হয়েছে। সেই বিশাল করতোয়া।

বিখ্যাত করতোয়া। যার তীরে গড়ে উঠেছিল পুন্ড্র নগর। শুধু পুন্ড্র নগরই না আরও একটি নগরও গড়ে উঠেছিল বর্তমান গোড়াঘাটে যা মধ্যযুগে উত্তর বাংলার রাজধানী ছিল। কেউ কেউ বলে এটিই সেই শ্রাবস্তী নগরী যার বর্ণনা পাওয়া যায় জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন কবিতাতে । এই দুটি শহর কারিদিয়ান সভ্যতার কেন্দ্র ছিল। এরা উভয়েই করতোয়ার পারে গড়ে উঠেছিল। আর এই শ্রাবস্তী নগরের অপর তীরে ছিল একটি গঞ্জ যার নাম পরশবিজ্জ। এই নাম থেকেই হয়তো উৎপত্তি আজকের পলাশবাড়ীর।

সুতরাং দুই-চারশো বছর আগের কোন পলাশ গাছ থেকে না। বরং ‘প্রাগৈতিহাসিক’ যুগের কোন গঞ্জ (পলাশবৃন্দক পরবর্তীতে পরশবিজ্জ) এর নাম থেকে পলাশবাড়ীর উৎপত্তি। তবে এই শহরের দীর্ঘ ইতিহাস আজও লুকিয়ে আছে।