শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ০২:৫৫ পূর্বাহ্ন

ভাষা শহীদ রফিকের ৯৬ তম জন্মবার্ষিকী আজ

তাসদিকুল হাসান, জাগো২৪.নেট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যাল থেকে
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২২

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশের গুলিতে প্রথম শহীদ হন লড়াকু বীর সৈনিক রফিকউদ্দিন আহমদ। ভাষা শহীদ রফিকের ৯৬ তম জন্মবার্ষিকী আজ।

তিনি ১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলার পারিল বলধারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী থাকাকালে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগদান করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হোস্টেল প্রাঙ্গনে আসলে পুলিশ গুলি চালায়, এতে রফিকউদ্দিন মাথায় গুলিবিদ্ধ হন এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

ভাষা শহীদ রফিকের স্মরণে তার জন্মস্থান গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রফিকনগর করা হয়। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে রফিক ছিলেন সবার বড় । তার পিতা আবদুল লতিফ এবং মায়ের নাম রাফিজা খাতুন। ১৯৪৯ সালে রফিক স্থানীয় বায়রা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক সম্পন্ন করে মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। সেসময় শহীদ রফিকের পিতা ঢাকার বাদামতলিতে ‘কমার্শিয়াল আর্ট প্রেস’ নামে প্রেস ব্যবসা করতেন। শহীদ রফিকের বাবার পক্ষে মানিকগঞ্জ থেকে নিয়মিত ঢাকা এসে প্রেস দেখা কঠিন হয়ে পরলে রফিক তার পিতাকে জানান পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি ওই প্রেস ব্যবসা দেখাশুনা করবেন। ওই ব্যবসা পরিচালনার স্বার্থেই তিনি জগন্নাথ কলেজের (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে সান্ধ্যকালীণ কোর্সে ভর্তি হন। ওই সময় রফিকের মত যারা পড়ালেখার পাশাপাশি অন্য কাজ করতেন তাদের কথা মাথায় রেখেই ওই কোর্সটি চালু করা হয়েছিল। যে কেউ চাইলেই ওই কোর্সে ভর্তি হয়ে কাজের পাশাপাশি পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারতেন। রফিকও ওই সুযোগ নিয়ে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) লেখাপড়া করেন। রফিক তার নিজ গ্রামের মেয়ে রাহেলা খাতুন পানুকে ভালবাসতেন।

পারিবারিকভাবে তাদের এই ভালবাসাকে মেনে নিয়ে পরিবার থেকে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। সেই উপলক্ষ্যেই বিয়ের বাজার করার জন্য তিনি ঢাকায় যান। ২১ ফেব্রুয়ারি বিয়ের শাড়ি-গহনা ও কসমেটিকস নিয়ে সন্ধ্যায় তাঁর বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যখন তিনি শুনতে পেলেন বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার দাবীতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে থেকে মিছিল বের হবে তখন রফিক ছুটে যান ওই মিছিলে। তৎকালীন সরকার আরোপিত ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার সাথে তিনিও বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেল প্রাঙ্গণ ও রাজপথ মিছিলের পদভারে প্রকম্পিত। এ অবস্থা দেখে পাকিস্তান সরকার দিশেহারা হয়ে যায়। শুরু হয় ছাত্র-জনতার উপর র্নিবিচারে গুলিবর্ষণ। একটি গুলি রফিক উদ্দিনের মাথায় বিদ্ধ হয়। ঘটনাস্থলেই তিনি শহীদ হন। মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের ১৭ নম্বর রুমের পূর্বদিকে তার লাশ পড়ে ছিল। ছয়-সাত জন ধরাধরি করে তার লাশ এনাটমি হলের পেছনের বারান্দায় এনে রাখেন। তাদের মাঝে ডাঃ মশাররফুর রহমান খান গুলিতে ছিটকে পড়া রফিকের মগজ হাতে করে নিয়ে যান। রফিকই পৃথিবীতে ভাষার জন্য প্রথম শহীদের মর্যাদা লাভ করেন। তবে পাকিস্তানী হায়েনারা তাকে মেরেই ক্ষান্ত হয়নি ঢাকা মেডিক্যাল থেকে তার লাশ নিয়ে লুকিয়ে ফেলে এবং জনরোষের ভয়ে পরদিন সেনাদের সহযোগিতায় আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করে। কিন্তু তাঁর কবরের কোন চিহ্ন রাখা হয়নি।

ফলে আজিমপুর কবরস্থানে হাজারো কবরের মাঝে ভাষা শহীদ রফিকের কবরটি অচিহ্নিত থেকে যায়। রফিক উদ্দিন ও অন্যান্য ভাষা শহীদ- সালাম, জব্বার, শফিউরের মহান আত্মত্যাগের ফলেই বাংলা ভাষা ১৯৫৬ সালে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শাসনতান্ত্রিক স্বীকৃতি লাভ করে। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার শহীদ রফিককে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে। সরকারিভাবে ২০০৬ সালে তারঁ ‘পারিল’ গ্রামে শহীদ রফিকের নামে ভাষা শহীদ পাঠাগার ও স্মৃতি যাদুঘর স্থাপন করা হয়। যেখানে তার ব্যবহৃত জিনিষপত্র ও প্রচুর বই আছে। ভাষা সৈনিক রফিকেরস্মৃতি রক্ষার্থে ২০১৪ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন বিজনেস স্টাডিজ ভবনের নাম পরিবর্তন করে ‘ভাষা শহীদ রফিক ভবন’ নামকরণ করা হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় ও বরণীয় ব্যক্তিদের মধ্যে গর্বের জায়গা দখল করে আছেন ভাষা আন্দোলনে অমর শহীদদের অন্যতম রফিক উদ্দিন আহমদ। দেশ, জাতি, সমাজ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে শহীদ রফিক এক অনুপ্রেরণার নাম।

শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | জাগো২৪.নেট

কারিগরি সহায়তায় : শাহরিয়ার হোসাইন