উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাট। এই জনপদের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন। সময়ের স্রোতে অনেক স্থাপনা হারিয়ে গেলেও কিছু স্থাপনা এখনো অতীতের গল্প বলে দাঁড়িয়ে আছে। কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার জমিদার বাড়ি তেমনই একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করে থাকা এ বাড়ি যেন অতীতের সঙ্গে বর্তমানের এক নীরব সেতুবন্ধন।
স্থানীয় ইতিহাস ও প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ১৬৩৪ সালে তুষভান্ডার জমিদার বংশের গোড়াপত্তন হয়। এ বংশের পূর্বপুরুষ মুরারিদের ঘোষাল ভট্টাচার্য ছিলেন ২৪ পরগনা জেলার বাসিন্দা। তিনি ‘রসিক রায় বিগ্রহ’ সঙ্গে নিয়ে কোচ মহারাজা প্রাণ নারায়ণের শাসনামলে কোচবিহারে আসেন। পরে মহারাণীর কাছ থেকে একটি ‘উপঞ্চৌকি’ তালুক পেয়ে উত্তর ঘনেশ্যাম গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। সেখানেই শুরু করেন রসিক রায় বিগ্রহের পূজা।
তখন রংপুর অঞ্চলে ‘উপঞ্চৌকি’ নামে একটি প্রথা প্রচলিত ছিল। এ প্রথার আওতায় কোচবিহারের মহারাজারা হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রজাদের তালুক বা ভূখণ্ড দান করতেন। সেই সূত্রেই মুরারিদেব এ অঞ্চলের ছোটখাতা, বামুনিয়া ও শেখ সুন্দর মৌজা লাভ করেন। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তুষভান্ডার জমিদারি।
তবে জমিদারি প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে একটি ব্যতিক্রমী ইতিহাস। মুরারিদেব ব্রাহ্মণ হওয়ায় কোচ রাজার কাছ থেকে প্রচলিত পদ্ধতিতে খাজনা দিতে আপত্তি জানান। তিনি খাজনার পরিবর্তে অন্য কোনো উপাদান দেওয়ার সুযোগ চান। পরে মহারাণীর সম্মতিতে অর্থের পরিবর্তে ‘তুষ’ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়।
ধানের তুষ তখন শুধু কৃষিজাত অবশিষ্টাংশ ছিল না; রাজপরিবারের বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও এর প্রয়োজন ছিল। মুরারিদেবের কাছ থেকে পাওয়া তুষ কোচবিহার রাজবাড়িতে যজ্ঞসহ বিভিন্ন ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হতো বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
খাজনা হিসেবে দেওয়ার জন্য সংগ্রহ করা সেই তুষ জমা করে রাখা হতো বর্তমান জমিদার বাড়ির পূর্বদিকে। একসময় সেখানে তুষের বড় বড় স্তূপ তৈরি হয়। আর সেই তুষের ভাণ্ডার থেকেই এলাকার নাম ‘তুষভান্ডার’ হয়েছে—এমনটাই মনে করেন স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও প্রবীণ ব্যক্তিরা।
নামের সঙ্গে জমিদারি ইতিহাসের এমন যোগসূত্র এ স্থাপনাকে করেছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ। একটি এলাকার নাম কীভাবে সেখানকার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে মিশে যেতে পারে, তুষভান্ডারের নামকরণ তার একটি উদাহরণ।
সময় বদলেছে। বিলুপ্ত হয়েছে জমিদারি প্রথা। বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা, জনপদের চেহারা ও যোগাযোগব্যবস্থা। কিন্তু তুষভান্ডার জমিদার বাড়ি এখনো অতীতের সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোচ রাজপরিবার, জমিদারি ব্যবস্থা, ধর্মীয় আচার এবং এ অঞ্চলের পুরোনো সামাজিক ইতিহাস।
বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই হয়তো এ ইতিহাস অজানা। অথচ কয়েক শতাব্দী আগের একটি জনপদের উত্থান, জমিদারি প্রতিষ্ঠা এবং ‘তুষ’কে ঘিরে একটি এলাকার নামকরণের গল্প একই স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয়। এগুলো একটি অঞ্চলের অতীতকে জানার জীবন্ত দলিল। তুষভান্ডার জমিদার বাড়িও তেমন একটি নিদর্শন। যথাযথ সংরক্ষণ, গবেষণা ও ইতিহাসের প্রামাণ্য তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে এ স্থাপনাটি লালমনিরহাটের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ পরিচায়ক হিসেবে আরও পরিচিত হয়ে উঠতে পারে।
কালের স্রোতে জমিদার নেই, নেই সেই তুষের ভাণ্ডারও। কিন্তু নামের মধ্যে রয়ে গেছে সেই ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে তুষভান্ডার জমিদার বাড়ি।
মোঃ শাহজাহান সাজু. করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট, লালমনিরহাট 























