দাখিল পরীক্ষায় ১২৫০ নম্বর পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে মো. আবু সাঈদ খুদুরী। ফল প্রকাশের পর সহপাঠী ও স্বজনদের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়লেও তার পরিবারের সেই আনন্দ যেন ম্লান হয়ে গেছে। কারণ, মেধাবী মো. আবু সাঈদ খুদুরীর উচ্চশিক্ষার খরচ কীভাবে জোগাড় হবে—এ নিয়েই এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার পরিবারের।
গরীব মেধাবী এ শিক্ষার্থীর বাড়ি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের দেওডোবা গ্রামে। সে উপজেলার ফলগাছা রুহুল উলুম দাখিল মাদ্রাসা থেকে এ বছরে দাখিল পরীক্ষা দিয়ে ছিলো।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে ৯ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি টিনের ঘর। ঘর সমান বারান্দাও আছে। ঘর এবং বারান্দার মাঝখানে বেড়া দিয়ে রুম বানানো হয়েছে চারাটি। ঘরের একটা রুমে থাকেন সাঈদের বাবা-মা। আরেকটা ব্যবহার করা হয় দোকানের কাজে। নামমাত্র দোকান। কয়েক প্যাকেট বিস্কুট, কয়েক প্যাকেট চকলেট আর কয়েক প্যাকেট রুটি দেখা গেছে। সবমিলিয়ে এক হাজার টাকার মালামালও হবে না। আর বারান্দার দুই রুমের একটা রান্না ঘর আর একটিতে থাকেন মো. আবু সাঈদ খুদুরী। বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই ডানে একটি নড়বড়ে চালা। বেড়া নেই সেখানে আছে একটি চুলা। সঙ্গে লাগা আধাপাকা একটি টয়লেট। আছে একটি টিউবওয়েল। তাদের আবাদি কোনো জমি নেই। বসতবাড়ি শতেক পাঁচেক। আয়ের উৎস একমাত্র ভ্যান।
মো. আবু সাঈদ খুদুরীর পরিবার জানায়, ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। দাখিল পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছে সে। ভবিষ্যতে ভালো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চায় সাঈদ।
তবে আর্থিক সংকট সেই স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংসারের সীমিত আয় দিয়ে নিত্যদিনের খরচ চালাতেই পরিবারের সদস্যদের হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যে আলিমে ভর্তি, বই-খাতা, যাতায়াত ও পড়াশোনার অন্যান্য খরচ বহন করা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সাঈদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় ব্যক্তিদের সহযোগিতা কামনা করেছেন তারা।
মো. আবু সাঈদ খুদুরী বলেন, ‘পড়ালেখার পাশাপাশি বাবা-মায়ের কাজে সহযোগিতা করেছি সবসময়। মাঝেমধ্যে ভ্যানও চালাতে হয়েছে। আমি ভবিষ্যতে ডাক্তার হতে চাই। কিন্তু সে জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। যদিও আমি ভালো রেজাল্ট করেছি তবুও আমি খুশি নেই। কারণ পরবর্তীতে যে খরচ লাগবে তা আমার পরিবার দিতে পারবে কি না এ নিয়ে আমি ভীষণ শঙ্কিত।’
প্রতিবেশী মো. মাসুদ রানা বলেন, ‘লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ আবু সাঈদের। আর এটা ছোটো বেলা থেকেই দেখে আসছি। সে কারণেই ভালো ফলাফল করেছে সে। কিন্তু এখন তার উচ্চ শিক্ষার যাত্রা অনিশ্চিত। সে কারণে সহৃদয়বান ব্যক্তিদের সহায়তা চেয়েছেন তিনি।’
মো. আবু সাঈদ খুদুরীর ভ্যান চালক বাবা মো. রাশিদুল ইসলাম বলেন, ‘রেজাল্ট শুনি আমি খুব খুশি হইছি। বুকটা আমার ভরি গেইছে। আমার সংসার চলে না। আমি তিন চাকার একটা ভ্যান চালাই। যা আয় হয় তা দিয়ে কোনমতে সংসার চালাই। তে এখন আমি ওকে পড়াইতে চাই। বড় বিদ্বান বানাতে চাই। কিন্তু অর্থের দরকার। যদি কেউ একটু সহযোগিতার হাত বাড়ে দেয় তাহলে আমি ওকে পড়াতে পারবো। তাছাড়া আমার একার পক্ষে সম্ভব না। এ জন্য সবার সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।’
রাশিদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘ছেলের পরীক্ষার সময় একটা নতুন ড্রেস দিতে পারিনি। ভালো কিছু খাওয়াতেও পারিনি। মনে হলেই ভীষণ কষ্ট লাগে। এখন ছেলে আমার ডাক্তার হতে চায়। আমিও চাই সন্তানের ইচ্ছে পূরণ করতে। কিন্তু সেটা আমার পক্ষে কিভাবে সম্ভব বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন তিনি।’
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর চোখমুখ মুছে তিনি আবারও বলেন, ‘একমাত্র ছেলের পড়ালেখা যাতে করে বন্ধ না হয় সে সেজন্য বহু কষ্ট করতে হয়েছে। বহুদিন গেছে না খেয়েও। এ ধরনের ঘটনা অনেক আছে।’
সর্বশেষ কষ্টের ঘটনাটি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এই পরীক্ষার আগে ছেলে যখন এসে বললো বাবা ফরম ফিলাফ করতে সাতাইশ শো টাকা লাগবে। তকন আমার মাথা চরাত করি উঠছে। কারণ দিনে আয় করি দুই থেকে আড়াই শো টাকা। সাতাইশ শো টাকা কামাই করতে সময় লাগবে আমার কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ দিন। এরিমধ্যে আবার সংসার খরচ। ফরম ফিলাপের টাকা যোগার করতে প্রায় এক সপ্তাহ কোনো বাজার ঘাট করিনি।’
মো. আবু সাঈদ খুদুরীর গৃহিনী মা মোছাঃ শিউলি বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে যতক্ষণ পড়াশোনা করে ততক্ষণ আমি জাগি থাকি। ও যখন শোয় আমিও তখন শুই। আবারও খুব ভোরে ওকে ঘুম থেকে ডাকে তুলি। এরপর সে হাতমুখ ধুইয়া পড়তে বসে। আমিও জেগে থাকি। সকাল হলে রান্না বান্না করি। এরপর মাদ্রাসায় যাওয়ার সময় হলে ওকে গোসল করিয়ে খাওয়ায়ে দেই। এরপর সে মাদ্রাসায় যায়। না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম। এই রকম করি ছেলে মানুষ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সংসার গরীব। এতো খরচ পাতি দিতে পারি না। যদি কেউ সহযোগিতা করে তাহলে আমাদের জন্য ভালো হয়। আমাদের সন্তানের জন্য ভালো হয়।
জাহিদ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, জাগো২৪.নেট 
























