বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৪০০ টাকার ঝাড়ুতে সংসারের চাকা, ২০ হাজারে স্বপ্নপূরণের আশা

মাত্র ৪০০ টাকা পুঁজি নিয়ে বাঁশের ঝাড়ু তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন মোজেনা বেগম (৪৫)। সেই ঝাড়ু গ্রামে গ্রামে বিক্রি করে এখন দৈনিক প্রায় ২৫০ টাকা লাভ করছেন। এ আয়েই ঘুরছে অভাবের সংসারের চাকা। চলছে মেয়ের লেখাপড়া, সঞ্চয়ের টাকায় কিনেছেন একটি ছাগলও। অথচ নিজের এক টুকরো বসতভিটা নেই তার।

দিনমজুর স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে অন্যের জমিতে জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করেন। শত অভাবেও থেমে নেই তার স্বপ্ন। মাত্র ২০ হাজার টাকা পুঁজি পেলে ছোট একটি ঝাড়ু তৈরির কারখানা গড়ে তুলতে চান তিনি। সেখানে নিজের পাশাপাশি গ্রামের অসহায় নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার আশা মোজেনার।

সংগ্রামী এই নারী গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের ইসবপুর (মধ্যপাড়া) গ্রামের মোজেনা বেগম। তার স্বামী নান্টু মিয়া পেশায় দিনমজুর। নিজেদের জমিজমা কিংবা বসতভিটা না থাকায় স্থানীয় আসাদ খন্দকারের জমিতে আশ্রয় নিয়ে জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করছেন তারা।

প্রায় এক বছর আগে ‘হেলপিং হ্যান্ড’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রাকিবুল ইসলাম ৪০০ টাকা সহায়তা দেন মোজেনাকে। সেই টাকা সংসারে খরচ না করে বাঁশের ঝাড়ু তৈরির উপকরণ কেনেন তিনি। এরপর নিজের হাতে ঝাড়ু তৈরি করে গ্রামে গ্রামে বিক্রি শুরু করেন। বিক্রির লাভ দিয়ে আবার উপকরণ কিনে ধীরে ধীরে এগিয়ে নেন ছোট্ট উদ্যোগটি।

সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে মোজেনা বেগম বলেন, আমার নিজের কোনো জায়গাজমি নাই। অন্যের জায়গায় থাকি। স্বামী মানুষের বাড়িতে কাজ করে যা পায়, তা দিয়ে সংসার চলে না। ৪০০ টাকা অনুদান পেয়ে ভাবলাম, কিছু একটা করি। সেই টাকা দিয়ে ঝাড়ু বানানো শুরু করি। এখন প্রতিদিন আড়াই শ টাকার মতো লাভ থাকে। এই টাকা আমার কাছে অনেক।

মোজেনার স্বামী নান্টু মিয়া বলেন, আমি দিনমজুর মানুষ। সব দিন কাজ পাই না। আগে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হতো। এখন আমার স্ত্রী ঝাড়ু বানিয়ে বিক্রি করে সংসারে সাহায্য করছে। কেউ একটু সহযোগিতা করলে ওর কাজটা আরও বড় করা সম্ভব।

অভাবের মধ্যেও নয় বছর বয়সী মেয়ে নাসিমা আক্তারের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি মোজেনা। মেয়েকে ভর্তি করেছেন দড়ি জামালপুরের একটি মহিলা মাদরাসায়। ঝাড়ু বিক্রির আয় থেকেই জোগাচ্ছেন লেখাপড়ার খরচ। পাশাপাশি সঞ্চিত টাকা দিয়ে কিনেছেন একটি ছাগলও।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ঝাড়ুর ক্রেতা সাহিদা বেগম বলেন, মোজেনার তৈরি ঝাড়ুর মান ভালো, দামও সাধ্যের মধ্যে। তাই আমরা তার কাছ থেকেই ঝাড়ু কিনি। অভাবের সংসারেও তিনি কারও কাছে হাত না পেতে পরিশ্রম করে জীবিকা চালাচ্ছেন। তার এই চেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়। সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে একটু আর্থিক সহযোগিতা পেলে তিনি ব্যবসা বড় করতে পারবেন।

মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে মোজেনা বলেন, আমি অভাবের কারণে অনেক কিছু করতে পারি নাই। কিন্তু মেয়েটাকে লেখাপড়া শেখাতে চাই। সে যেন আমার মতো কষ্ট না করে। নিজের জন্য ভালো কিছু কিনতে না পারলেও মেয়ের পড়া বন্ধ করতে চাই না।

মোজেনা বলেন, এলাকায় ঝাড়ুর চাহিদা বাড়লেও পুঁজির অভাবে উৎপাদন বাড়াতে পারছি না। ২০ হাজার টাকা পুঁজি পেলে ঝাড়ু বানানোর কাজটা বড় করতে পারব। গ্রামের আরও কয়েকজন গরিব মহিলাকে নিয়ে কাজ করতে চাই। তারা যদি কিছু টাকা আয় করতে পারে, তাহলে তাদের সংসারেও উপকার হবে। আমি কারও কাছে বারবার সাহায্য চাইতে চাই না। নিজের পরিশ্রমে বাঁচতে চাই।

হেলপিং হ্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রাকিবুল ইসলাম বলেন, মোজেনাকে এক বছর আগে মাত্র ৪০০ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। সেই সামান্য অর্থ কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন। এটি অনুপ্রেরণাদায়ক। প্রয়োজনীয় পুঁজি পেলে তার মতো পরিশ্রমী নারীরা স্বাবলম্বী হতে পারবেন।

রাকিবুল ইসলাম আরও বলেন, মোজেনার জীবনসংগ্রাম এখন নতুন সম্ভাবনার পথে। প্রয়োজন শুধু একটু সহযোগিতা। এ জন্য সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। তাহলে মোজেনার ছোট্ট উদ্যোগ একদিন আরও কয়েকটি দরিদ্র পরিবারের ঘুরে দাঁড়ানোর অবলম্বন হতে পারে।

জনপ্রিয়

৪০০ টাকার ঝাড়ুতে সংসারের চাকা, ২০ হাজারে স্বপ্নপূরণের আশা

প্রকাশের সময়: ০৬:২৮:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

মাত্র ৪০০ টাকা পুঁজি নিয়ে বাঁশের ঝাড়ু তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন মোজেনা বেগম (৪৫)। সেই ঝাড়ু গ্রামে গ্রামে বিক্রি করে এখন দৈনিক প্রায় ২৫০ টাকা লাভ করছেন। এ আয়েই ঘুরছে অভাবের সংসারের চাকা। চলছে মেয়ের লেখাপড়া, সঞ্চয়ের টাকায় কিনেছেন একটি ছাগলও। অথচ নিজের এক টুকরো বসতভিটা নেই তার।

দিনমজুর স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে অন্যের জমিতে জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করেন। শত অভাবেও থেমে নেই তার স্বপ্ন। মাত্র ২০ হাজার টাকা পুঁজি পেলে ছোট একটি ঝাড়ু তৈরির কারখানা গড়ে তুলতে চান তিনি। সেখানে নিজের পাশাপাশি গ্রামের অসহায় নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার আশা মোজেনার।

সংগ্রামী এই নারী গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের ইসবপুর (মধ্যপাড়া) গ্রামের মোজেনা বেগম। তার স্বামী নান্টু মিয়া পেশায় দিনমজুর। নিজেদের জমিজমা কিংবা বসতভিটা না থাকায় স্থানীয় আসাদ খন্দকারের জমিতে আশ্রয় নিয়ে জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করছেন তারা।

প্রায় এক বছর আগে ‘হেলপিং হ্যান্ড’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রাকিবুল ইসলাম ৪০০ টাকা সহায়তা দেন মোজেনাকে। সেই টাকা সংসারে খরচ না করে বাঁশের ঝাড়ু তৈরির উপকরণ কেনেন তিনি। এরপর নিজের হাতে ঝাড়ু তৈরি করে গ্রামে গ্রামে বিক্রি শুরু করেন। বিক্রির লাভ দিয়ে আবার উপকরণ কিনে ধীরে ধীরে এগিয়ে নেন ছোট্ট উদ্যোগটি।

সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে মোজেনা বেগম বলেন, আমার নিজের কোনো জায়গাজমি নাই। অন্যের জায়গায় থাকি। স্বামী মানুষের বাড়িতে কাজ করে যা পায়, তা দিয়ে সংসার চলে না। ৪০০ টাকা অনুদান পেয়ে ভাবলাম, কিছু একটা করি। সেই টাকা দিয়ে ঝাড়ু বানানো শুরু করি। এখন প্রতিদিন আড়াই শ টাকার মতো লাভ থাকে। এই টাকা আমার কাছে অনেক।

মোজেনার স্বামী নান্টু মিয়া বলেন, আমি দিনমজুর মানুষ। সব দিন কাজ পাই না। আগে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হতো। এখন আমার স্ত্রী ঝাড়ু বানিয়ে বিক্রি করে সংসারে সাহায্য করছে। কেউ একটু সহযোগিতা করলে ওর কাজটা আরও বড় করা সম্ভব।

অভাবের মধ্যেও নয় বছর বয়সী মেয়ে নাসিমা আক্তারের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি মোজেনা। মেয়েকে ভর্তি করেছেন দড়ি জামালপুরের একটি মহিলা মাদরাসায়। ঝাড়ু বিক্রির আয় থেকেই জোগাচ্ছেন লেখাপড়ার খরচ। পাশাপাশি সঞ্চিত টাকা দিয়ে কিনেছেন একটি ছাগলও।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ঝাড়ুর ক্রেতা সাহিদা বেগম বলেন, মোজেনার তৈরি ঝাড়ুর মান ভালো, দামও সাধ্যের মধ্যে। তাই আমরা তার কাছ থেকেই ঝাড়ু কিনি। অভাবের সংসারেও তিনি কারও কাছে হাত না পেতে পরিশ্রম করে জীবিকা চালাচ্ছেন। তার এই চেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়। সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে একটু আর্থিক সহযোগিতা পেলে তিনি ব্যবসা বড় করতে পারবেন।

মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে মোজেনা বলেন, আমি অভাবের কারণে অনেক কিছু করতে পারি নাই। কিন্তু মেয়েটাকে লেখাপড়া শেখাতে চাই। সে যেন আমার মতো কষ্ট না করে। নিজের জন্য ভালো কিছু কিনতে না পারলেও মেয়ের পড়া বন্ধ করতে চাই না।

মোজেনা বলেন, এলাকায় ঝাড়ুর চাহিদা বাড়লেও পুঁজির অভাবে উৎপাদন বাড়াতে পারছি না। ২০ হাজার টাকা পুঁজি পেলে ঝাড়ু বানানোর কাজটা বড় করতে পারব। গ্রামের আরও কয়েকজন গরিব মহিলাকে নিয়ে কাজ করতে চাই। তারা যদি কিছু টাকা আয় করতে পারে, তাহলে তাদের সংসারেও উপকার হবে। আমি কারও কাছে বারবার সাহায্য চাইতে চাই না। নিজের পরিশ্রমে বাঁচতে চাই।

হেলপিং হ্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রাকিবুল ইসলাম বলেন, মোজেনাকে এক বছর আগে মাত্র ৪০০ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। সেই সামান্য অর্থ কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন। এটি অনুপ্রেরণাদায়ক। প্রয়োজনীয় পুঁজি পেলে তার মতো পরিশ্রমী নারীরা স্বাবলম্বী হতে পারবেন।

রাকিবুল ইসলাম আরও বলেন, মোজেনার জীবনসংগ্রাম এখন নতুন সম্ভাবনার পথে। প্রয়োজন শুধু একটু সহযোগিতা। এ জন্য সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। তাহলে মোজেনার ছোট্ট উদ্যোগ একদিন আরও কয়েকটি দরিদ্র পরিবারের ঘুরে দাঁড়ানোর অবলম্বন হতে পারে।